কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিন ট্যুরের ভ্রমণনামা (৩য় পর্ব)

৭:২৮ অপরাহ্ন | সোমবার, জানুয়ারী ২, ২০১৭ লাইফস্টাইল

হিমছড়ি

মেহেদী হাসান গালিব, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর।

সকালের নাস্তা সেরে ট্যুরিস্ট জীপে করে রওনা দিলাম হিমছড়ির উদ্দেশ্যে। ‘হিমছড়ি’ নামটা যেমন আমার ভালো লাগে, তেমনি জায়গাটাও বেশ মনোমুগ্ধকর! রাস্তার একপাশে বিশাল বিশাল পাহাড়। সেসব পাহাড় জুড়ে পিনপতন নিরবতা, রহস্যময় এক নিস্তব্ধতা। অন্যপাশে নীল সমুদ্রে অনবরত জোয়ার-ভাটার খেলা। সেখানে আবার প্রতিটা মুহূর্তে গগনবিদারী গর্জন। প্রকৃতির কী অপরুপ খেলা! কী অপূর্ব এক সংমিশ্রণ! এমন সৌন্দর্য বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয়না।

কক্সবাজার থেকে হিমছড়ির দূরত্ব মাত্র ৮.৬ কিলোমিটার। জীপও যেনো চলছিল বাতাসের গতিতে। আমরা সবাই সীটের উপর দাঁড়িয়ে বাতাসের তোড় উপলব্ধি করতে লাগলাম। হিমছড়িতে এসে অর্ধেক যাত্রী নামতেই জীপের ড্রাইভার বললেন এই সময়টাতে ইনানী বীচে গেলে ভালো হবে। পরে গেলে আর পাথর দেখতে পাওয়া যাবে না। আমাদের পরিকল্পনা ছিল হিমছড়ি ঘুরে তারপর ইনানী বীচে যাওয়া। কিন্তু ড্রাইভারের কথামতো আগে ইনানী বীচেই গেলাম।

ইনানী বীচের কাছে আসতেই রাস্তা থেকে লক্ষ্য করলাম সমুদ্র তীরে এলোপাথাড়ি পড়ে আছে অসংখ্য পাথর। কেউ কেউ সেসব পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, কেউ বা আবার পাথরে বসে ছবি তুলছেন। সমুদ্রের পানিতে অর্ধ নিমজ্জিত থাকায় কিছু কিছু পাথর ছিল বেশ পিচ্ছিল। তাই একটি পাথর থেকে আরেকটি পাথরে লাফিয়ে যাবার সময় অসাবধানতাবশত পায়ের কিছু অংশ কেটে গেলো। যেহেতু পানি লবণাক্ত ছিল, তাই ভয় পেয়েছিলাম কাটা জায়গায় সম্ভবত খুব জ্বালাপোড়া হবে। কিন্তু সামান্য রক্ত পড়া ছাড়া তেমন কিছুই হল না। কিছুক্ষণ রক্ত পড়ার পর এমনিতেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেলো।

ইনানী বীচে হাঁটাহাঁটি করলাম প্রায় এক ঘন্টার মত। তারপর জীপের কাছে এসে দেখেনি এখনো কেউ ফেরেননি। তাই পাশের একটি খাবারের দোকানে ঢুকলাম হালকা নাস্তা করার জন্য। হাত ধোয়ার জন্য গ্লাসটা নিয়ে বাইরে যেতেই দোকানদার বারণ করলেন। কাউন্টার থেকে নিজে উঠে এসে একটা বাটি এগিয়ে দিলেন হাত ধোয়ার জন্য। কী অমায়িক তার ব্যবহার! চোখের দৃষ্টিতেও যেনো বিনয় খেলা করছে। একটা কেক আর এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়ে আসলাম।

আমাদের জীপ ছুটে চলেছে হিমছড়ির উদ্দেশ্যে। যথারীতি আমরা সীটের উপর দাঁড়িয়ে গায়ে বাতাসের ঝাপটা লাগাচ্ছি। প্রায় আধাঘণ্টা পর পৌঁছলাম হিমছড়িতে। এর আগেরবার, ২০১২ সালে যখন হিমছড়িতে এসেছিলাম, তখন এখানেই আমাদের একটি মোবাইল হারিয়েছিল। ঠিক হারায়নি, চুরি হয়েছিল। স্বভাবতই এবার বেশ সতর্ক ছিলাম। একটু পরপরই পকেটে হাত দিয়ে দেখছিলাম মোবাইলটা আবার অন্য কারো পকেটের সম্পত্তি হয়ে গেলো না তো।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর লক্ষ্য করলাম এর আগেরবার আমরা যে জায়গায় ঝর্ণা দেখেছিলাম ঝর্ণাটি আর সেখানে নেই। খানিকটা সামনে এগিয়ে অন্য একটি ঝর্ণার দেখা পেলাম। খুব সম্ভবত এটা কৃত্রিমভাবে বানানো। যারা কাজ করছিলেন, তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা অস্বীকার করলেন। আবার যখন প্রশ্ন করা হল, কৃত্রিমভাবে বানানো না হলে ঝর্ণা বেয়ে নেমে আসা পানি এমন ঘোলা কেনো, তখন তারা একগাল হেসে বললেন পাহাড়ের উপর নাকি বানররা লাফালাফি করছে, তাই পানি ঘোলা হয়ে গিয়েছে। এমন যুক্তি শোনার পর হাসতে হাসতে আমাদের পেট ফাটার উপক্রম!

