• আজ ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চিন্তা-উদ্দীপক পারস্য উপসাগরের মনিমুক্তার কবি, ওমর খৈয়াম (শেষ পর্ব)

৭:৫৮ অপরাহ্ন | বুধবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৬ গুণীজন সংবাদ

ওমর খৈয়াম

 আরেফিন শিমন, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর,  সময়ের কণ্ঠস্বর।

গতপর্বে ওমর খৈয়ামের বিজ্ঞান চর্চা ও গণিতে অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছিল। এই পর্বে তাঁর সাহিত্যে অবদান তথা বিখ্যাত রুবাইয়াৎ সম্পর্কে আলোকপাত করা হল। ওমর খৈয়াম গণিতবিদ হিসেবে যেমন জনপ্রিয়,  তারচেয়ে বেশি জনপ্রিয় বিখ্যাত কবি হিসেবে।

ওমর খৈয়াম মুলত   ছিলেন গণিত শাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত। অবসর কাটানোর জন্য দৈবেসৈবে চতুষ্পদী লিখতেন। তাঁর নামে প্রচলিত গজল, মসনবী এর মত অন্য কোনো শ্রেণীর দীর্ঘতর কবিতা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন তাঁর অসাধারণ কবিতা সমগ্রের জন্য, যা ওমর খৈয়ামের রূবাইয়াত নামে পরিচিত।

রুবাইয়াৎ বা চতুষ্পদী কবিতা হচ্ছে এক ধরনের পদবন্ধ বিশেষ বা ছন্দস্তবক (গবঃৎরপধষ ঝঃধহুধ)। তার প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ চরণে মিল রয়েছে, তৃতীয় চরণ স্বাধীন বা অমিল। ইরানি আলঙ্কারকরা বলেন, তৃতীয় ছত্রে মিল না দিলে চতুর্থ ছত্রের শেষ মিলে বেশি ঝোঁক পড়ে এবং শ্লোক সমাপ্তি তার পরিপূর্ণ গাম্ভীর্য ও তীক্ষতা পায়।

ইরান ও পারস্যের বাইরে ওমরের একটি বড় পরিচয় কবি হিসাবে। এর কারণ তাঁর কবিতা বা রুবাই এর অনুবাদ এবং তার প্রচারের কারণে। ইংরেজীভাষী দেশগুলোতে এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যায়। ইংরেজ মনিষী টমাস হাইড হলেন প্রথম অপারস্য ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রথম ওমর খৈয়ামের কাজ সম্পর্কে গবেষণা করেন। তবে, বহির্বিশ্বে খৈয়ামকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করেন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড। তিনি খৈয়ামের ছোট ছোট কবিতা বা রুবাই অনুবাদ করে তা রুবাইয়্যাতে ওমর খৈয়াম নামে প্রকাশ করেন।

মার্কিন কবি জেমস রাসেল লোয়েল ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলোকে “চিন্তা-উদ্দীপক পারস্য উপসাগরের মনিমুক্তা “বলে অভিহিত করেছেন। ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চারপংক্তির কবিতাগুলো প্রথমবারের মত ইংরেজিতে অনূদিত হয় খৃষ্টীয় ১৮৫৯ সালে। এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের এই অনূবাদের সুবাদেই ওমর খৈয়াম বিশ্বব্যাপী কবি হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। এ অনুবাদের মাধ্যমে ফিটজেরাল্ড নিজেও খ্যাতিমান হয়েছেন। তার এই অনুবাদ গ্রন্থ দশ বার মুদ্রিত হয়েছে এবং ওমর খৈয়াম সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার প্রবন্ধ ও বই লিখিত হয়েছে।

ফার্সি কাব্য-জগতে ওমর খৈয়াম এক বিশেষ চিন্তাধারা ও বিশ্বদৃষ্টির পথিকৃৎ। তিনি এমন সব চিন্তাবিদ ও নীরব কবিদের মনের কথা বলেছেন যারা সেসব বিষয়ে কথা বলতে চেয়েও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তা চেপে গেছেন। কেউ কেউ ওমর খৈয়ামের কবিতার নামে বা তার কবিতার অনুবাদের নামে নিজেদের কথাই প্রচার করেছেন। আবার কেউ কেউ ওমর খৈয়ামের কবিতার মধ্যে নিজের অনুসন্ধিৎসু মনের জন্য সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছেন।

