বাতাসে লাশের গন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সাড়ি, বেরিয়ে এলো অসহায় আরও ৪ শ্রমিকের লাশ


❏ রবিবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৬ Breaking News, আলোচিত বাংলাদেশ, ফিচার, স্পট লাইট

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, সময়ের কণ্ঠস্বর – বাতাসে লাশের গন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সাড়ি, স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষায় হাহাকার বাড়িয়ে খোঁজ মিললো অসহায় আরও ৪ শ্রমিকের ভস্মীভূত লাশের। টাম্পাকো ফয়লস কারখানায় আকস্মিক বিস্ফোরণের ঘটনায় গাজীপুরে টঙ্গীর বিসিক শিল্প এলাকায় এখনও থেমে থেমে চলছে শোকের মাতাম। পুরো এলাকার সর্বত্রই আগুনে পোড়া মানুষের লাশের গন্ধ। ফ্যাক্টরিতে নিহত আর নিখোঁজ স্বজনদের আহাজারিতে ভারী চারপাশ।

রোববারও ঈদের আনন্দকে পেছনে ফেলে নিখোঁজদের স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে। সেই অপেক্ষা কাটিয়ে টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীর ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আরো চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।

পরে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এফ এম আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোশারফ হোসেন জানান, রোববার বিকাল সাড়ে ৪টায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিস, গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে।

tongi-lash

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আগুন বিস্তারের আর সম্ভাবনা নেই। তবে ভবন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এ ছাড়া ভবন উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। এটি ঠান্ডা করার পর ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হবে।

‘উদ্ধার অভিযান আগামী ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলবে। তবে ধ্বংসস্তুপ সরানোর ব্যাপারে পরে চিন্তা করা হবে।’

উদ্ধার অভিযান শুরুর পর কারখানার সামনে ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে আরো চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ জনে।

বাতাসে লাশের গন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সাড়ি, নিহত আর নিখোঁজ স্বজনদের আহাজারিতে ক্রমশ ভারী হচ্ছে চারপাশ

মাত্র মাস দেড়েক আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন ইদ্রিস আলী। সংসারের বড় সন্তান ও প্রধান উপার্জনকারী ইদ্রিস বাবা-মা ও একমাত্র ছেলে সাব্বির (১০)কে বলে এসেছিলেন- কোরবানি ঈদে ছুটি পাবার সম্ভবনা কম। এজন্য ঈদের আগে বাড়ি এসেছেন। কিন্তু কে জানতো, ওই যাওয়াই ছিল জীবিত ইদ্রিসের শেষ যাওয়া। শোকাহত স্বজনরা এখন অপেক্ষা করছেন ইদ্রিসের লাশের জন্য। টঙ্গীর বিসিক শিল্প এলাকার টাম্পাকো ফয়সল লিমিটেড প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে সবার থেকে চিরতরে ছুটি নিতে হলো ইদ্রিসকে।

শনিবার বেলা ৩টার দিকে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর বছর ত্রিশের নিষ্প্রাণ ইদ্রিস আলীকে পাওয়া যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গের পাশে। ট্রলির উপর ইদ্রিস আলীকে রাখা হয়েছিল ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাদা রঙা লাশবাহী ব্যাগে। ব্যাগের উপরে স্কচটেপ দিয়ে ইদ্রিস আলীর ছবি ও এক টুকরো কাগজ লাগানো ছিল। কাগজে হাতে লেখা ছিল নাম-পরিচয়।

মাছি ভনভন করে উড়ছিল-বসছিল লাশের ব্যাগে। খুব কাছেই গগন বিদারী আর্তনাদ করছিলেন- বয়সে ইদ্রিসের ছোট ও একমাত্র বোন সামিনা। মোবাইল ফোনে গ্রামের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, আর ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বুকফাটা চিৎকার করছিলেন।

বিলাপ করতে করতে জানাচ্ছিলেন,  ‘ঈদের আগে বাড়ি আইস্যা আমারে কইছিল, ঈদে বাড়িত আসুমনা হয়তো আর, ছুটি নাই। কিন্তু এমনে আমাগোরে ছাইরা ভাই এক্কারে গেল গা, এইটা কেমনে হয়। ওর বাচ্চা কারে বাপ কইয়া ডাকব,  বাবা-মায়েরে কে দেখব . . .’।

ইদ্রিসের  বোন সামিনা কিছুক্ষণ পর পর যাচ্ছিলেন ভাইয়ের লাশের পাশে। লাশ ছুঁয়ে আহাজারি করে বলছিলেন, ‘ভাই রে, আমারে কে দেইখা রাখব, কেডায় আমার খবর লইতে বাসায় যাইব। তুমি উঠো ভাই, তোমার কিছু হয় নাই . . . ’।

এমন শত শত স্বজনের হাহাকার আর বুকফাটা আর্তনাদ চলছেই ……

উল্লেখ্য, গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীর প্যাকেজিং কারখানায় বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারখানার ৯ জন নিখোঁজ শ্রমিক-কর্মচারীর একটি তালিকা করেছে জেলা প্রশাসন।

‘টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড’ নামের ওই কারখানার পাশে জেলা প্রশাসনের খোলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে রোববার দুপুরের দিকে এ তথ্য জানানো হয়।