সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সোচ্চার হই তীব্র প্রতিবাদে; নইলে নিজেদেরও পরিচয় গড়ি একজন ‘ধর্ষক’ হিসেবেই !

১১:২৯ পূর্বাহ্ন | শুক্রবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৬ আলোচিত, আলোচিত বাংলাদেশ

রবিউল ইসলাম, নিউজ রুম এডিটর, সময়ের কণ্ঠস্বর-

আপনি যেহতু এই ফিচারটি পড়তে শুরু করেছেন তাহলে ধরেই নিতে পারি এই মুহুর্তে, অনলাইনে ভয়ানক সেই নির্মমতার প্রতিবাদে অবশ্যই সোচ্চার আপনি নিজেও। হয়তো, নিজের কড়া প্রতিক্রিয়া আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফেসবুকেও। তবে সেই সাইফুলের মত নরপশুদের ব্যতিক্রমি দৃস্টান্তমুলক কোন শাস্তির আওতায় আনতে  আপনার/আমার শুধুমাত্র অনলাইন প্রতিবাদের ঝড় যথেষ্ট নয়!

দেশ থেকে প্রবাস, অনলাইন থেকে অফলাইন, শহর থেকে গ্রামের প্রতিটা ঘরে পৌছে দিতে হবে রুখে দাড়াবার আহব্বান। নিজ নিজ পরিসর থেকে আশেপাশের প্রতিটা মানুষকে যথাসাধ্য জানিয়ে দিন,  ”সোচ্চার হই তীব্র প্রতিবাদে! নইলে নিজেদেরও পরিচয় গড়ি একজন ‘ধর্ষক’ হিসেবেই !”

”অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃনা যেন তৃনসম দহে”। পাঠ্যপুস্তকে পড়া সে বাল্যপাঠ তো  শুধুই গদবাধা নীতিশিক্ষা নয়, আমার ভেতরের আমিত্ব আমাকে বরাবরই তাড়া করে সে শিক্ষার আলো ছড়াতে। সময়ের প্রয়োজনে আর জীবন-জীবিকার তাগিদে আমরা যতই আত্মকেন্দ্রিক হই না কেন,  অন্যায়ের বিরুদ্ধে  দল-মত, জাতি-গোষ্ঠীর ভেদাভেদ ভুলে অনেক ক্ষেত্রে দলবদ্ধ ভাবেই সোচ্চার হয়ে উঠি দৃপ্ত কন্ঠে।

dinaj_rape2নিজের স্বাধীন মত প্রকাশের সাথে সাথে  হাজারো-লাখো অন্যদের মতামত জানতে পারার মত অভাবনীয় বিপ্লবের সাক্ষী এখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো । অতীতেও নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির সাথে সাথে অসহায় নির্যাতিতদের পাশে দাড়াবার দৃস্টান্ত গড়েছে এ দেশের মানুষ।

বিকল্প  হয়নি এবারেও, স্মরনকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার নিষ্পাপ শিশু পুজার পাশে দাড়িয়েছে লাখো মানুষ। এই ঘটনার প্রতিবাদের জন্য এ সংখ্যা হয়তো যথেস্ট। কিন্তু অদুর ভবিষ্যতে এমন নারকীয় ঘটনার জন্ম যেন না হয়, আর কোন নরপশু তার বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার আগেই যেন হাজারোবার ভাবে ‘ভয়ানক পরিণতির’ কথা। আর এমন কিছুর জন্য প্রয়োজন এ দেশের প্রতিটি ঘর থেকে প্রতিবাদ। সবার দৃপ্ত কন্ঠে উঠুক প্রতিবাদের ঝড় আর অন্যায়কারীদের জন্য চোখে মুখে ফুটে উঠিক তীব্র ঘৃনার ছাপ।  আমাদের বিশ্বাস, খুব দেরি নয়, খুব দ্রুতই বদলে যাবে সমাজ। হয়তো বদলে যাবে অসুস্থ্য ভাবনার অনেক মানুষও।

