দিনাজপুরে চামড়া নিয়ে বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা: পাচারের আশংকা !

❏ বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৬ রংপুর

শাহ্ আলম শাহী,স্টাফ রিপোর্টার,দিনাজপুরঃ উত্তরের সীমান্ত জেলা দিনাজপুরে চামড়া ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। এবার ট্যানারী মালিকদের নির্ধারণ করা দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনে লোকসানে পড়েছেন দিনাজপুরের মৌসুমি ব্যবসায়িরা। আশানুরূপ দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন অনেকেই। কেউবা লোকসানের হিসাব কষেই চামড়া বিকিকিনি করেছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চামড়া পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচারের। তবে এ বিষয়ে সতর্ক সীমান্তে নিয়োজিত বিজিবি সদস্যরা।

ঈদের দিন দুপুর থেকে রাত গড়িয়ে ঈদের দ্বিতীয় দিন আজ বুধবার দুপুর পর্যন্ত দিনাজপুরের রামনগর চামড়াপট্রি এলাকার ব্যবসায়ি ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে মিলেছে এমনি এ তথ্য।

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ি রমজান আলী, পারভেজ,রাশেদুলসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ি জানান, একদিকে দাম কম, অন্যদিকে ট্যানারী মালিকদের সিন্ডিকেট। একারণেই মরতে বসেছে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।ট্যানারী মালিকরা চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেই দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে চামড়া কিনেছেন বলে জানান তারা।
dinajpurএদিকে গত বছরের চেয়ে এবার ঈদে চামড়ার আমদানি অনেক কম হয়েছে জানিয়েন চামড়া ব্যবসায়ী তোসাদ্দেক হোসেন । তিনি জানান, একদিকে লবনের দাম বেশি অন্যদিকে চামড়ার দাম কম। বিক্রেতা আছে কিন্তু ক্রেতা নেই। সবাই ভালো দাম পাবার আশায় চামড়া কিললেও বাজারে এসে অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন।তিনি বলেন, গত বছর ঈদের দিন যেখানে আড়াই হাজারের বেশি চামড়া ক্রয় করেছেন। এবার তার দুই ভাগও ক্রয় করা হয়নি তাদের। তবে ট্যানারী মালিকদের দেয়া দামের চেয়ে বেশি দামেই অনেকেই চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানান এই ব্যবসায়ি।

এদিকে সৌখিন মোকাররম,মিন্টু সৈয়দ,ইব্রাহিমসহ বেশ কয়েকজনের সাথে বলা বলে জানা গেছে, গতবার লাভের মুখ দেখায় এবারও তারা চামড়া কিনেছিলেন। কিন্তু বিক্রি করতে এসে এমন লোকসান হয়েছে যা ভাবতেই পারেনি তারা। হঠাৎ করেই এমন দর পতনের কারণে এবার চামড়া কিনতে তেমন বেশি ক্রেতাও ছিলেন বলে জানান একদিনের এই ব্যবসায়িরা।

রামনগর এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, গতবছরের এবার চামড়ার গুদামের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। নেই চামড়া কেনার ট্যানারী মালিকদের কোন প্রতিনিধি। আর স্থানীয় যে ব্যবসায়ি চামড়া কিনেছেন, তারা লবন দিয়ে প্রক্রিয়া করে রেখেছেন।
বৃহত্তর দিনাজপুরের ৩ জেলায় ( ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়-দিনাজপুর) এবার প্রায় ২ লক্ষাধিক পশু কোরবানি হলেও চামড়ার আমদানি হয়েছে অর্ধেকের মতো। আর দিনাজপুর জেলা শহরে চামড়া কেনা-বেচা হয়েছে অন্তত ১০ হাজার। এখানকার ব্যবসায়িদের দাবি-গেল চার-পাঁচ বছর ধরে ঈদ এলেই চামড়ার আমদানি কমে আসে।

দিনাজপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের সাবেক সভাপতি তৈয়ব উদ্দিন চৌধুরী জানান, লোকসানের বোঝা দিন দিন ভারি হওয়ার কারণে প্রবীণ ব্যবসায়িরা এ ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। অনেকেই চামড়া ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যবসা করছেন। কেউ কেউ এখনো ট্যানারী মালিকদের কাছ থেকে আগের পাওনা টাকাই পাননি। এসবে প্রভাব পড়ে ঈদ এলেই।তিনি বলেন, এবার ঈদে চামড়ার আমদানি কম হওয়ার অন্যতম কারণ ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট। তারা এমন দাম বেঁধে দিয়েছেন যাতে ব্যবসায়ি চামড়া বিমুখ হন। এ অবস্থা চলতে থাকলে পাচারের পথ প্রসারিত হয়ে আগামীতে চামড়া শিল্প আরো বড় সংকটে পড়বে বলেও জানান তিনি।

এদিকে চামড়া কিনে মৌসুমী ক্রেতারা এখন দারুণ বেকায়দায়। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন যে দর বেঁধে দিয়েছিল সেই দরে চামড়া কিনতে পারেনি বেশিরভাগ মৌসুমী ক্রেতা।
এবার ট্যানারি মালিকদের সংগঠন ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশ ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে বর্গফুট প্রতি ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে এই দাম ৪০ টাকা। অর্থাৎ লবণছাড়া দাম হওয়ার কথা আরও কম। কিন্তু এই হিসাব ধরে চামড়া কিনতে পারেনি মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, কেনা দামের চেয়ে এবার আড়তে দাম কম বলা হচ্ছে তিন থেকে চারশ টাকা। এই অবস্থায় শত শত কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

ট্যানারি মালিকরা বর্গফুট হিসেবে চামড়ার দর ঠিক করে দিলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন চোখের আন্দাজে। এখন আড়তে নিয়ে এসে বর্গফুট হিসেবে বেচতে গিয়ে দেখলেন ব্যবসায় নেমে ঠকে গেছেন প্রায় সবাই। একেকটি চামড়া তারা এক হাজার থেকে ১৬০০ টাকা দরে কিনেছেন। কিন্তু আড়তে আটশ টাকার বেশি বলা হচ্ছে না।
সারা দেশেই দর পড়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী দেশে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছে খোদ প্রশাসন। এ জন্য দিনাজপুরের সীমান্ত জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।