• আজ ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

‘লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে কামলা তৈরি হয়, গবেষক নয়’

❏ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৬ শিক্ষাঙ্গন, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে উল্লেখ করে নির্দেশনা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অনিয়ম কমাতে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সচিবের কাছে এ নির্দেশনা পাঠায়। খবর- যুগান্তর

public-university20151226142839তবে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে সংশোধিত এ নির্দেশনা গতকাল বুধবার জানাজানি হয়। এরপর থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তাসহ নানা মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ ধরনের নির্দেশনা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা এ উদ্যোগকে ‘অধিকতর দলবাজ-অনুগত’ নিয়োগের নয়া কলা-কৌশল বলে অভিহিত করেছেন।

শিক্ষকদের ভাষ্যে, মুখস্থ বিদ্যার মাধ্যমে আমলা হওয়া যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা যায় না। লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে কামলা তৈরি করা যায়, গবেষক তৈরি করা যায় না। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা এখনই বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে চাননি। তারা বলেছেন, আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় ইউজিসি। তাদের নির্দেশনার চিঠি হাতে পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, ইদানিং বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ অনভিপ্রেত অবস্থার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত গোয়েন্দা বিভাগের গোপনীয় প্রতিবেদনে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে দুটি সুপারিশ করেছে।

সুপারিশ দুটি তুলে ধরে এতে বলা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের আগে কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশ বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যাদি যাচাই করা হয় না। ফলে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তি বা অপরাধীরা নিয়োগের সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের আগে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে নিয়োগ করা যাবে।

শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয় জানিয়ে নির্দেশনায় আরও বলা হয়, এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হলে প্রার্থীর মেধা যাচাই করা সহজ হবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

এ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইউনিভার্সিটির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আলী রিয়াজ। নিজের ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘যা প্রস্তাব করা হয়েছে, তা আদৌ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলা যায় কিনা সেটাই বুঝতে পারছি না।’

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, ১৯৮৪ সাল থেকে হিসেব করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২১ বছর শিক্ষকতার সৌভাগ্য হয়েছে। গত নয় বছর ধরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় চেয়ারের দায়িত্ব পালন করছি। এই সব অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার বিস্ময়। এখানে কী কী প্রসঙ্গ আছে? আছে ‘লিখিত পরীক্ষা’, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’, ‘একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন’, ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই’, ‘সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত … যাতে নিয়োগ না পায়’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক খোরশেদ আলম নিজের ফেসবুকে লেখেন, ‘অনিয়ম এড়াতে… হা হা… এখনো অনিয়ম এড়ানোর কিছু কি বাকি? তার অর্থ সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে! তাহলে যারা অনিয়ম করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে, ব্যবস্থা নেয়া হোক আগে! এবং অনিয়ম করে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তদন্তসাপেক্ষে তাদের ছাঁটাই করা হোক! তবেই বোঝা যাবে এ নয়া-উদ্যোগ ‘অধিকতর দলবাজ-অনুগত’ নিয়োগের নয়া কলা-কৌশল নাকি ‘অনিয়ম’ নির্মূলে কর্তৃপক্ষীয় সদিচ্ছা !!!’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সহকারী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ‘আমলা এবং গোয়েন্দা বন্ধুদের জন্য অত্যন্ত অনভিপ্রেত শুনালেও বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের গোয়েন্দা এবং আমলাদের জ্ঞানের পরিধি কতটা হলে এ ধরনের সুপারিশ করতে পারেন? যে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করা যায়- এটা কিভাবে সম্ভব? বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষা হলো মুখস্থ বিদ্যার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এক বছর বিসিএস গাইড বই গলাধঃকরণ করে ‘জি, জি স্যার’ মার্কা আমলা হওয়া যায়। অবশ্য একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক হলে আমলা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মধ্যে যে কোনো পার্থক্য থাকবে না, সে রাজনৈতিক অর্থনীতিটা আমলারা বুঝতে পেরেছেন। মুখস্থ বিদ্যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া- যাদেরকে আমরা উচ্চশিক্ষার তীর্থস্থান বলে মনে করি, সেখানে কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা নেয়ার বিধান নেই। অবশ্য, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভোটার নিয়োগের জন্য যেভাবে গণহারে একসাথে ৫-১০ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, সেভাবে এসব দেশে নিয়োগ করা হয় না। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগের নামে মেধাবী বাছাই করে না, তারা প্রয়োজনের নিরিখে শিক্ষক তৈরি করে।’

অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী আরও বলেন, ‘এটা মনে রাখতে হবে, লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে কামলা তৈরি করা যায়, গবেষক তৈরি করা যায় না। যদি করা যেত তাহলে বাংলাদেশে যত আমলা তত গবেষক থাকতো।’

শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে বিষয়টা বোঝা যাবে।’