”নিশ্চয়ই ধর্ষিতা মেয়েটার চরিত্রেও সমস্যা ছিলো, এক হাতে কখনোই তো তালি বাজে না। এমনি এমনি কি ধর্ষণ হয় নাকি। মেয়েরা ছোট ছোট কাপড় পরে রাস্তায় ঘুরে ঘুড়ে বেড়াবে, আর ছেলেরা কিছু করলেই দোষ? এই মেয়েরাই সব নষ্টের গোড়া, একজন পুরুষের শারীরিক প্রবৃত্তিই হচ্ছে নারীদেহের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং এটাই স্বাভাবিক। পুরুষদের কিছু দোষ থাকলেও মূল দোষটা আসলে মেয়েদের, মেয়েরা ঠিক থাকলে এত ধর্ষণ হয় না ! ।”

এমন হাজারো অকাট্য ভাবনা আমাদের সমাজে ব্যাপক প্রচলিত। আসলেই কি তাই? যদি তাই হয় তবে পুজা নামের সেই ৫ বছরের শিশুটির চরিত্রেও কি সমস্যা ছিল, সেও কি বুকের উড়না গলায় দিয়ে রাখতো, নাকি শিশুটি ঠিক মতো পর্দা করতো না? আর এটা দেখে কোন মানুষরূপী অমানুষ তার উপর আকৃষ্টই হয়ে গেল। তারপর শিশুটিকে তুলে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা নির্যাতন চালালো।

যারা মনে করেন,  মেয়েদের পোশাক পরার ধরনই ধর্ষণের জন্য দায়ী! তাদের কাছে আদৌ আছে কি এই মেয়েটার ক্ষেত্রে কোন ব্যাখা? জানি পারবেন না, আর এটা পারার মতোও না, আমরা যারা বার বার পোশাকের কথা বলে ধর্ষক, সাথে ধর্ষণের ঘটনাকে প্রভাবশালীমহল দিনের পর দিন ধামাচাপা দিয়ে রাখি বা চেষ্টা করি, পুলিশ/মামলার কাছে না যেতেও দিয়ে যাই হুমকি। আর তখন এদের কাছে অসহায় ধর্ষিত মানুষ গুলো যেন হয়ে যায় খেলার পুতুল। চাপা কষ্ট নিয়ে রাতের পর রাত কান্নায় বুক ভাসাতে হয় তবুও দিনের বেলায় ভালো থাকার অভিনয় করে যেতে হয় নিয়মিত।

একবারও কি ভাবিনা আজ আমি/আমরা যাদেরকে পার পাইয়ে দিচ্ছি, এদের মতো নরপিশাচের হাতে হয়তো আমার মেয়েও কাল ধর্ষিত হবে, আমার প্রিয়তমাকেও কেউ ধর্ষণ করে হত্যা করবে! আমার একমাত্র বোনকেও হয়তো ঢাকা থেকে ফেরার পথে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হবে।

অতঃপর তখন সবাই লিখবে! প্রতিবাদ করবে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠবে, পত্রিকার বড় বড় কলাম হবে, টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ যাবে! এতেই কি শেষ? নাকি শেষ দেখতে হলে আমাদের পাড়ি দিতে হবে আরও দীর্ঘ পথ?

rapist-saiful-puja-sk-new

৫ বছরের শিশু পুজা ধর্ষিত হয়েছে হুবুহু মানুষের মতই দেখতে দুজন ভয়ানক নরপিশাচের হাতে। শিশু ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সোমবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে দিনাজপুর শহর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ধর্ষক সাইফুলকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়ে ওঠে। ফেসবুকে সাইফুলের ছবি প্রকাশ করে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। ফেসবুকে ছবি প্রকাশের পরই মুলত এই ধর্ষকের আত্মগোপনে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় চলছে হাজারো ক্ষোভ। মুলত ফেসবুকের কল্যানেই অনেকটা ভাইরাল হয়ে পড়ে অসহায় শিশুটির উপর পাশবিক নির্যাতনের ভয়াবহ বিষয়টি। খুব দ্রুতই ধর্ষক ধরাও পড়েছে পুলিশের আন্তরিকতায়।

