চলনবিলে দেশী প্রজাতির মাছের তীব্র সংকট


আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ প্রতিনিধি: বিগত কয়েক বছর পূর্বেও বর্ষা শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাসে চলনবিল এলাকার নদী খাল বিলের পানি যখন ভাটির দিকে চলে যেত তখন চলনবিলের বাতাসে ভাসতো মাছের গন্ধ। কিন্তু কালের পরিবর্তনে এখন ভরা মৌসুমেও চলনবিল এলাকায় দেশী প্রজাতির মাছের তীব্র সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে এ এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা দেশী প্রজাতির মাছের স্বাদ ভুলতে বসেছে। পাঙ্গাস মাছ ও সিলভারকার্প জাতীয় মাছই এখন তাদের ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

dasi-mass

চলনবিলের ইতিকথা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এক সময়ে চলনবিল রাজশাহী জেলার নাটোর মুহকমার তিন চতুর্থাংশ, নওগাঁ মহকুমার রানীনগর ও আত্রাই থানা এবং পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমা ও সদরের চাটমোহর ফরিদপুর ও বেড়া থানা এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১৯১৪ইং সালে সিরাজগঞ্জ রেল লাইন স্থাপিত হলে এ রেল লাইনের উত্তরও পশ্চিমাংশকেই চলনবিল বলা হয়।

ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া থেকে জানা যায়, এক কালে নাটোর মহকুমার লালপুর থানা ছাড়া প্রায় সমগ্র অঞ্চল বিলময় ছিল এবং এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিল হচ্ছে চলনবিল। বর্তমান নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, সলঙ্গা এ আটটি থানা ও উল্লাপাড়া থানার দক্ষিণ পশ্চিমাংশের দশটি ইউনিয়ন জুড়ে চলনবিল অবস্থান করছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে আত্রাই, করতোয়া, গুমানী, তুলশী, চেচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গাসহ অনেক নদী। বিলগুলোর মধ্যে বড়বিল, খলিশাগাড়ি বিল, হালতী, ধলাইর বিল, ছয়আনির বিল, বাইরার বিল, সাধুগাড়ি বিল, মহিষাহালট উল্লেখযোগ্য।

জোলা গুলোর মধ্যে নবীর হাজীর জোলা, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর, পানা উল্লাহ খাল, বেশানী খাল, বেশানী- গুমানী খাল, উলিপুর- মাগুড়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালি খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকাইখাড়ি, জনি গাছার জোলা অন্যতম। এসব নদী জোলা খাল বিলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে প্রচুর পরিমানে টেংড়া, পুটি, শিং, কই, মাগুর, টাকি, বাতাসী, শোল, গজার, বোয়াল, চিংড়ি, চাঁদা, চাপিলা, চেলা, রায়েক, কালিবাউশ, খলিশা, রুই কাতলা, ইলিশ, বাইম, আইড়, পাবদা, কাকিলা, বাঘাইর, বাঁচা, বাঁশপাতা, ফেসাসহ দেশী বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পাওয়া যেত। কিন্তু চলনবিলের মানচিত্র পাল্টে যাওয়ায় নদী খাল বিল গুলোর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া, ফসলী জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা, বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত জাল দিয়ে মাছ ধরা ও পোনা মাছ নিধন করায় চলনবিল হারাতে বসেছে তার চির চেনা পুরানো ঐতিহ্য।

এখন এ বিল এলাকায় বর্ষা মৌসুমেই মাছের তীব্র আকাল দেখা যায়। মাছের রাজা চলনবিল একথা এখন কেবলি ইতিহাস। এক সময়ে চলনবিলের মাছ কলকাতা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হলেও এখন খোদ চলনবিল এলাকাই প্রায় মাছ শূন্য হওয়ার পথে। চলনবিল এলাকা থেকে এখন যে মাছ গুলো আহরিত হয় তার অধিকাংশই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের কোলঘেষা বৃহৎ আড়ত মহিষলুটিতে বিক্রি হয়ে থাকে। মাছের যোগান সীমিত হওয়ায় আড়তেও মাছের দাম বেশি।

তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি মৎস আড়তে আগত আব্দুল মান্নান জানান, বর্তমান প্রতি কেজি বাইম মাছ ১ হাজার, গুচি ৬ শত, টেংড়া ৩ শত, বোয়াল ৪ শত, পুটি ৩ শত, বাতাসী ৬ শত, রায়েক ৬ শত, চিংড়ি ৪ শত, পাবদা ১ হাজার, চাপিলা ৩ শত, চেলা ৪ শত, টাকি ৩ শত, বাঁশপাতা ৪ শত, কই ৫ শত, মাগুর ৬ শত, ষোল ৪ শত টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তাড়াশ উপজেলার অনেকেই জানান, দেশী প্রজাতির মাছ সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় তা অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে চলনবিল এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের পক্ষে কিনে খাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় পুকুরে চাষকৃত পাঙ্গাস, সিলভার কার্প, মিনার কার্প, গ্লাসকার্প, কই, মাগুর, জাপানী রুই, মৃগেল, মনোসেক্স, লাইলোটিকা, তেলাপিয়া, থাই পুটি তাদের ভরসার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা মৎস কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, পাবদা, বাতাসীসহ বেশ কয়েক প্রজাতীর মাছ বর্তমানে অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া বিগত বছরে মাছের তীব্র সংকট আকার ধারন করায় এ বছর মাছের প্রজন সময়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করায় পোনা মাছ নিধন থেকে বিরত থাকার জন্য জেলেদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আশা করি মাছ সংকট হবে না।

◷ ১২:০৭ অপরাহ্ন ৷ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৬ দেশের খবর, রাজশাহী