• আজ মঙ্গলবার। গ্রীষ্মকাল, ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ। সকাল ৬:১৯মিঃ

‘মামার বেইমানির কারণে অ্যাহন আমি পঙ্গু হয়ে বউ-বেটি নিয়া না খেয়ে থাকি’

১:১২ অপরাহ্ন | বুধবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৬ ঢাকা, দেশের খবর

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ‘আলিম মামারে বিশ্বাস করে নমিনি করছিলাম কিন্তু তিনি যে আমার ক্ষতিপূরণের ৪৩ লাখ টাকা তুলে খায়া ফেলাবেন তা ভাবতে পারি নাই। মানুষ যে এমন বেইমান হয় তা আগে বুঝি নাই। মামার বেইমানির কারণে অ্যাহন আমি পঙ্গু হয়ে বউ-বেটি নিয়া না খেয়ে থাকি। আদালত তো মামারে জেল দিল কিন্তু আমার টাকা ফেরতের তো কোনো ব্যবস্থা হইলো না।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন ফরিদপুরের বিশু মাতুব্বর (৩৮)।

dubai

দুবাইয়ে চাকরি করতে গিয়ে নিয়োগকর্তা কোম্পানির লিফটের নিচে চাপা পড়ে পঙ্গু হয়ে যান বিশু। এরপর ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলার পর আবদুল আলিমকে তার নমিনি (পাওয়ার অব আ্যাটর্নি) করে দেশে ফিরে আসেন তিনি। তারপর ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে করা ক্ষতিপূরণ মামলায় পাওয়া ৪৩ লাখ টাকার পুরোটাই তুলে আত্মসাৎ করেন তার দূর সম্পর্কের মামা আবদুল আলিম। পরে আলিমের বিরুদ্ধে তিনি ফরিদপুর আদালতে একটি প্রতারণা মামলা করলে গত মঙ্গলবার এক রায়ে আবদুল আলিমকে তিন বছর কারাদন্ডাদেশ দেন আদালত। ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শেখ নাজমুল আলম আসামির অনুপস্থিতিতে এ রায় দেন। আলিম সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের নকুলহাটি গ্রামের মানিক মাতুব্বরের ছেলে।

দুবাই ফেরত চিরপঙ্গু বিশুর সঙ্গে ফরিদপুর আদালতে বসে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাতে জানা যায় তার বিস্তারিত জীবনের কষ্টগাথা কথাগুলো। ফরিদপুরের সালথা থানার বিভাগদী গ্রামের মৃত হাকিম মাতুব্বরের ছেলে বিশু। ৩০ বছর আগে মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। সংসারে বড় দুই বোন আর মা। একমাত্র ছেলে হওয়ায় ছোট্ট কাঁধেই চাপে সংসারের ভার। এভাবেই কাটে কয়েক বছর। বোনদের বিয়ে হয়। মায়ের পছন্দে ঘরে আনেন রাশিদা বেগমকে। বছর পাঁচেক পর তাদের ঘর আলো করে আসে প্রথম কন্যা সন্তান।

সংসারের সুখের কথা ভেবে এক সময় মনস্থির করেন বিদেশে যাওয়ার। নগদ টাকা না থাকায় শুধু ১০ শতাংশ জমির ওপর বসতভিটাটি রেখে বেচে দেন বাবার রেখে যাওয়া ৮০ শতক জমি। সেই টাকায় ২০০৫ইং সালে যান ‘স্বপ্নের দেশ’ দুবাইয়ে। সেখানে অ্যারাবিয়ান কনস্ট্রাকশন কোম্পানির নির্মাণ শ্রমিকের কাজ নেন। কিন্তু মাত্র ৪২ দিনের মাথায় চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের লিফটের নিচে চাপা পড়েন। কোমর থেকে ঘাড় পর্যন্ত শিরদাঁড়া ভেঙে যায়। সেই সঙ্গে চিরপঙ্গুত্বের কারণে ভাঙে সব স্বপ্নও। দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে টানা ১৯ মাস। এরই মধ্যে তিনি ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে সে দেশের শ্রম আদালতে একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। নিজে চলাফেরা করতে না পারায় মামলা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দেন সে দেশে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ পাশের গ্রামের ‘আলিম মামা’কে। এক সময় মামলা অসমাপ্ত অবস্থায় আলিমকে এফিডেভিট করে মামলার নমিনি নিযুক্ত করে ফিরে আসেন দেশে। মাঝে মাঝে ফোনে মামার কাছে খোঁজ নিতেন মামলার। প্রথম প্রথম ফোন ধরলেও আবদুল আলিম এক সময় আর ফোন ধরেন না।

