• আজ রবিবার, ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ২৮ নভেম্বর, ২০২১ ৷

গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি রসমঞ্জরি


❏ শনিবার, আগস্ট ২০, ২০১৬ দেশের খবর, রংপুর

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধা জেলার ঐতিহ্যবাহী সু-স্বাদু ও সর্বজন প্রিয় মিষ্টি হচ্ছে রসমঞ্জরি। এ মিষ্টি সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত আছে, একবার এর স্বাদ মুখে লাগলে তা ভোলা খুবই কষ্টকর।

rosgolla

জেলার নামের সঙ্গে রসমঞ্জরি শব্দটি নিবিড়ভাবে জড়িত বলে দেশের যেকোনো এলাকা থেকে কেউ গাইবান্ধা এলেই প্রথমে রসমঞ্জরির স্বাদ আস্বাদন করতে চান। এর স্বাদ না নিতে পারলে গাইবান্ধা ভ্রমণই যেন বৃথা।

অতিথি আপ্যায়ন ও যাবতীয় আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালতে ফাইলবন্দি কাজও হাসিল করা যায় এই রসমঞ্জরির বিনিময়ে। না খেলে কাউকে বিশ্বাসই করানো যাবে না এর কী মজা।

রসমঞ্জরি শুধু তাই এতদঞ্চলেই নয়, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশেও যায় মানুষের রসনাতৃপ্তি মেটাতে। এই মিষ্টির কাবিক্য নামের মধ্যেই রয়েছে তার ভিন্নতা। রসালো ঘন দুধের ক্ষীরের সঙ্গে খাঁটি ছানায় তৈরি মারবেল সদৃশ্য ছোট ছোট গোলাকার রসগোল্লা সমন্বয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি। মুকুল থেকে সদ্য বেরুনো আমের গুটির মতো রসগোল্লা দুধের ঘন ক্ষীরে মঞ্জরিত হয়ে দুটি ভিন্ন স্বাদের সমন্বয়ে সৃষ্টি করে তৃৃতীয় মাত্রার অপূর্ব স্বাদ। তাই এই মিষ্টির নাম (রস+মঞ্জরি) রসমঞ্জরি।

কোন কারিগর প্রথমে রসমঞ্জরি তৈরি করেছেন তার নাম জানা না গেলেও রসমঞ্জরি প্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন গাইবান্ধা শহরের মিষ্টি ভান্ডারের মালিক রাম মোহন দে। ব্যবসায়িকভাবে ১৯৪০ সালে রসমঞ্জরির উৎপাদন শুরু হয় এবং ১৯৫০ সালের দিকে এর সুনাম ও পরিচিতি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

গাইবান্ধা জেলা শহরের সার্কুলার রোডের রমেশ ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডারের রমেশচন্দ্র ঘোষ পঞ্চাশের দশকে রসমঞ্জরিকে শুধু নিজ জেলাতেই নয় বরং গোটা দেশের মিষ্টি প্রিয় রসিকজনদের কাছে পরিচিত এবং সুপ্রিয় করে তোলেন। তারপর আর থামানো যায়নি এই রসমঞ্জরির বিস্তার। এগিয়েছে সম্মুখে মিষ্টি প্রিয়দের মন জয় করে। এ কথা সত্য যে রসমঞ্জরির আদি সেই স্বাদের যথেষ্ট ঘাটতি এখানকার মিষ্টিতে রয়েছে।

জেলা শহরের গাইবান্ধা মিষ্টান্ন ভান্ডার, রমেশ ঘোষ মিষ্টির দোকান, পুষ্প মিষ্টান্ন ভান্ডার, জলযোগ মিষ্টান্ন ভান্ডার, সন্তোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার, কালিবাবুর মিষ্টির দোকান, দেব মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং পলাশবাড়ি উপজেলা সদরের শিল্পী হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট ও মিতালি হোটেল, গোবিন্দগঞ্জের মায়ামনি ও বনফুল হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্টে ভালমানের রসমঞ্জরি পাওয়া যায়।

রমেশ ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডারের প্রোপাইটর বলরাম ঘোষ জানান, প্রতকেজি রসমঞ্জরি ২শ’ ৫০ টাকা এবং প্রতিপ্লেট ৫০ টাকা ও হাফপ্লেট ২৫ টাকা দরে বেচাকেনা চলে। বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানোর ক্ষেত্রেও নিজস্ব গোলাকার প্লাষ্টিক পাত্রে টেপ দিয়ে এয়ারটাইট প্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।

রসমঞ্জরি তৈরী কারীগর ভক্ত ঘোষ জানান, এই মিষ্টি তৈরির উপকরণে থাকে শুধু খাঁটি গরুর দুধ, চিনি, দুধের ছানা এবং মশলার মধ্যে ছোট এলাচ। তৈরির পদ্ধতি এমন কিছু কঠিন নয়। শুধু গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন ক্ষীর করতে হবে এবং তাতে মেশাতে হবে পরিমাণ মতো চিনি। এছাড়া ছানা দিয়ে ছোট ছোট গোলাকার গুটি তৈরি করে চিনির সিরায় জ্বাল দিতে হবে। বাদামী রং হলে ছাকনি দিয়ে সিরা ঝরিয়ে রসগোল্লার গুটিগুলো ক্ষীরে মেশানো হয়। পরে ঠান্ডা করে ক্ষীর গুটিগুলোসহ রসমঞ্জুরি প্লেটে পরিবেশিত হয়।

তিনি আরও জানান, প্রতিকেজি রসমঞ্জরির গড় উৎপাদন ব্যয় পড়ে প্রায় ২শ’ ২৫ টাকা থেকে ২শ’ ৩০ টাকা। তবে দুধ, চিনি, ময়দা, এলাচ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ কারিগরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এই মিষ্টি তৈরিতে লাভের পরিমাণ অনেকটা কমে এসেছে।

রসমঞ্জুরি বিক্রেতা অজিত ঘোষ জানান, খাঁটি দুধ প্রাপ্তি এবং কারিগরের দক্ষতার ওপরই নির্ভর করে রসমঞ্জরির গুণ, মান ও স্বাদ। তবে অধিক লাভের আশায় ছানা ও ক্ষীরে বেশি পরিমাণ আটা, সুজি ও অন্যান্য ভেজাল মিশিয়ে গ্রামগঞ্জে অনেক মিষ্টির দোকানে নিম্নমানের রসমঞ্জরিও আজকাল তৈরি হচ্ছে। যাতে এ জেলার ঐতিহ্যবাহি এই মিষ্টির সুনাম বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।