সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস গড়া সেই সোনার মেয়েদের এবার জুতাপেটা ও দাঁত ভেঙে দেওয়ার হুমকি!

১:০১ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৬ খেলা, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর – ‘বন্ড সই দিয়ে আপনাদের মেয়েদের নিয়ে যান। ওরা আর কোনদিন স্কুলে পড়া তো দূরের কথা, নাম নিলেই ওদের জুতাপেটা করে দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে।’

৯ নারী ফুটবলারদের অবিভাবকদের এমনিটিই বলেছেন শরীরচর্চা শিক্ষক জোবেদ আলী।

টানা দু’বার এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরব অর্জনের পর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বেও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যেসব ফুটবল কন্যারা তাদের কপালে পুরস্কারের বদলে জুটেছে তিরস্কার!

গতকাল বুধবার (০৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা থেকে ধোবাউড়াগামী লোকাল বাস নিলয় পরিবহণ নামের একটি লোকাল বাসে বাংলাদেশের নারী ফুটবলে ইতিহাস সৃষ্টিকারী সোনালী মেয়েদের বাড়ি ফিরতে হয়। বাসটি থেমে যাত্রী তুলছে রাস্তায়। যাত্রা পথে বিভিন্ন স্থানে কটূক্তি আর অশ্লীল বাক্য শ্রবণ করতে হয় তাঁদের। কয়েকজন এসে প্রচণ্ড খারাপ ভাষায় কথা বলে। কয়েজকজন পাশে দাঁড়ালেও তাদেরও শুনতে হয় বাজে কথা।

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ”সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের উদাসীনতাকে” দায়ী করে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় কাটতে না কাটতেই ঘটে গেছে আরো একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা।

অসাধারণ নৈপুণ্যের মাধ্যমে দেশের ফুটবলে নবজাগরণের সূত্রপাত করা প্রমীলা ফুটবলারদের কদর মোটেও বুঝতে পারেনি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সংবর্ধনা ও সাফ ফুটবলের চ্যাম্পিয়নশিপ ক্যাম্পের ব্যস্ততার কারণে ৪৫তম গ্রীষ্মকালীন ফুটবল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের এমন লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।

অসাধারণ কীর্তি গড়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা এসব মেয়েরা ঘরে ফিরেও নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের আচরণে হতবাক ও মর্মাহত। বিদ্যালয় থেকে এসব শিক্ষার্থীদের ছাঁটাইয়ের হুমকিতে উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে সময় কাটছে তাদের।

অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল টিমে খেলছেন গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষা গ্রাম কলসিন্দুরের ৯ ফুটবলার। এএফসি অন‍ূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বে অপরাজেয় থেকে গত মঙ্গলবার (০৬ সেপ্টেম্বর) বাড়ি ফিরেছেন গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যরা।

কিন্তু বাড়ি ফেরার একদিন পরেই সেই আনন্দ যেন ফিকে হয়ে গেছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রীষ্মকালীন ফুটবল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে কুমিল্লা যাচ্ছে কলসিন্দুর উচ্চ বিদ্যালয়।

bd-womans-football

এ প্রতিযোগিতায় নিজেদের বিদ্যালয়ের হয়ে খেলতে সানজিদা-মার্জিয়া-তাসলিমা ও তহুরাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বুধবার (০৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিদ্যালয়ে নিজেদের অভিভাবকসহ ডেকে আনা হয় ওই ৯ নারী ফুটবলারকে।

ইতিহাস গড়া বাংলাদেশের সোনার মেয়েরা লোকাল বাসে চরম লাঞ্ছনার শিকার ! (ভিডিও)

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল দলের দ্বিতীয় গোলরক্ষক তাসলিমা বলেন, ‘শিক্ষকদের তলবে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে তারা গিয়েছিলেন নিজেদের বিদ্যালয়ে। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাফুফে আমাদের সংবর্ধনা দেবে। এ জন্য ১৬ সেপ্টেম্বর আমাদের ঢাকায় যেতে হবে। সাফ ফুটবলের ক্যাম্পও শুরু হবে ক’দিন বাদেই। এ সব বিষয় তুলে ধরলে উল্টো আমাদের শরীরচর্চা শিক্ষক জোবেদ আলী ক্ষেপে যান।

এ ঘটনায় তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়াকে (৪০) মারধর করেছেন কলসিন্দুর হাই স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক জুবেদ তালুকদার ও তাঁর সহযোগীরা। বুধবার রাতে জেলার ধোবাউড়ার কলসিন্দুর বাজারের মহিলা মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে তাসলিমার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে  ঘটনার বিচার দাবি করেন এবং অভিযুক্তদের বিচার দাবি করেন।

তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার বিকেলে কলসিন্দুর হাই স্কুলের শরীর চর্চা শিক্ষক জুবেদ তালুকদার অনূর্ধ-১৬ নারী ফুটবল জাতীয় দলের ৯ খেলোয়াড় এবং তাদের অভিভাবকদের নিয়ে সভা করেন। সভায় জুবেদ তালুকদার ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করেন এবং স্কুল টিমের হয়ে খেলতে বলেন।