ঝর্ণা দেখা শেষে পাহাড়ে উঠলাম। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ে উঠার পর মনে হল, ‘যাক, এই কষ্টটা বৃথা যায়নি।’ হাতের বামপাশে সমুদ্র আর ডানপাশে মেঘ ছুঁই ছুঁই পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে একটু হলেও উপলব্ধি করতে পারছিলাম আমাদের এই দেশটা কতোটা সুন্দর, কতোটা মনোমুগ্ধকর!

হিমছড়ি থেকে হোটেলে ফিরতে ফির‍তে দুপুর হয়ে গেলো। দুপুরের খাবার খেয়ে একটুখানি বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এমন সময় শুনি আমাদের গ্রুপ এখন মহেশখালী ঘুরতে যাবে। মহেশখালীর কথা শুনে কে যেনো বলে উঠল, ‘বাপরে বাপ, মহেশখালী! সে তো বড্ড ভয়ানক জায়গা। শুনেছি সেখানে নাকি দিনে-দুপুরে ছিনতাই, ডাকাতি হয়।’ কথাটা শুনে আমিও ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু এতদূর এসে যদি একটা জায়গা না দেখেই ফিরি, তাহলে মনকে সান্ত্বনা দেবো কী বলে?

মন তো আর ডাকাতির অজুহাত শুনবে না। তাই মানিব্যাগ, ঘড়ি, ক্যামেরা সব হোটেলেই রেখে দিলাম। মোবাইলটা নিবো না নিবো না করেও নিলাম—যোগাযোগেরও তো একটা ব্যাপার আছে। আর কী কী কমানো যায়—ভাবতেই ফুল প্যান্টটা পাল্টে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে ফেললাম। ব্যস, এবার আমি নিশ্চিন্ত। ডাকাতি, ছিনতাই যাই হোক না কেনো তারা খুব একটা লাভ করতে পারবে না।

হোটেল থেকে প্রথমে গেলাম ঘাটে। ঘাটের দরজায় এসে বুঝলাম মহেশখালীকে কোন কোন মানুষ এতো ভয় পায় কেনো। ঘাটের কাছে কয়েকজন ষণ্ডামার্কা লোক বসে আছে। ঘাটে ঢুকলেই নাকি জনপ্রতি পাঁচ টাকা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, বের হওয়ার সময়ও খরচ করতে হবে পাঁচ টাকা। এতো ভদ্রোচিত ছিনতাই আমি এর আগে কখনো দেখিনি।

ঘাট পর্যন্ত যখন এসেই পরেছি, তখন আর পাঁচ টাকার জন্য ফিরে গিয়ে কী লাভ? তাই সবাই মিলে পাঁচ টাকা গিয়ে দরজার ওপারে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। এরপর স্পীড বোটে করে গেলাম মহেশখালী পর্যটন ঘাটে। সেখানে অটোতে করে ঘুরলাম তিনটা বৌদ্ধ মন্দির।

প্রথম মন্দিরে ঢুকতে যাবো এমন সময় একজন গুরুগম্ভীর রাখাইন ভদ্রলোক পথ আগলে দাঁড়ালেন। বললেন, জুতা খুলে যেতে হবে। আমরা বিন্দুমাত্র আপত্তি না করে জুতাজোড়া খুলে তার দেখানো জায়গায় রাখলাম। কিন্তু তিনি পথ থেকে সরলেন না। স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘জোড়া প্রতি পাঁচ টাকা দিয়ে তারপর যান।’ আরেকবার বুঝলাম মহেশখালী বলতেই একজন আঁতকে উঠেছিল কেনো।

মন্দির দেখা শেষে আমরা ঘাটের দিকে ফিরছিলাম। পথে দোকানগুলোর নাম পড়তে পড়তে যাচ্ছিলাম। এখন শুধু একটা নামই মনে আছে— উমেছাং ফ্যাশন হাউস। বাকিগুলো সব ভুলে গেছি। একটা নাম দেখেই পাঠকরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন নামগুলো ভুলে গিয়ে অস্বাভাবিক কিছু করিনি। তো নামগুলো পড়তে পড়তে হঠাৎই একটি দর্জির দোকানে চোখ গেলো। একটি রাখাইন মেয়ে সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছিল। যেই না আমি তাদের দোকানে চোখ দিয়েছি, অমনি মেয়েটিও চোখ তুলেছে। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হল। কিন্তু আমাদের অটো ততক্ষণে আরো দু একটি দোকান ছাড়িয়ে গেলো। তাই আর সেদিন মেয়েটির চোখের ভাষা পড়া হল না, শুধু চোখাচোখিতেই আঁটকে গেলো একটি স্মৃতি।

এরপর স্পীড বোটে করে মহেশখালী থেকে ফিরে আসলাম হোটেলে। সন্ধ্যা তখন তার পরিপূর্ণ রুপ ধারণ করেছে। সাথে আমাদের সবার ক্লান্তিও। তাই কিছুক্ষণ পর রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম।

আগের পর্ব পড়তে চাইলেঃ http://www.somoyerkonthosor.com/2016/12/29/81466.htm (পর্ব ১)

http://www.somoyerkonthosor.com/2016/12/30/81735.htm (পর্ব ২)