• আজ ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মধ্যরাতে দুই জঙ্গির মোবাইলে মেসেজ আদান-প্রদান

৫:৪০ অপরাহ্ন | রবিবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৬ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- ২৭ আগস্ট। রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই দিন রাতে পাইকপাড়ার ৪১০/১ শাহ সুজা রোডের নূরউদ্দিনের বাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ। বাড়ির চারদিকে সশস্ত্র পুলিশের উপস্থিতি দেখে মোবাইল ফোনে ‘প্রটেকটেড টেক্সটে’র মাধ্যমে ‘আবু দুজানা’ ও ‘আবু ইব্রাহিম আল হানিফ’ নামে দুই ব্যক্তি যোগাযোগ করে। ২টা ২৩ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড থেকে ৩টা ৩৯ মিনিট ৫ সেকেন্ড পর্যন্ত টানা মেসেজ আদান-প্রদান করে দুজানা পরামর্শ নেয় হানিফের কাছে।

full_1141904058_1433663360পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে দুজানা মূলত নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সাংগঠনিক ছদ্মনাম ও আবু হানিফ হলো একই সংগঠনের আমির, যার প্রকৃত নাম সারোয়ার জাহান। সংগঠনে সে আবদুর রহমান ওরফে মোক্তার ওরফে প্রকাশ ওরফে বাবু নামে পরিচিত। ৮ অক্টোবর হানিফের আশুলিয়ার বাসা থেকে উদ্ধার করা বেশ কিছু আলামত পরীক্ষার পর বেরিয়ে এসেছে নারায়ণগঞ্জে ২৭ আগস্ট চালানো ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’-এর আগে নব্য জেএমবির দুই অন্যতম প্রধান শীর্ষ নেতার মধ্যে কী ধরনের কথোপকথন হয়েছে।

পুলিশ আস্তানা ঘিরে ফেলার পরপরই তামিম ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জেএমবির প্রধান হানিফের কাছে পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিস্তারিত জানতে চায়। পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে ওই আস্তানায় থাকা দুই সঙ্গীর গুলিতে তামিম ‘শহীদ’ হওয়ার নির্দেশনা চায় হানিফের কাছে। তখন হানিফ জানতে চায় তামিমের কাছে ‘ফল ও সামান রয়েছে কি-না।’ ফল বলতে গ্রেনেড ও সামান বলতে অস্ত্র বোঝানো হয়। তামিমের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ‘হ্যাঁ’-সূচক উত্তর পাওয়ার পর হানিফ নির্দেশ দেয়, ‘তাগুদ’দের বিরুদ্ধে ফল ও সামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। প্রয়োজনে ‘তাগুদ’দের হাতে শহীদ হতে বলা হয়। জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ‘তাগুদ’ বলে থাকে।

২টা ২৩ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে তামিম প্রথমে সারোয়ার ওরফে আবু হানিফকে ক্ষুদে বার্তা পাঠায়। সেখানে তামিম লিখে, ‘সালাম ভাই; এদিকে তাগুদ এসেছে।’ ২টা ২৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে পাঠানো বার্তায় সে জানায়, ‘আমরা ফাইটের প্রস্তুতি নিচ্ছি’। চার সেকেন্ড পর আরেকটি বার্তায় সে বলে, ‘আমাদের জন্য দোয়া করেন।’ এরপর সে জানায়, ‘ভাই, আমরা আল্লাহর কাছে যাচ্ছি।’ ২টা ৫১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে একটি ক্ষুদে বার্তায় হানিফকে তামিম বলে, ‘আনুগত্যে ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিয়েন।’ ১৮ সেকেন্ড পরে আরেকটি বার্তায় সে বলে, ‘আপনারা কাজ চালিয়ে যান।’ ২টা ৫২ মিনিট ৪ সেকেন্ডে তামিম জানায়, ‘যে প্ল্যান করেছি তা কাজে লাগায়েন।’ ৩টা ২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে আবু হানিফ পাল্টা ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে উত্তর দেয়, ‘ভাই কেমন আছেন, কী হয়েছে।’ ৩টা ২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে তামিম বলে, ‘ভাই, আমাদের জন্য দোয়া করেন।’

৩টা ৩৯ মিনিট ৫ সেকেন্ড পর্যন্ত জেএমবির অন্যতম প্রধান দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে মেসেজ আদান-প্রদান হতে থাকে। তামিম আমিরের কাছে বারবার জানতে চায়, মোবাইলের সিম ও সেট ভেঙে ফেলবে কি-না। উত্তরে আরও পরে মোবাইল সিম ও সেট ভাঙার নির্দেশ দেয় আবু হানিফ। নব্য জেএমবির আমির তামিমকে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ভাঙাসহ সব নথি নষ্ট করে ফেলার নির্দেশ দেয়। আরেক বার্তায় জেএমবির অন্য সদস্যদের আইডি নম্বর পাল্টে ফেলার কথা বলে হানিফ। উত্তরে তামিম জানায়, ‘হার্ডডিস্ক ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাল্টে ফেলা হয়েছে আইডিও, কিছু আলামত পোড়ানো হয়েছে।’ এরপর হানিফের নির্দেশ, ‘ফল মেরে ফাইট শুরু করো। প্রয়োজনে তাগুদের হাতে শহীদ হও।’

একটি মেসেজে তামিম বলে, ‘তাগুদরা দরজার সামনে পজিশন নিয়ে আছে। এখন কী করব?’ জবাবে আবু হানিফ বলে, ‘দরজার সামনে ফল ফিট করো। ওরা কি সময় নেবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাগুদরা অপেক্ষা করবে?’ জবাবে তামিম বলে, ‘ওরা মনে হয় সময় নেবে না। অভিযান শুরু করবে।’ একটি ক্ষুদে বার্তায় হানিফ বলে, ‘কে তাগুদদের এ আস্তানা চিনিয়ে আনল?’ উত্তরে তামিম সম্ভাব্য একটি নাম হানিফকে জানায়। এরপর হানিফের বার্তা_ ‘তাগুগদের সঙ্গে যা ভালো মনে হয় করেন।’ একটি ক্ষুদে বার্তায় তামিম বলে, “আস্তানার দু’জন প্রথমে আমাকে শুট করুক। এতে আমি শহীদ হবো। পরে ওরা ফাইট করবে।” এভাবে মারা গেলে ‘শহীদ’ হওয়ার ‘মর্যাদা’ পাওয়া যাবে কি-না জানতে চায় তামিম। উত্তরে আবু হানিফ বলে, ‘তাগুগদের হাতে শহীদ হও। সবাই ওদের হিট করেন।’

র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, নারায়ণগঞ্জে তামিমের আস্তানা পুলিশ ঘিরে ফেলার পর পুরো অপারেশন পরিকল্পনার ব্যাপারে সে জেএমবির প্রধান হানিফের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দু’জনের মধ্যে এক ঘণ্টার বেশি ফোনে যোগাযোগ হয়।