উপস্থিত অভিভাবক ও খেলোয়াড়রা তার এই কথার বিপরীতে কথা বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন জুবেদ। এ নিয়ে বিবাদ হয়। এরপরে রাত ৯টায় কলসিন্দুর বাজারে মহিলা মার্কেটে জুবেদ তালুকদার ও তাঁর সহযোগীরা তাসলিমার বাবা সবুজকে কিল ঘুষি মারেন এবং লাঠিপেটা করেন। ওই সময় তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানান সবুজ মিয়া।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, ময়মনসিংহ রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আক্কাছ উদ্দিন ভু্ষ্ণা সাংবাদিকদের বলেন, ধোবাউড়া থানার ওসিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলম জানান, এসআই মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে অভিযুক্তদের কাউকেই সেখানে পাওয়া যায়নি।

উদ্বিঘ্ন তাসলিমা বলেন, ‘সামনে আমাদের কয়েকজনের টেস্ট পরীক্ষা। যদি আমাদের রেজিস্ট্রেশন না করে টিসি দিয়ে দেয় তাহলে তো আর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হবে না।’সেরা এগারতে খেলা গোলকিপার মাহমুদা আক্তারও করেন একই অভিযোগ।

এর আগে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে চরম দুর্ভোগ এবং ভোগান্তির শিকার হয় কলসিন্দুরেরর নারী ফুটবলাররা। লোকাল বাসে করে ময়মনসিংহ যেতে হয় তাদের। পথে কয়েকজন যাত্রীর কটূক্তির পাশাপাশি শোনতে হয়েছে অশ্লিল ভাষায় গালাগালাজও। এতে হতভাগ ক্ষুব্ধ মারিয়া ও সানজিদারা।

ঢাকা থেকে ধোবাউরাগামী বাস। থেমে থেমে উঠানো হচ্ছে যাত্রী। আর এই লোকাল বাসেই কিনা বাড়ি ফিরছেন ইতিহাস গড়া বাংলাদেশের অনুর্ধ্ব-১৬ দলের কলসিন্দুরের নারী ফুটবলাররা।

ইতিহাস গড়া বাংলাদেশের সোনার মেয়েরা লোকাল বাসে চরম লাঞ্ছনার শিকার ! (ভিডিও)

এতো বড় অর্জনের পর মেয়েরা কলসিন্দুরে ফিরছে লোকাল বাসে করে। সঙ্গে ছিলেননা  কোন অভিভাবক বা বাফুফের কেউ।

আর বাসে তাদের শুনতে হয়েছে বিভিন্ন লোকের অশ্লীল কটূক্তি। শুনতে হয়েছে গালিগালাজ। এছাড়াও ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে তাদের।

দেশের জন্য এতো কিছুর করার পর এই ছিল তাদের প্রাপ্তি! এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত কলসিন্দুরের মেয়েরা।

চলন্ত অবস্থায় দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে এক ফুটবলার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এত সুন্দর একটা রেজাল্ট করলাম আমরা। বাংলাদেশের জন্য খেললাম…কিন্তু এই (ঘটনার পর) যাত্রাটা বইতেছি তা খুব কষ্ট লাগতাছে।’

এদিন ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফিরতে ঢাকা মহাখালি বাস স্ট্যান্ড থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাসে উঠে কলসিন্দুরের এই নারী ফুটবলাররা আর পৌঁছায় বেলা ৩টায়। সাথে ছিলো না কোনো অভিভাবক বা বাফুফের কর্মকর্তা।

বিষয়টি অবাক করার মতোই । ।বাংলাদেশের নারী ফুটবলকে যারা এগিয়ে নিয়ে গেলো বিশ্বের দরবারে, এনে দিলো সম্মানের মুকুট তাদের বাড়ি ফেরা লোকাল বাসে অভিভাবক বিহীন।

তারপরও সীমাহীন দুর্ভোগ শেষে ঈদে বাড়ি ফিরছে এইটুকুই তাদের সান্তনা। তবে মেয়েদের এই দুর্ভোগ আর ভোগান্তিতে হতভাগ তাদের অভিভাবক ও এলাকাবাসী।

আর বাফুফের এই ধরনের দায়িত্বহীন কাজে হতাশ হয়ে এর নিন্দা জানায় কলসিন্দুরের নারী ফুটবলারদের পরিবার ও এলাকাবাসী।

লাঞ্ছনার শিকার হওয়া এক মেয়ের অভিভাবক বলেন, আমরা যখন মেয়েদের বাড়ি থেকে বিদায় দেই, তখন থেকে বাংলাদেশ সরকার বা ফেডারেশনের ওপরই থাকে। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে ফেডারেশনের কোনও প্রতিনিধি না থাকার জন্যই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারা যদি এভাবে মেয়েদেরকে পথে ছেড়ে দেয় তাহলে আমরা তাদেকে আর ভরসা করতে পারবো না।