তবে এখন সবার একটাই দাবী এই ভয়ানক পিশাচ যেন কোনভাবেই আইনের ফাঁক- ফোকর গলিয়ে না বাচতে পারে। অদুর ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটাতে যেন অন্য কেও সাহস না পায় সেজন্য খুব দ্রুত আইনের মাধ্যমেই ব্যতিক্রমি দৃস্টান্তের কোন বিচার আশা করছেন সকলেই। নাহ ভয়াবহ শাস্তি বলতে ‘মৃত্যুদন্ড” চাচ্ছেননা সচেতন মহল। তারা চাইছেন ভয়াবহ কোন শাস্তি! যা শুনেই আতকে উঠবে যে কেওই।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের অবুঝ এক শিশু, নাম পূজা। বয়স সবে মাত্র পাঁচ বছর। পুতুল খেলার বয়স। এই বয়সে দিনে একাধিক বার পুতুলকে কাপড় পড়িয়ে অন্য এক পুতুলের সাথে বিয়ে দিবে আর কনের সাথে আসা অতিথি আপ্যায়ন করাবে মাটি দিয়ে ভাত বানিয়ে এটাই স্বাভাবিক। এই শিশুটিও ভিন্ন নয়, অন্য আর দশটা শিশুটির মতোই। তাই সেদিন বাড়ির পাশে পুতুল নিয়ে খেলতেও গিয়েছিল। কে জানত আজ ঘটবে বিপর্যয়? খেলতে গিয়েই মানুষ নামের অমানুষের হাতে শিশুটিকে হতে হবে ধর্ষিত।

ধর্ষণের পর ছয়দিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির চিকিৎসা চলে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়।

শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে ওসিসিতে কর্মরত ব্যক্তিরাও মুষড়ে পড়েন। ওর গাল, গলা, হাত ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। শরীরে কামড়ের দাগ। ঊরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার ক্ষত যা হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছিল ডাক্তারদের।

আর তখনই সমন্বয়কারী বিলকিস বেগম বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ভিকটিম দেখি। বলতে গেলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু এই শিশুটিকে দেখার পর থেকে স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। চিকিৎসক হয়েও নিজেকে সামলাতে পারছি না।’

ধর্ষিত শিশুটির অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, যৌনাঙ্গ সংক্রমণ থাকায় অপারেশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। আর মেয়েটির চিকিৎসার জন্য আট সদস্যের বোর্ড গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুটিকে দেখতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল। তিনি জানান, শিশুটির চিকিৎসার সব খরচ সরকার বহন করছে।

সরকারের এই কাজকে আমি অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। তবে সরকারের এই সুচিকিৎসা আর তার পরিবারকে কেহ লাখ লাখ টাকা দিলে কি এই শিশুটির ক্ষতিপূরণ হবে? যে ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে শিশুটি সেটি মুছে ফেলতে পারবে কেহ?

পাঁচ বছরের একটা শিশু! ভাবেন তো? আপনার ডানে বাঁয়ে তাকান। ঘরের ভিতর তাকান। ঘরের বাইরে তাকান। আপনার আশেপাশের একটা চার পাঁচ বা ছয় বছরের নারী শিশুর দিকে তাকান। কল্পনা করেন তো! কল্পনা করেন দুইটা চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছরের শক্ত পুরুষ ওকে আটকে রেখেছে একটা ঘরে; কল্পনা করেন! এ ধরণের ঘটনা ঘটতে থাকলে মানুষ মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। বাৎসল্য প্রেমের প্রতি মানুষের আস্থা উঠে যাবে। যেখানে নাবালক-নাবালিকাদের নিষ্পাপ ও স্বর্গীয় মনে করা হয়, সেখানে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কেমন করে এমন জঘণ্য চিন্তা করতে পারে? এ লজ্জার। এ লজ্জা পুরো পুরুষজাতির।

নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ করে পুরুষরা। কাজেই এ ব্যাপারে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষদেরই। সংশোধিত হতে হবে আগে তাদেরকেই। মানুষ হতে হলে ‘মনুষ্যত্ব’কেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে, লাম্পট্যকে নয়। এটা মানবতার দায়। এই মুহূর্তটি তাই নিজেদের সংশোধনের মুহূর্ত। তার চেষ্টা শুরু করার মুহূর্ত। কী ভাবে নিজেদের বদলাতে পারি আমরা, পুরুষেরা?

আসুন, ” সোচ্চার হই তীব্র প্রতিবাদে! নইলে নিজেদেরও পরিচয় গড়ি একজন ‘ধর্ষক’ হিসেবেই !”