• আজ ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শ্রীপুরে পোল্ট্রি শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন খামারীরা

৫:২৪ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৬ ঢাকা, দেশের খবর

মোশারফ হোসাইন তযু, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:

হ্যাচারী ও ফিড মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চার দাম বৃদ্ধি, আড়ৎদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি,ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে বসেছে গাজীপুরের পোলট্রি খামারগুলো। পোল্ট্রি ব্যবসা ছেড়ে খামারীরা ভিন্ন পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। আশির দশকের শেষের দিকে গাজীপুরে পোল্ট্রি শিল্প স্থাপনের সূচনা হয় । অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরো জেলায় প্রায় ২০ হাজার খামার গড়ে উঠে। পোল্ট্রি শিল্পনগরী হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে গাজীপুর । নানা সমস্যার কারণে গত কয়েক বছরে জেলার কয়েক হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেছে।poultry-pic1

প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানাগেছে, জেলায় বর্তমানে নিবন্ধনকৃত ৩ হাজার ১২২টি ডিম উৎপাদনের লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে। মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে ২ হাজার ৪১৬টি। মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের হ্যাচারি রয়েছে ১৩টি, হাঁসের খামার রয়েছে ২১৭টি। এ ছাড়া অনিবন্ধত আরো কয়েক হাজার খামার রয়েছে। ২০০৭ সালে এ জেলায় প্রায় ৮ হাজার পোলট্রি খামার ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজারে। এর মধ্যেও বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে অনেক খামার। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অথচ দেশের সবচেয়ে বেশি পোলট্রি খামার ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সদরে। এছাড়া এখানে রয়েছে অনেক হ্যাচারি। এখান থেকে বাচ্চা উৎপাদন করে সারা দেশের খামারগুলোয় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু জেলায় নতুন করে এ ব্যবসায় কেউ বিনিয়োগ করছেন না।

জানা যায়, দেশী এবং বিদেশী কয়েকটি বড় কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার কারণে। এসব কোম্পানির কারণেই তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মনোপলির সঙ্গে জড়িত এসব বড় কোম্পানির অধিকাংশই প্রথমে ওষুধ নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাচ্চা উৎপাদন, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার, পোলট্রি ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ, পোলট্রি ফিডের কাঁচামাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের কাছ থেকে বাচ্চা, ওষুধ, খাদ্য কিনে খামারিরা উৎপাদিত ডিম বা মুরগি লাভজনক দামে বিক্রি করতে পারছে না। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এসব কোম্পানি নিজেদের খামারের ডিম ও মুরগি কম দামে বিক্রি করতে পারে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে তারা টিকে থাকতে পারছে না।

শ্রীপুর উপজেলার পোল্ট্রি শিল্পোদ্যোক্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এক দশক আগেও লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চার দাম সরকার নির্ধারণ করে দিত। তখন একটা লেয়ার মুরগীর বাচ্চার দাম ছিল ৩০- ৩৫ টাকা। যখনই হ্যাচারী মালিকদের হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় তখন থেকেই মুলত খামারীদের সর্বনাশ হতে শুরু করে। প্রতিটি লেয়ার মুরগীর বাচ্চা নির্ধারিত দাম ৩২ টাকা ও ব্রয়লালের দাম ৩০ টাকা হলেও হ্যাচারী মালিকগণ সেগুলো বিক্রি করছেন ১৩০ ও ৬০ টাকায়। পোল্টি খামারী আনোয়ার হাসান সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ২০০৭ সালের দিকে বার্ড ফ্লুর আতঙ্ক কাটিয়ে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা যখন লাভের মুখ দেখতে শুরু করে তখনই এ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ চলে বাচ্চা খাদ্য ওষুধ ও ডিমের আড়ৎদারদের হাতে।

মূল খামারীকে সামান্য লাভ দিয়ে একটা চক্র হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয় পুরো ব্যবসা। এভাবে এক সময় লোকসানে পড়ে এই শিল্প থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন খামারীরা। পোল্ট্রি শিল্পের ওপর দিয়ে বড় ধরণের বেশ কয়েকটি ঝড় বইয়ে যাওয়ার পরও ব্যবসায়ী নতুন উদ্দ্যমে ঘুরে দাড়াঁনোর চেষ্টা করে তখন ভারত থেকে ডিম আমদানি এবং বাচ্চার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে বিপর্যয়ের মুখে আবারো খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারীরা। জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা অখিল চন্দ্র বলেন, গাজীপুরে প্রতি বছর ৪১ কোটি পিস ডিমের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় ১৯১ কোটি পিস। এছাড়া মুরগির মাংস উৎপাদন হয় ১ দশমিক ৫৩ লক্ষ মেট্রিক টন। আর গাজীপুরে মুরগির মাংসের চাহিদা রয়েছে ১ দশিমিক ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে ডিম ও মাংসগুলো সারা দেশে সরবরাহ করা হয়।