গৃহবধূ নিপালীর রহস্যজনক মৃত্যু, নগদ অর্থের বিনিময়ে রফাদফা


নাজমুল হক নাহিদ, নওগাঁ প্রতিনিধি:

নওগাঁর রাণীনগরে স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার উপজেলার চক-পারইল গ্রামের মৃত-জনাব আলীর মেয়ে দুই সন্তানের জননী নিপালী (২৬) কে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো। নিপালীর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে চলছে নানান গুনঞ্জন।

গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে গৃহবধূ নিপালী নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এতে ওই এলাকায় শোকের ছাঁয়া নেমে আসে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মাত্র ৬ বিঘা জমির বিনিময়ে নিপালীর এই অপমৃত্যুকে মিটমাট করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা।naogaon-pic

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়ের বাবার বাড়ির অনেকেই জানান, আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে উপজেলার কালীগ্রাম ইউপি’র রাতোয়াল দক্ষিণ পাড়া গ্রামের ইয়াদ আলী মন্ডলের ছেলে মো: আবুল কালামের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে কালাম তার স্ত্রী নিপালীকে বিভিন্ন অজুহাতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে আসতো। স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না। এরমধ্যেই নিপালীর ঘরে আসে বৈশাখী (৮) নামের মেয়ে ও আবু কাওছার (৫) নামের এক ছেলে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার কালাম তার স্ত্রীকে মারধর করার এক পর্যায়ে নিপালীর অবস্থা আশংকা জনক হলে তাকে ভ্যান গাড়ীতে তুলে দিয়ে কালাম তার শ্বশুর বাড়িতে খবর দিলে মেয়ের ভাই উজ্জ্বল তার বোনকে আবাদপুকুর বাজার থেকে নিয়ে আসে। তার বোনের অবস্থা আশংকা জনক হলে প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য নিপালীকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। এরপর নিপালীকে ওই দিন রাতে আদমদীঘি হাসপাতালে এবং পরে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আড়াইটার দিকে নিপালী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নিপালীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ির এলাকায় তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন রকমের গুনঞ্জন চলছে। এলাকার মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন যে নিপালীর মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক।

এরপর থেকে নিপালীর মরদেহের কাছে ছিল না স্বামী আবুল কালাম। এমনকি বুধবার বাদ এশার নামায পর নিপালীর বাবার বাড়িতে দাফনের সময়ও আবুল কালাম ও নিপালীর দুই সন্তান অনুপস্থিত ছিল। নিপালীকে যে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে নিপালীকে তার স্বামীর বাড়িতে দাফন না করে জমি-জমার বিনিময়ে নিপালীর বাবার বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুর পর নিপালীকে গোসল করানোর সময় তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

এঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়ের পক্ষ থেকে তার চাচা ফজলু, জিল্লুর রহমান (কুতুব) ও আবুল কালামের চাচা রুবেল হোসেনের উপস্থিতিতে একাধিক ঘরোয়া বৈঠকে নিপালীর সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছেলেকে চার বিঘা ও মেয়েকে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার পর গত বুধবার রাত এশার নামায পর নিপালীর দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

আবুল কালামের চাচাত ভাই জিয়া জানান, আমার ভাইয়ের স্ত্রী দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ্য ছিল। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্প্রতি রাজশাহীতে ভালো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার বাবার বাড়িতে যাওয়ার পথে হঠাৎ বমি করে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। এরপর সে নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।

আবুল কালামের বাবা ইয়াদ আলী মন্ডল জানান, আমার ছেলের বউ মৃত্যুর আগে অসুস্থ্য ছিলো না। গত মঙ্গলবার বউ বাবার বাড়িতে যাবে বলে আমরা একটি ভ্যান গাড়ী ভাড়া করে তাকে একা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তার মাঝে হঠাৎ করে অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সে নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আবুল কালামের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার পরিবারের লোকজন বলে সে ঘুমাচ্ছে এখন দেখা করা যাবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবুল কালামের প্রতিবেশি অনেকেই জানান, নিপালী ছিল খবুই শান্ত ও নিরীহ প্রকৃতির মেয়ে। হয়তো সে স্বামীর অনেক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন নিরবে সহ্য করেছে। তবে নিপালীকে মুমুর্ষ অবস্থায় একা বাবার বাড়িতে পাঠানোর কাজটি ঠিক করেনি আবুল কালামের পরিবার।

আবুল কালামের চাচা রুবেল হোসেন জানান, নিপালীকে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করাতে চাইলে তার ভাইদের অনুরোধে তার মরদেহকে তার বাবার কবরের পাশে দাফন করানো হয়েছে।

রাণীনগর থানার ওসি মো: মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আমার কাছে দুই পক্ষের কেউ কোন অভিযোগ নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

◷ ৫:৩৫ অপরাহ্ন ৷ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৭, ২০১৬ দেশের খবর, রাজশাহী