সংবাদ শিরোনাম

‘তালা ভেঙ্গে মসজিদে তারাবি পড়ার চেষ্টা্’‌, পুলিশের বাধায় সংঘর্ষে মুসল্লিরা‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’; তিনটি মুরগি চুরির দায়ে দেড়লাখ টাকার জরিমানা চার তরুণের!কুড়িগ্রামের সবগুলো নদ-নদী শুকিয়ে গেছে, হুমকীতে জীব-বৈচিত্রহেফাজতের আরেক কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তারমধুখালীতে বান্ধবীর সহায়তায় অচেতন করে দফায় দফায় ধর্ষণের শিকার নারী!বাসস্ট্যান্ডে প্রকাশ্যে চায়ের স্টলে ইতালি প্রবাসীকে কুপিয়ে হত্যাগোবিন্দগঞ্জে মর্মান্তিক সড়ক দূঘর্টনায় স্কুল শিক্ষকসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহতময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে ডুবে মারা গেলো ৩ শিশুমুহুর্তেই ভয়াবহ আগুন! স্কুলেই পুড়ে মরলো ২০ শিশু শিক্ষার্থী!সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু আর নেই

  • আজ ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিন ট্যুরের ভ্রমণনামা (৪র্থ পর্ব)

৮:৪৬ অপরাহ্ন | বুধবার, জানুয়ারী ৪, ২০১৭ লাইফস্টাইল

মেহেদী হাসান গালিব, লাইফস্টাইল কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর।

ভোর পাঁচটা। ঘুম ভাঙলো এলার্ম ক্লকের কর্কশ শব্দে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে নামলাম। আজকের গন্তব্য সেন্টমার্টিন। পুরো গ্রুপের জন্য দুটো বাস রিজার্ভ করা হয়েছিল। যখন শুনলাম সেন্টমার্টিন ঘাটে যেতে হবে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, তখন ভেতরে ভেতরে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। এতোদিন টেলিভিশনের পর্দাতেই পাহাড়ি রাস্তা দেখে এসেছি। আজ বাস্তবে দেখতে পারবো ভেবেই এক ধরণের ভালো লাগা কাজ করছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই ভুল ভাঙলো।

বাস যখন কলাতলী রোড পার হয়ে পাহাড়ি রাস্তায় উঠল তখনই প্রথম ঝাঁকুনিটা খেলাম। আহা! শরীরের সবকটা হাড় নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটা ঝাঁকুনি। আরেকটু হলেই মাথাটা ধুপ করে লেগে যেতো বাসের ছাদে। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিলাম। কিছুক্ষণ যেতে না যেতে আবার আরেকটা ঝাঁকুনি। এর মধ্যেই আমাদের নাস্তার প্যাকেট দিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু এই ঝাঁকুনির মাঝে কেউই খাওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। দেখা যাবে মুখে খাবার ঢুকাতে গেছি, এমন সময় ঝাঁকুনির কারণে খাবার ঢুকে গেছে নাকে কিংবা চোখে।

রাতে ভালোভাবে ঘুম না হওয়ায় এই ঝাঁকুনির মাঝেও ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু করতে লাগল। পুরো বাসে ছাড়াছাড়া ঘুম হল। প্রতিবারই ