• আজ বুধবার, ১৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ১ ডিসেম্বর, ২০২১ ৷

উপকূলে কেওড়া ফল বাণিজ্যিকিকরণে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা আনতে পারে


❏ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৮, ২০১৬ দেশের খবর, বরিশাল

unnamed (1)বরগুনা প্রতিনিধি:

বরগুনার আমতলী উপজেলার পায়রা মাঝের চর, টেংরাগিরি, সোনাকাটা, তালতলী উপজেলার আশারচর, পাথরঘাটা উপজেলার হরিণবাড়িয়া, লালদিয়া, কাকচিড়া-মাঝেরচর, বরগুনা সদর উপজেলার বলেশ্বর মাঝেরচর সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ জেলার ৬ টি উপজেলার সবুজবেষ্টনী প্রকল্পের বৃক্ষরাজির মধ্যে অধিকাংশই কেওড়া গাছ। বনাঞ্চলের অন্যতম উঁচু গাছ হিসেবে এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলকে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।

কেওড়া গাছে প্রচুর পরিমাণে পাতা ও ফল ধরে। গাছের পাতা ও ফল এখানকার বানর ও হরিণের প্রধান খাদ্য। শুধু বন্যপ্রাণিই নয় মানুষও চাটনি, টক ডাল রান্নার অনুসঙ্গ, ঔষধি হিসেবে কেওড়া ফল খেয়ে থাকে। তাছাড়া কেওড়াজল, মাছের খাবার হিসেবে কেওড়া ফল ব্যবহার করছে। কেওড়া ফুল থেকে আসে মধু। কাঠের প্যানেল বানানো, প্যাক করার বাক্স তৈরি, আসবাবপত্র ও জ্বালানির জন্য কেওড়ার কাঠ ব্যবহার হচ্ছে হর-হামেশা। এই কেওড়া গাছ ও ফলকে ব্যবহার করে অর্থনীতির একটি নতুন দুয়ার খোলা যেতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারিভাবে কেওড়া ফলটির বিকি-কিনি বৈধ নয়। অবৈধভাবে এ অঞ্চলের অনেক লোক পেশাগতভাবে কেওড়া পাচার করছে। সরকারী নীতিমালায় এ ফলের ব্যাপক চাষ ও ব্যবহার বৈধকরণ করা হলে কেওড়া ফলকে ঘিরেও গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্প, বাণিজ্য।

কেওড়া গাছের আসল বৈজ্ঞানিক নাম সোন্নেরাতিয়া আপিতালা। সুন্দরবন অঞ্চলের সবচেয়ে সৌন্দর্যমন্দিত গাছ এটি। নতুন জৈব-বর্জ্য সমৃদ্ধ, মোটামুটি বা অধিক লবণযুক্ত মাটিতে এ গাছ ভাল জন্মে। বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের বিস্তৃত বনাঞ্চলে এই গাছ দেখা যায়। সরল পাতা বিপরীতমুখী, ফুল উভলিঙ্গ। ফল প্রায় গোলাকৃতির এবং ব্যাস ২-৩ মিলিমিটার। এর পাতা জিওল গাছের পাতার মতো সরু-লম্বাটে। ছোট ছোট হলুদ বর্ণের ফুল হয়। এ ফুলের মধুও সুস্বাদু। একটি ফলে বীজের সংখ্যা ২৫-১২৫টি। কেওড়া ফলের আকৃতি ডুমুরের মতো। সবুজ রঙের ফলের ওপরের মাংসল অংশটুকু টক স্বাদের। ভেতরে বেশ বড় বীচি।

হরিণ আর বানরের উপাদেয় খাদ্য হলেও বহু বছর আগ থেকে মানুষ ও মাছের খাদ্য এটি। এ ফল রান্না করে খাওয়া যায়, অনেকে ডালের সাথেও খেয়ে থাকেন। টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় কাঁচা লবণ দিয়ে খাওয়া যায়, আচার হিসেবেও খেয়ে থাকেন এ অঞ্চলের মানুষ। এমনকি এ ফল সিদ্ধ করে রস পান করলে আমাশয় ভালো হয়ে যায়- জানান, বরগুনার কবিরাজ মুকুল রায়। মৎস্য চাষীরা জানিয়েছেন, ফলটি পঁচিয়ে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

কেওড়া ফলের ব্যবহার ও গুণ

কেওড়া ফলের আকৃতি ডুমুরের মতো। সবুজ রঙের ফলের ওপরের মাংসল অংশটুকু অল্প স্বাদের। ভেতরে বেশ বড় বীচি। সবচেয়ে বেশি উপাদেয় খাদ্য হরিণ আর বানরের। তবে বহু বছর আগে থেকে মানুষ ও মাছের খাদ্য এটি। এ ফল রান্না করে খাওয়া যায়। অনেকে ডালের সাথেও খেয়ে থাকেন এটি। টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় কাঁচা লবণ দিয়ে খাওয়া যায়। ফলটি পঁচে গেলে চাষীরা মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করেন।

কেওড়া ফল সংগ্রকারীরা জানিয়েছেন, অনেক দরিদ্র পরিবার এ ফল আহরণ ও বিক্রি করছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে শুধু পাথরঘাটা ও আশারচর থেকেই ৫০ টনের মতো ফল বিক্রি করা হয়ে থাকে। সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, নলতা, কুলিয়া, মৌতলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফল পাঠানো হয়। কখনো কখনো সুবিধা বুঝে দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হয়ে থাকে। প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব রব্বানী জানান, কেওড়া ফল একটি সম্ভাবনাময় ফল, এ সুস্বাদু ফল নিয়ে তাদের গবেষণা চলছে। আচার থেকে শুরু করে খাবারেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুলেও রয়েছে মধু। গবেষণায় ফলটিতে ক্ষতিকর কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।

বনবিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সোলায়মান হাওলাদার জানিয়েছেন, কেওড়া গাছ ও ফল পাচার-বিক্রি আইনত দন্ডনীয়। কেওড়া ফল বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানির সরকারী উদ্যোগ নেয়া হলে প্রচুর রাজস¦ আয় করা সম্ভব।

বরগুনার আমতলী সরকারী কলেজের অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক প্রনব কুমার কর্মকার বলেন, এমনিতেই কেওড়া ফলের ব্যবহার থেমে থাকছে না। চোরাই পথে তা পাচারও হচ্ছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় কেওড়া ফলের চাষ ও বাণিজ্যকরণ হলে অর্থনীতিতে নতুন মাত্র যোগ হতে পারে। তবে প্রকৃতির এই সম্পদকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে বলেন, এখন পর্যন্ত কেওড়া গাছ ও ফল পাচার-বিক্রি আইনত দন্ডনীয়। তবে সরকার কেওড়া ফল বাধণিজ্যিকভাবে রফতানি করলে প্রচুর রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।