• আজ ৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ত্রিঘাত সমীকরণের প্রথম সমাধানকারী, ওমর খৈয়াম! (প্রথম পর্ব)

৮:২৯ অপরাহ্ন | সোমবার, অক্টোবর ২৪, ২০১৬ গুণীজন সংবাদ

ওমর খৈয়াম

আরেফিন শিমন, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর।

বহুমুখী প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিতে বলা হলে বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যাদের নাম উপেক্ষা করা কঠিন ওমর খৈয়াম তাদের মধ্যে অন্যতম ও শীর্ষস্থানীয়। ওমর খৈয়াম সাধারণত  বিখ্যাত কবি হিসেবেই  পরিচিত।

সাহিত্যের চেয়ে বিজ্ঞানে তাঁর অবদান অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার চতুষ্পদী কবিতার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন। মুলত একাদশ এবং দ্বাদশ খ্রীষ্টাব্দে গণিত এবং জোতির্বিদ্যায় তার মতো পন্ডিত ব্যক্তি আর কেউ ছিল না।

ইরানের নিশাপুর শহরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। পুরো নাম গিয়াসউদিন আবুল‌ ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরি। তিনি  জন্ম গ্রহণ করেছিলেন হিজরী পঞ্চম শতকের শেষের দিকে সেলজুক যুগে । তিনি ছিলেন মালিক শাহ সেলজুকের সমসাময়িক। অনেক ইতিহাসবিদের মতে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর কিছু আগে ওমর খৈয়াম জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।এখনকার ইরানের পুরাতন নাম ছিল পারস্য আর তার রাজধানী ছিল খোরাসান।

তাঁর পিতা ছিলেন তাঁবুর কারিগর ও মৃৎশিল্পী। ছোটবেলায় তিনি বালি শহরে সে সময়কার বিখ্যাত পণ্ডিত শেখ মুহাম্মদ মানসুরীর তত্ত্বাবধানে শিক্ষালাভ করেন। যৌবনে তিনি ইমাম মোআফ্ফাক-এর অধীনে পড়াশোনা করেন।

ওমর খৈয়ামের শৈশবের কিছু সময় কেটেছে অধুনা আফগানিস্তানের বালক্ শহরে। সেখানে তিনি বিখ্যাত মনীষী মহাম্মদ মনসুরীর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি খোরাসানের অন্যতম সেরা শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত ইমাম মোয়াফ্ফেক নিশাপুরির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। জীবনের পুরো সময় জুড়ে ওমর তার সব কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়ানো, সন্ধ্যায় মালিক-শাহ-এর দরবারে পরামর্শ প্রদান এবং রাতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চ্চার পাশাপাশি জালালি বর্ষপঞ্জি সংশোধন করতেন!

আসলে কোন কিছুতেই তাঁর নিষ্ঠার কোন কমতি ছিল না। ইসফাহান শহরে ওমরের দিনগুলি খুবই কার্যকর ছিল। কিন্তু আততায়ীর হাতে সুলতান মালিক শাহ-এর মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী ওমরের ওপর রুষ্ঠ হলে ওমর হজ্ব করার জন্য মক্কা ও মদীনায় চলে যান।পরে তাকে নিশাপুরে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। নিশাপুরে ওমর গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত কাজগুলো সম্পন্ন করেন।

এরপর বুখারায় নিজেকে মধ্যযুগের একজন প্রধান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বীজগণিতের গুরুত্বপূর্ণ “Treatise on Demonstration of Problems of Algebra“ গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের একটি পদ্ধতি বর্ণনা করেন। এই পদ্ধতিতে একটি পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক বানিয়ে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করা হয়।

ত্রিঘাত সমীকরণ সমস্যার সমাধান প্রদানকে তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে মানা হয়। তিনি প্রথম উপবৃত্ত ও বৃত্তের ছেদকের সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। মস্কো ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর রৌজেন ফেল্ড দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন, “আধুনিক যুগে নিউটনের যে সূত্রটি দ্বিপদী উপপাদ্য হিসেবে বিখ্যাত, তা আসলে ওমর খৈয়ামেরই চিন্তার অনুসৃতি।”

ইসলামি বর্ষপঞ্জি সংস্কারেও তার অবদান রয়েছে। তাঁর  কাব্য প্রতিভার আড়ালে তার গাণিতিক ও দার্শনিক ভূমিকা অনেকখানি ঢাকা পড়েছে। ধারণা করব হয় রনে দেকার্তের আগে তিনি বিশ্লেষনী জ্যামিতি আবিষ্কার করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গণিতের দ্বিপদী উপপাদ্য আবিষ্কার করেন।

গণিতবিদ হিসাবে ওমরের অনেক খ্যাতি ছিল । ইসলামী সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সোনালী যুগে তথা এখন থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে বীজগণিতের যেসব উপপাদ্য এবং জ্যোতির্বিদ্যার তত্ত্ব ওমর খৈয়াম দিয়ে গেছেন সেগুলো এখনও গণিতবিদ এবং মহাকাশ গবেষক বা জ্যোতির্বিদদের গবেষণায় যথাযথ সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি দ্বি-পদী রাশিমালার বিস্তার করেন। ওমরের আর একটি বড় অবদান হলো ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা যা পরবর্তী সময়ে অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সূচনা করে।

১০৭০ খ্রিস্টাব্দে তার পুস্তক মাকালাত ফি আল জাবর্ আল মুকাবিলা প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে তিনি ঘাত হিসাবে সমীকরণের শ্রেণীকরণ করেন এবং দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করেন। এই পুস্তকে তিনি কোনিক সেকশনের বিভিন্ন ছেদকের সাহায্যে নানারকম ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করেন। অর্থাৎ জ্যামিতিক পদ্ধতিতে বাস্তব মূল আছে এমন ত্রিঘাত সমীকরণ প্রথম সমাধান করেন। তিনি বর্তমানে প্যাসকেলের ত্রিভুজ নামে পরিচিত দ্বিপদী সহগের ত্রিভুজাকার এর সম্পর্কেও লিখেছিলেন।

(পরবর্তী পর্বে বহুমুখী প্রতিভাবার অধিকারী ওমর খৈয়ামের বিশ্বসাহিত্য ও বিজ্ঞানে অন্যান্য অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করে হবে।)

সুত্রঃ ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া।