• আজ সোমবার, ১৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ২৯ নভেম্বর, ২০২১ ৷

কবিতার ‘বরপুত্র’ কবি শামসুর রাহমানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


❏ বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০১৬ Breaking News, গুণীজন সংবাদ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক – আধুনিক বাংলা কবিতার ‘বরপুত্র’ শামসুর রাহমানের দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের এই দিনে কিংবদন্তি কবি শামসুর রাহমান প্রয়াত হন। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা কবিতার শক্তিমান কবি। তিনি কবিতাকে একালে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি আজো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি হিসাবে বিবেচিত ।

এর বাইরেও তাঁকে স্বাধীনতার কবি, নাগরিক কবি, মুক্তিযুদ্ধের কবি, এমনই আরও নানাভূষণে অভিহিত করা যায়। বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ শামসুর রাহমানকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘নি:সঙ্গ শেরপা’ বলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই শামসুর রাহমানের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক কবিতার সাথে তার পরিচয় ও আন্তর্জাতিক-আধুনিক চেতনার উন্মেষ ঘটে ১৯৪৯ সালে। প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। তার লেখা ‘বর্ণমালা, আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট ’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, এসব কবিতা তাঁকে ভিন্নভাবে চিনিয়ে দেয় আমাদের।

শামসুর রাহমানের কবি প্রতিভা কতখানি তা অনুমানে ‘স্বাধীনতা তুমি’ এই একটি কবিতাই যথেষ্ট। স্বাধীনতা তুমি / রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।/ স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো / মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা- / স্বাধীনতা তুমি / শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা / স্বাধীনতা তুমি / পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।.. কবিতার প্রতি লাইনে লাইনে প্রাণে যে ঝংকার তোলে তার অন্য কোন তুলনা হয় না।

samsur-rahman

কবি হাবিবল্লাহ সিরাজী কবি সম্পর্কে বলেন, শামসুর রাহমান বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি নগরে বাস করলেও শুধু নাগরিক কবি ছিলেন না, ছিলেন জনতার কবি। স্বাধীনতার এ কবি দেশের ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে কোন অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, কোন অনাচার হতে দেখলে নিজেকে একাত্ম করে নিতেন এবং তার জবাব দিতেন কবিতার ভাষায়। আশা, বেদনা, ভালোবাসা, দ্রোহ কোনো কিছুই বাদ যায়নি তাঁর কবিতা থেকে।

জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, ‘বাঙালীর জীবনে শামসুর রাহমানের প্রয়োজন কতটুকু তা অনুধাবন করা যায় তাঁর কবিতা পাঠ করলেই। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, প্রেম, দ্রোহ, বিশ্বজনীনতা সবই উঠে এসেছে। যা আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। শামসুর রাহমান নামটির সঙ্গে বাংলাদেশ ও এদেশের কবিতাপ্রেমীদের নাড়ির যোগ রয়েছে। কারণ তিনি আমাদের স্বাধীনতার কবি। তিনি মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেই শ্যামলীর নিজ বাড়িতে তাঁকে কৃষ্ণপক্ষের শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়েছিল।

কবি শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৪ থেকে শুরু করে ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগ বাধ্য করা হয়। পরে তিনি ‘অধুনা’ নামে মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলিতে নানাবাড়িতে। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। ১৩ ভাই বোনের মধ্যে শামসুর রাহমান ৪র্থ। কবির জীবনের পুরোটা সময় কেটেছে ঢাকা শহরে। শৈশব, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এ ঢাকাতেই।

আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জনমানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ ছিল তার চেতনায় প্রবাহমান। কবি তার বিশ্বাসের জায়াগায় ছিলেন অনড়।

প্রকাশিত কাব্য :