বিশু একদিন খোঁজ পান, আলিম দেশে ফিরে বাড়িতে দালান নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন। বিশুর মনে সন্দেহ হয়, যে আলিম মামা বাংলাদেশি টাকায় মাসে মাত্র ছয় হাজার টাকা বেতন পান, তিনি কী করে দালানের কাজে হাত দেন। বিশু তখন বিদেশে থাকা অন্য সহকর্মীদের ফোন করে জানতে পারেন, তার করা মামলাটির রায় হয়ে গেছে অনেক আগেই। মামলার ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া ৪৩ লাখ টাকা তুলে দেশে নিয়ে গেছেন আলিম। হুইল চেয়ারে (ট্রাইসাইকেল) করে আলিমের বাড়িতে ছুটে যান বিশু। মামলার কথা জিজ্ঞেস করতেই ওই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান আলিম। দিশাহারা বিশু হুইলচেয়ারে করে পাগলের মতো ছুটতে থাকেন এর ওর কাছে।

ওই সময় আটঘর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত মলয় বোস। লোকজন নিয়ে বসে তিনি আলিমকে ডেকে ওই টাকার বিষয়ে জানতে চান। আলিম প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও লোকজনের চাপের মুখে এক সময় টাকা তুলে আনার কথা স্বীকার করেন। টাকা ফেরত দেবেন বলে কথাও দেন কিন্তু একদিন হঠাৎ গোপণে দেশ ছাড়েন আলিম। দুই বছর পর আবার দেশে ফেরেন তিনি। খবর পেয়ে বিশু ছুটে যান তার কাছে। এবার তার মামলার কাগজপত্র চাইলে ‘সেগুলো সব পুড়িয়ে ফেলেছি’ বলে দেন আলিম।

চলৎশক্তিহীন বিশুর চলা তাতে থামে না। ছুটে যান আটঘর ইউনিয়নের নতুন চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আহমদ ফকিরসহ এলাকার গণ্যমান্য লোকদের কাছে। চেয়ারম্যান ও নেতারা সালিসে বসে চাপ দিলে এবার সাকল্যে পাঁচ লাখ টাকা দিতে রাজি হন আলিম। তবে এরপরই শুরু হয় টালবাহানা। পাঁচ লাখ টাকার কথা বলা হলেও এবার আহমদ ফকিরের কাছে এক লাখ টাকা জমা দেন আলিম। সেই টাকা নিতে রাজি না হয়ে ২০১৩ সালে বেসরকারি সংস্থা ‘ব্লাস্ট এর সহযোগিতায় ফরিদপুর আদালতে ৪৩ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে আলিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন বিশু। এ খবর পাওয়ার পরই আবার পালিয়ে দুবাই চলে যান আলিম। তার অনুপস্থিতিতে প্রায় তিন বছর মামলা চলার পর এক রায়ে আলিমকে দোষী সাব্যস্ত করে গত মঙ্গলবার তিন বছরের সশ্রম কারাদন্ডাদেশ দেন আদালত।

এসব বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন বিশু। দুই হাতে চোখ মুছে বলেন, ‘এখন স্ত্রী আর চার মেয়ে নিয়ে মাঝে মাঝে উপোস করতে হয়। বাকি জমি জমা যা ছিল তাও বেচা শেষ। বোনদের জমির ওপর ঘর করে কোনোমতে মাথা গুঁজে আছি। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সাহায্য-সহযোগিতায় খুব কষ্টে দিন কাটে। তারাই বা আর কত দিন টানবে আমার পরিবাররে।’ এক দমে কথাগুলো বলে একটু থামেন বিশু। তারপর আবার দম নিয়ে বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর আগে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একটা হুইলচেয়ার দিছিল। সেইটাও ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে আট মাস আগে। এখন বিছানায়ই আমার দিন কাটে। আমি সরকারের কাছে ট্যাকা চাই না, আমার পাওনা ট্যাকাগুলা আলিম মামার কাছ থেকে আদায় করে দিলেই আমি সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।’

এ ব্যাপারে প্রবাসে থাকা অপরাধী আবদুল আলিম মাতুব্বরের স্ত্রী শাবানা বেগম বলেন, ‘আদালতের রায়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তাছাড়া তিনি (আলিম) দেশেও নেই। তিনি দেশে ফেরার পর যা করার তিনিই করবেন।’

আটঘর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আহম্মদ ফকির বলেন, ‘আদালতের রায়ে অপরাধী আলিমের সাজা হয়েছে। এতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। টাকা আদায় না হওয়ায় বিশুর কোনো উপকার হবে না। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিল করা যেতে পারে।’

আটঘর ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল হাসান খান সোহাগ বলেন, ‘আদালতের রায়ের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না। তবে প্রতিবন্ধী বিশুর পরিবারের প্রতি আমার সহানুভূতি সব সময়ই থাকবে। আর আবদুল আলিম এলাকায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করব।’

এ ব্যাপারে ব্লাস্টের এ্যাডভোকেসি অফিসার লাভলী হাসিনা সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ২০০৪ইং থেকে আমরা ৩ বছর যাবত অদ্যবদি মামলাটি চালাচ্ছি। বিশুর রিজার্ভ অটো ভাড়াটাও আমরা দিতে চেষ্টা করেছি। আদালত অপরাধী আবদুল আলিমের অনুপস্থিতিতে তার কারাদন্ডাদেশ দিয়েছেন। তিনি দেশে ফিরলে হয়তো বিশুর পাওনা টাকার বিষয়ে একটি সামাজিক ফয়সালা হতে পারে।