অসাধারণ জ্ঞানী ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের অনেক কঠিন রহস্য বা প্রশ্নের সমাধান দিয়ে গেলেও অনেক অজানা বা রহস্যময় বিষয়গুলোর সমাধান জানতে না পারায় আক্ষেপ করে গেছেন। তাই তিনি জীবন এবং জগতের ও পারলৌকিক জীবনের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্ন শুধু তার মনেই নয়, যুগে যুগে জ্ঞান-তৃষ্ণার্ত বা অনুসন্ধানী মানুষের মনের প্রশান্ত সাগরেও তুলেছে অশান্ত ঝড়।

দার্শনিকরা এ ধরনের প্রশ্নই উত্থাপন করেছেন। দর্শনের যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বোঝানো সম্ভব হলেও তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। দর্শন বা বিজ্ঞান দিয়ে যে ভাব তুলে ধরা যায় না খৈয়াম তা কবিতার অবয়বে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর তাই যুক্তি ও আবেগের করুণ রসের প্রভাবে ওমর খৈয়ামের চার-লাইন বিশিষ্ট কবিতাগুলো কবিতা জগতে হয়ে উঠেছে অনন্য। দার্শনিকরা একটি বই লিখেও যে ভাব পুরোপুরি হৃদয়গ্রাহী করতে পারেন না, গভীর অর্থবহ চার-লাইনের একটি কবিতার মধ্য দিয়ে ওমর খৈয়াম তা সহজেই তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন।

তাঁর চিন্তা উদ্দীপক কবিতাগুলোর জন্য অনেকে তাঁকে গুরুগাম্ভীর ভাবলেও তিনি মজার মানুষ ছিলেন। খৈয়াম শব্দের অর্থ ‘তাম্বু নির্মাণকারী’। অথচ ওমর খৈয়াম তাঁবুর ব্যবসা কখনো করেননি। খৈয়াম নাম তাঁর বংশ পদবী বলে বিবেচিত। ওমর তাঁর এই পদবীটি নিয়ে ও মজা করেছেন। তিনি তাঁর এক কবিতায় বলেছেনঃ

“জ্ঞান-বিজ্ঞান ন্যায়-দর্শন সেলাই করিয়া মেলা

খৈয়াম কত না তাম্ব গড়িল; এখন হয়েছে বেলা

নরককুন্তে জ্বলিবার তরে। বিধি-বিধানের কাঁচি

কেটেছে তাম্বু-ঠোককর খায়, পথ-প্রান্তরে ঢেলা। “

[অনুবাদ: সৈয়দ মুজতবা আলী]

বাংলা ভাষায় প্রথম ওমরের রুবাই অনুবাদ করে পরিবেশন করেন কবি অক্ষয় কুমার বড়াল। তিনি তাঁর অনুবাদে ফারসি রুবাইর মিল বিন্যাস বজায় রেখেছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওমর খৈয়ামের রুবায়াইৎ অনুবাদে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।  এছাড়া সৈয়দ মুজতবা আলীসহ অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিকরা ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন।

ওমর খৈয়ামের রুবাইর সংখ্যা কত তা আজ ও সঠিকভাবে জানা যায়নি। অবশ্য সংখ্যা দিয়ে কী হবে, ওমরের প্রতিটি রুবাই গুণমান সম্পন্ন। তিনি ১১৩১ খ্রিস্টাব্দের ৪ ষ্ঠা ডিসেম্বর ৮৩ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তাঁর জন্মস্থান নিশাপুরেই তাঁকে কবর দেয়া হয়।

নিশাপুরে ওমরের সমাধি দেখতে অনেকটা তাঁবুর মতো। তাঁর  কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা সেখানে উৎকীর্ণ করা আছে।

সুত্রঃ দ্যা পার্সিয়ান পোয়েট, দ্যা রুবাইয়াৎ ও উইকিপিডিয়া।