মোটাতাজা কোরবানির পশু ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি..!

৪:৩৩ অপরাহ্ন | শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৬ আপনার স্বাস্থ্য, স্পট লাইট

qurbani-animals


স্বাস্থ্য ডেস্কঃ

হাদিসে মোটা তাজা সুন্দর পশু কোরবানি করতে বলা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এতে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই মোটাতাজা গরু কোরবানি করতে উৎসাহিত হবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ঈদের আগে অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থায় গরু মোটাতাজা করা হয়। বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে বা ট্যাবলেট খাইয়ে পশু মোটাতাজাকরণ অত্যন্ত গর্হিত কাজ, যা আদৌ শরীয়তসম্মত নয়। কেননা এর মাধ্যমে ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণাই করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। প্রতারণা করা ও ধোঁকা দেয়ার কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ (ছহীহ ইবনু হিববান হা/৫৬৭, মুসলিম হা/১০২, ছহীহাহ হা/১০৫৮)। কোরবানির ঈদ মুসলমানদের জন্য অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। সারা বছরজুড়ে বিভিন্ন দেশের মুসলিমগণ এই উৎসবের জন্য অপেক্ষা করেন। এই দিনে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সারা বিশ্বজুড়ে সাধারণত প্রচুর পশু কোরবানি দেয়া হয়।

অনৈতিক পন্থায় না গিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে গরুর স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করা যায়। সাধারণত পশুকে প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা ও সুস্থ রাখতে খড়, তাজা ঘাস, খৈল ও ভুসিসহ পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়। এ নিয়ম বিজ্ঞানসম্মত। যুগ যুগ ধরে তাই অনুসৃত হয়ে আসছে। এ নিয়মে পশু মোটাতাজা করা হলে ক্রেতা একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, একই সঙ্গে এ ধরনের পশুর মাংস খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে না।

মাংস ব্যবসায়ীদের মতে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরই কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজাকরণের ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে ওঠে এক শ্রেণীর খামারি। ঈদের কিছুদিন আগে রোগাক্রান্ত ও শীর্ণকায় গরু অল্প টাকায় কিনে অধিকহারে মুনাফা লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড বড়ি, ইউরিয়া ও নিষিদ্ধ পাম বড়িসহ বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানোর এবং স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। উদ্দেশ্য একটাই, গরুকে দ্রুত মোটাতাজা করানো অর্থাৎ মোটা মানেই বেশি গোস্ত, বেশি লাভ। এসবের ব্যবহারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গরুর ওজন বেড়ে যায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহারের অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মানুষের বেলায় যেমন দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদী পারিপার্শ্বিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তেমনি পশুর ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা থেকেই যায়। গরু মোটা তাজাকরণের জন্য অনেক উচ্চমাত্রায় স্টেরয়েড খাওয়ানো হয়ে থাকে। এতে একদিকে প্রাণীটির স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তেমনি এ ধরনের মাংস খাওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।

স্টেরয়েড ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে গরুর দেহ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তার দেহের চর্বি কোষগুলো বাড়ে। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় পশুর হৃৎপি-, কিডনি ও যকৃৎ, কমে যায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। অনেক সময় এসব ওষুধ সেবনে পশুর হার্ট এ্যাটাক হয়ে মারাও যেতে পারে। এই জাতীয় গরুর গোশত যদি মানুষ নিয়মিত গ্রহণ করেন, তাহলে মানুষের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণ করার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। যেমন উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধমণী চিকন হয়ে হƒদরোগ এমনকি ব্রেন স্ট্রোকও হতে পারে। অনেক সময় রোগী মোটা হয়ে যায়, ফলে এ ধরনের জটিলতা আরও বৃদ্ধি পায়।

