সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আমরা কি আসলে মানুষ?

৬:০৭ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৬ অপরাধ, আলোচিত বাংলাদেশ

রবিউল ইসলাম, নিউজ রুম এডিটর, সময়ের কণ্ঠস্বর- অসভ্য যুগে যে কুকীর্তির স্বাক্ষী হতে হয়নি ধরাবাসীকে তেমন কুকীর্তি এই সভ্য যুগে অহরহ ঘটছে। যে শিশুটি বুঝতেই শিখলো না মানুষের জৈবিক চাহিদা বলে কোন তাড়না আছে, তেমন শিশুদেরকে ধর্ষণের চিত্র দেশের আনাচে-কানাচে প্রকাশ পাচ্ছে নিয়ত। শুধু কি শিশুদের ধর্ষণ? ধর্ষণ বলতে যা বোঝায় তা কোন দৃষ্টিকোনে এদের ওপর ঘটানো যায়? ওহে মানুষ ! তোমরা পশুর পাশবিকতাকেও হার মানালে তবে? dinaj_rape2দিনাজপুরের পার্বতীপুরের অবুঝ এক শিশু, নাম পূজা। বয়স সবে মাত্র পাঁচ বছর। পুতুল খেলার বয়স। এই বয়সে দিনে একাধিক বার পুতুলকে কাপড় পড়িয়ে অন্য এক পুতুলের সাথে বিয়ে দিবে আর কনের সাথে আসা অতিথি আপ্যায়ন করাবে মাটি দিয়ে ভাত বানিয়ে এটাই স্বাভাবিক। এই শিশুটিও ভিন্ন নয়, অন্য আর দশটা শিশুটির মতোই। তাই সেদিন বাড়ির পাশে পুতুল নিয়ে খেলতেও গিয়েছিল। কে জানত আজ ঘটবে বিপর্যয়? খেলতে গিয়েই মানুষ নামের অমানুষের হাতে শিশুটিকে হতে হবে ধর্ষিত।

গত ১৮ অক্টোবর উপজেলার জমিরহাট এলাকার তকেয়াপাড়া গ্রামে সকাল ১১ টার দিকে বাড়ির পাশে পুতুল খেলতে গিয়েই মুহূর্তের মধ্যেই হয়ে গেল নিখোঁজ। শিশুটিকে খুঁজতে শুধু পরিবারই নয় পুরো গ্রামের মানুষই ছিল এককাতারে। না, তবুও কোথায় পাওয়া যাচ্ছে না, পশ্চিম আকাশে চলে গেছে সূর্য, বাবা-মা বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন।

অবশেষে মাইকিং, মসজিদে ঘোষণা দেওয়াসহ নানাভাবে শিশুটির খোঁজ করা হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে শিশুটিকে সে দিন না পেয়ে সেদিনই রাত ১১টার দিকে পার্বতীপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা। পরদিন ভোর ৬টায় শিশুটিকে বাড়ির পাশের একটি হলুদক্ষেত থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পরই তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই চিকিৎসকরা জানান, ধর্ষণের শিকার হয়েছে শিশুটি।

এরপর গত বৃহস্পতিবার রাতে শিশুটির বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে একই গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৪২) ও আফজাল হোসেন কবিরাজকে (৪৮) আসামি করে পার্বতীপুর মডেল থানায় একটি ধর্ষণ মামলা করেন। পরে আসামি সাইফুল ইসলামকে দিনাজপুর শহর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ধর্ষক সাইফুল

ধর্ষক সাইফুল

এদিকে ধর্ষণের পর ছয়দিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির চিকিৎসা চলে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হচ্ছে কেবল। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়।

শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে ওসিসিতে কর্মরত ব্যক্তিরাও মুষড়ে পড়েন। ওর গাল, গলা, হাত ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। শরীরে কামড়ের দাগ। ঊরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার ক্ষত যা হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছিল ডাক্তারদের।

আর তখনই সমন্বয়কারী বিলকিস বেগম বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ভিকটিম দেখি। বলতে গেলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু এই শিশুটিকে দেখার পর থেকে স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। চিকিৎসক হয়েও নিজেকে সামলাতে পারছি না।’

