• আজ বৃহস্পতিবার। গ্রীষ্মকাল, ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। ২২শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ। রাত ১০:৫৭মিঃ

তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা

⏱ | সোমবার, জানুয়ারী ২, ২০১৭ 📁 দেশের খবর, রংপুর

আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: হিমালয়ের পাদদেশে সীমান্ত ঘেঁষা লালমনিরহাটে শীত জেঁকে বসেছে। বর্তমানে চলছে ভরা শীত মৌসুম। এ শীতে ছিন্নমূল থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনের ভরসা কাকিনা তাঁতের চাদর।

tat-silpo

বর্তমানে কাকিনার তৈরী তাঁতের শাড়ি এক সময়ের মসলিনের মতই দেশী-বিদেশী রমণীদের মনে স্থান করে নিয়েছে। এ জন্যই প্রবাদ রয়েছে তিস্তা নদী নালা খাল বিল কাকিনার শাড়ি তার গর্বের ধন। আর এই গর্বের ধন এখন হারাতে বসেছে। সুতার দাম বৃদ্ধি, কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লভ্যাংশের অসম বণ্টন আর কারিগরের অভাবে তাঁত শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বাপদাদার এই তাঁত শিল্পকে ধরে বাল্যকাল থেকে এ পেশায় জড়িত হয়ে পড়েছেন ইমান আলী (৪৫)। ইমান আলী এ কাজের পাশাপাশি করতে চেয়েছিলেন লেখাপড়া। অভাবের তারনায় অর্জন করা সম্ভব হয়নি তার। গ্রহণ করতে পারেননি উচ্চ কোনো পেশা, তাই বাপ দাদার তাঁত বুননে চলছে তার সংসার।

কাকিনা তাঁত শিল্প এলাকায় গিয়ে কথা হয় ইমান আলীর সাথে। তিনি বলেন, দাদন ব্যবসায়ীদের যাঁতাকলে পিষ্ট তাঁতিরা। সরকারি কোনো ঋণ না পেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে চরা সুদে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়ে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।  লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে রয়েছে তাঁতিপাড়া। সব সময় কাজে মহাব্যস্ত তাঁতিপাড়ার তাঁত শ্রমিকেরা। কথা বলার ফুরসতও যেন নেই তাদের। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরাও ব্যস্ত বড়দের সাথে।

উপজেলার কাকিনা উত্তর বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশের একটি গ্রামের নাম তাঁতিপাড়া। তাঁত মেশিনের খট খট শব্দ শুনে ভেতরে গিয়ে দেখা গেল পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে মহাব্যস্ত তাঁতি পরান আলী (৪০)। স্বাধীনতার আগেই তাঁর বাবা মানিকগঞ্জ থেকে চলে আসেন লালমনিরহাটের কাকিনায়। সেখানেই গড়ে তুলেন তাঁতপল্লী। কয়েক বছর আগেও সাড়ে তিন থেকে চার শত পরিবার তাঁত পেশার সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু অনেকটা নেশায় পড়ে কষ্ট হলেও বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন বলে জানান প্ররান আলী।

পরান আলী জানান, সুতার দাম বেশি, সব সময় চাদরের চাহিদা না থাকা, অর্থাভাবে এ পেশা থেকে অনেকেই ছিটকে পড়েছেন। সুদখোর দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সুতা কিনে কোনো রকমে টিকে রয়েছেন তাঁত শিল্পে। সুদের টাকায় ব্যবসা করে তেমন মুনাফা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক হাজার টাকা নিলে প্রতি মাসে ১০০ থেকে ১২০ টাকা মহাজনকে সুদ দিতে হয়। তবে তিনি দাবি করেন সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান সুতা আর মজুরি দিলে বারো মাসই তারা চাদর, লুঙ্গি, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড় তৈরি করে সরবরাহ করতে পারতেন।

তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন পরান আলী। কাকিনা রুদ্ধেশ্বর গ্রামের কয়েক জন তাঁত শ্রমিক মহিলা জানান, দৈনিক ভোর ৫ টায় কাজ শুরু করে রাত ১০টায় শেষ করে চার সদস্যের পরিবারে চাদর তৈরী হয় ছয়টা। এতে তাদের সুতা খরচ পড়ে প্রতিটিতে ১০০ টাকা। পাইকারি প্রতিটি চাদর বিক্রি হয় ১৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। কাকিনার তাঁত পল্লীর তৈরী চাদর লালমনিরহাটের চাহিদা মিটিয়ে চলে যায় টাঙ্গাইল, বাবুরহাট, বরিশাল ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শীতের সময় তাঁতের চাদরের বেজায় কদর লালমনিরহাটে। অনেকেই শার্ট, থ্রিপিস, কোট-প্যান্টের পিস হিসেবে ব্যবহার করছেন কাকিনার এ চাদর।

কলেজপাড়ার তাঁত শ্রমিক রহম আলী (৪৫) জানান, প্রতি মণ সুতা ছয়-সাত হাজার টাকায় কিনতে হয় বগুড়া শহর থেকে। তিনি মহাজনের কাছে অগ্রিম টাকা নিয়ে সুতা কিনেছেন। বিনিময়ে মহাজনকে বাজার মূল্যের চেয়ে প্রতিটি চাদর পাঁচ থেকে আট টাকা কমিশনে বিক্রি করতে হয়। তাতে লাভ কম হলেও জীবন বাঁচানোর তাগিদেই তাঁত বুনছেন। তবে বছরের অন্য সময়ে চাদরের চাহিদা না থাকায় তাঁত বন্ধ রেখে অন্য কাজে শ্রম বিক্রি করেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সারা বছর চাদর, লুঙ্গি, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড় তৈরি করে বাজারজাত করতে পারতেন।

তাঁতি সমিতির সূত্রে জানা যায়, এ জেলায় সর্বমোট পাঁচ হাজার তাঁতি রয়েছেন। এদের মধ্যে ভোটমারীতে আছেন ১৩০, পাটগ্রামে ৮০, পারুলিয়ায় ৫৫, দইখাওয়ায় ২০ এবং দোওয়ানিতে ৫০। এই তাঁতিরা ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছেন না। বর্তমান তাঁতিদের যে দুুর্দিন, তাতে এ সম্ভবনাময় খাতটি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।