স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা পশুর গোশত হয়ত দু’একদিন খেলে কিছু হবে না। কিন্তু নিয়মিত খেলে, কিংবা অভ্যাসে পরিণত হলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি থাকে। কোরবানির সময় আমরা প্রচুর রোগী পেয়ে থাকি। এ সময় মানুষ অনেক বেশি গোশত খায়। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা বদ্ধমূল যে, কোরবানির পশুর গোশত খেলে কোন ক্ষতি হয় না। আসলে এ ধারণা একেবারেই ভুল। আমরা লক্ষ্য করি, কোরবানির ঈদে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে। বেশি বেশি গোশত খেয়ে পেটের পীড়াসহ হৃদরোগে আক্রান্ত এমনকি স্ট্রোক হয়ে প্রচুর রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়।

আজকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যে প্রচুর ভেজাল দেয়া হচ্ছে। ভেজাল পণ্য খেলে মানুষের হƒদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, ক্যান্সারসহ অনেক রোগ বেড়ে যাচ্ছে। খাবার দাবারের ভেজালের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন অন্য ধরনের ভেজাল, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগকৃত গরুর গোসত। এক্ষেত্রে মানুষের সচেতনারও অভাব রয়েছে। প্রথমে যেটি করতে হবে তা হলো, রেড মিট ত্যাগ করতে হবে অথবা কম খেতে হবে। নিয়মিত প্রচুর গোসত খাওয়া যাবে না। কেবল গরুই নয়, মহিষ, খাসির গোশতের মধ্যেও প্রচুর চর্বি থাকে। সেগুলোও ত্যাগ করতে হবে। চর্বি জাতীয় খাদ্য যত পরিত্যাগ করা যাবে, ততই শরীর সুস্থ ও সবল থাকবে।

আসুন জেনে নিই ক্ষতিকারক ওষুধ খাওয়ানো মোটাতাজা গরু চেনার উপায়ঃ

১. অতিরিক্ত স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানো বা ইনজেকশন দেয়া গরুর পুরো শরীরে পানি জমে মোটা দেখাবে, তাই গরু কেনার সময় ওজনে ভারি, ফোলা ও চর্বিজাতীয় গরু না কেনাই উচিত।

২. এসব গরুর পেছনের দিকে ঊরুর পেশীবহুল জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে দেবে যাবে। কারণ বাইরে থেকে মাংস মনে হলেও এখানে মাংসের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে পানি থাকে। পশুর ঊরু অনেক মাংসল মনে হবে। পাগুলো মনে হবে অনেক পাতলা বা শুকনো।

৩. স্টেরয়েড খাওয়ানোর ফলে গরু অস্বাভাবিক মোটা হয়। কিন্তু দুর্বল ও অসুস্থতার কারণে সবসময় নীরব ও নির্জীব থাকে, নড়াচড়া কম করে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না, এমনকি খাবারও খেতে চায় না।

৪. অন্যদিকে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরুর স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। মাথা উঁচু, কান খাঁড়া, শরীর টানটান, তীক্ষ্ম থাকবে। গরুগুলো প্রাণোচ্ছ্বল ও প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ চটপটে ভাব থাকবে, দ্রুত হাঁটাচলা ও স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করবে। ভারি আওয়াজে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকবে এমনকি গুঁতো দিতেও উদ্যত হবে।

প্রশাসনের উচিত পশুর হাটগুলোতে তদাকরি করে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগে মোটা পশু চিহ্নিত করা। চিকিৎসকরা যে রকম দীর্ঘমেয়াদী স্টেরয়েড গ্রহণকারী রোগী দেখেই চিনতে পারেন, ঠিক সেরকম অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকরাও এ ধরনের স্টেরয়েড খাওয়ানো পশু দেখেই শনাক্ত করতে পারবেন। অনৈতিকভাবে স্টেরয়েড বা হরমোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা অবশ্যই নেয়া উচিত, এমনকি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। মৎস্য ও পশুসম্পদ আইনে (২০১০) স্পষ্ট উল্লেখ আছে, পশুকে অ্যান্টিবায়োটিক বা ক্ষতিকর স্টেরয়েড খাওয়ানো যাবে না। আর জনগণের মনে রাখা উচিত, খুব সুন্দর মোটা তাজা গরুর প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক এমনকি কম মোটা বা ছোট, শুকনা গরু কোরবানি করা ও তার গোশত খাওয়া অনেক নিরাপদ।