ধর্ষিত শিশুটির অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, গতকাল বুধবার অপারেশন করার জন্য ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু যৌনাঙ্গ সংক্রমণ থাকায় অপারেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। আর মেয়েটির চিকিৎসার জন্য আট সদস্যের বোর্ড গঠন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সমন্বয়কারী ডা. বিলকিস বেগম জানান, হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গেই তার চিকিৎসা শুরু করা হয়। শিশুটির গলা থেকে শুরু করে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়েছে যৌনাঙ্গ। দেখে মনে হয়, ব্লেড দিয়ে কাটা হয়েছে। পায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকার চিহ্ন আছে। শিশুটির যৌনাঙ্গে ইনফেকশন দেখা দিয়েছে বলেও জানান বিলকিস বেগম।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসকরা শিশুটির আঘাতগুলো পরীক্ষা করেছেন বলে জানান ওসিসির সমন্বয়কারী। তিনি জানান, আজ সকালে বোর্ডের সব সদস্য শিশুটিকে দেখে একযোগে তার চিকিৎসা শুরু করেছেন। সে ভালো নেই। সে এখনো ভয়ে কাঁদে। কেউ কথা বলতে গেলেও কাঁদছে। তবে অল্প পরিমাণে হলেও খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক আছে।

আজ শিশুটিকে দেখতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। সাংবাদিকদের তিনি জানান, শুরু থেকেই শিশুটির খোঁজখবর নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তার সব খরচ সরকার বহন করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ৫ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে উঠেছে আলোচনার ঝড়। গতকাল বুধবার নাহিম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ৫ বছরের শিশু পূজাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সো হোয়াট? ইগনোর ইট। পূজাকে ধর্ষণ করার আগে তার গোপনাঙ্গ-ব্লেড দিয়ে কেটে বড় করা হয়েছে।

কিছু বুঝেছেন? আমি আপনি,আমাদের আশে পাশে আমাদের মতই দেখতে কিছু অমানুষ ঘোরাফেরা করছে।খবরটা পড়ার পর থেকে আমি খুব অসুস্থ অনুভব করছি।

4আইনের ছাত্র হয়ে আমি আজকে লজ্জিত। কি করবো এই আইন ব্যবস্থা দিয়ে? শুধু চেয়ে চেয়ে বসে থাকবো? নিজেকে প্রথমবারের মত অপরাধী মনে হচ্ছে। এই অসুস্থ সমাজের জন্য,এই বিকৃত মানসিকতার মানুষের জন্য।

প্রসেনজিৎ ঠাকুর নামে এক স্কুল শিক্ষক ফেসবুকে লিখেছেন, পাঁচ বছরের মেয়ে পূজা দাসকে ধর্ষণ ঘটনার কোন ব্যাখ্যা হয়না। এমন কাজকে লঘু অপরাধ বিবেচনা করাটাও মানবতাবিরোধী।সাইফুল নামের লম্পট শুধু পূজাকে ধর্ষণ করেনি, করেছে পুরো মানবজাতিকে। এ ধরণের ঘটনা ঘটতে থাকলে মানুষ মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। বাৎসল্য প্রেমের প্রতি মানুষের আস্থা উঠে যাবে। যেখানে নাবালক-নাবালিকাদের নিষ্পাপ ও স্বর্গীয় মনে করা হয়, সেখানে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কেমন করে এমন জঘণ্য চিন্তা করতে পারে? এ লজ্জার। এ লজ্জা পুরো পুরুষজাতির। যারা পোশাককে ধর্ষণের কারণ বলে গলা ফাটান, তাদের কাছে এর ব্যাখ্যা চাই। দিতে পারবেন, ব্যাখ্যা? বার বার পোশাকের কথা বলে ধর্ষণ নামক পাপাচারকে লঘু করে ফেলা হয়/ ফেলার চেষ্টা করা হয়। আসলে কি বিষয়টা এত লঘু? কিছু ঘটনা বারবার আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কি আসলে মানুষ? নাকি মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোন কপট ও হিংস্র প্রাণী?

3