প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নিলীমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাটা (১৯৭৪), আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি (১৯৭৪), এক ধরনের অহংকার (১৯৭৫), আমি অনাহারী (১৯৭৬), শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে (১৯৭৮), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), মাতাল ঋত্বিক (১৯৮২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে (১৯৮৩), কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি (১৯৮৩), নায়কের ছায়া (১৯৮৩), আমার কোন তাড়া নেই (১৯৮৪), যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে (১৯৮৪), অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই (১৯৮৫), হোমারের স্বপ্নময় হাত (১৯৮৫), শিরোনাম মনে পড়ে না (১৯৮৫), ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই (১৯৮৫), ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ (১৯৮৫), এক ফোঁটা কেমন অনল (১৯৮৬), টেবিলে আপেলগুলো হেসে উঠে (১৯৮৬), দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে (১৯৮৬), অবিরল জলভ্রমি (১৯৮৬), আমরা ক`জন সঙ্গী (১৯৮৬), ঝর্ণা আমার আঙুলে (১৯৮৭), স্বপ্নেরা ডুকরে উঠে বারবার (১৯৮৭), খুব বেশি ভালো থাকতে নেই (১৯৮৭), মঞ্চের মাঝখানে (১৯৮৮), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮), হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো (১৯৮৯), সে এক পরবাসে (১৯৯০), গৃহযুদ্ধের আগে (১৯৯০), খন্ডিত গৌরব (১৯৯২), ধ্বংসের কিনারে বসে (১৯৯২), হরিণের হাড় (১৯৯৩), আকাশ আসবে নেমে (১৯৯৪), উজাড় বাগানে (১৯৯৫), এসো কোকিল এসো স্বর্ণচাঁপা (১৯৯৫), মানব হৃদয়ে নৈবদ্য সাজাই (১৯৯৬), তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন (১৯৯৬), তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি (১৯৯৭), হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭), ছায়াগণের সঙ্গে কিছুক্ষণ (১৯৯৭), মেঘলোকে মনোজ নিবাস (১৯৯৮), সৌন্দর্য আমার ঘরে (১৯৯৮), রূপের প্রবালে দগ্ধ সন্ধ্যা রাতে (১৯৯৮), টুকরা কিছু সংলাপের সাঁকো (১৯৯৮), স্বপ্নে ও দুঃস্বপ্নে বেঁচে আছি (১৯৯৯), নক্ষত্র বাজাতে বাজাতে (২০০০), শুনি হৃদয়ের ধ্বনি (২০০০), হৃদপদ্মে জ্যোৎস্না দোলে (২০০১), ভগ্নস্তুপে গোলাপের হাসি (২০০২), ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছে (২০০৩), গন্তব্য নাই বা থাকুক (২০০৪), কৃষ্ণপক্ষে পূর্ণিমার দিকে (২০০৪), গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান (২০০৫), অন্ধকার থেকে আলোয় (২০০৬) এবং না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন (২০০৬)।

শিশু সাহিত্য :

এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৪), ধান ভানলে কুঁরো দেব (১৯৭৭), গোলাপ ফোঁটে খুকীর হাতে (১৯৭৭), স্মৃতির শহর (১৯৭৯), রংধনুর সাঁকো (১৯৯৪), লাল ফুলকির ছড়া (১৯৯৫), নয়নার জন্য (১৯৯৭), আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি (২০০৪) এবং নয়নার জন্য গোলাপ (২০০৫)।

উপন্যাস :

অক্টোপাশ (১৯৮৩), অদ্ভুত আঁধার এক (১৯৮৫), নিয়ত মন্তাজ (১৯৮৫) এবং এলো সে অবেলায় (১৯৯৪)।

স্মৃতিচারণ :

স্মৃতির শহর (১৯৭৯) এবং কালের ধুলোয় লেখা (২০০৪)।

অনুবাদ কবিতা :

ফ্রস্টের কবিতা (১৯৬৬), রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৮) এবং খাজা ফরিদের কবিতা (১৯৬৮)।

অনুবাদ নাটক :

হৃদয়ের ঋতু (মূল: টেনেসি উইলিয়মস), মার্কোমিলিয়ান্স্ (মূল: ইউজিন ও`নীল; ১৯৬৭) এবং হ্যামলেট (মূল: উইলিয়ম শেক্সপিয়র; ১৯৯৫)।

প্রবন্ধ :

আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ (১৯৮৬), শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ (২০০১) এবং কবিতা এক ধরনের আশ্রয় (২০০২)।

সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি অসংখ্য সম্মানা ও পুরস্কার অর্জন করেন। এ সবের মধ্যে রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, সাংবাদিকতার জন্য মিতসুবিসি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরষ্কার লাভ করেন। এছাড়াও ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এর পক্ষ থেকে কবিকে সম্মান সূচক ডি. লিট উপাধি দেয়া হয়।

কবির স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, গান ও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান। আজ জাতীয় কবিতা পরিষদ, শামসুর রাহমান স্মৃতিপরিষদ ও কবি শামসুর রাহমান ফাউন্ডেশনের যৌথভাবে নেওয়া কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সকাল সাড়ে নয়টায় বনানী কবরস্থানে কবির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিকেল তিনটায় কবি শামসুর রাহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কবির গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাহাড়তলী কলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক কবি-সাহিত্যিক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হবে। এতে থাকবে শ্রদ্ধা নিবেদন,আলোচনা, কবিতা পাঠ।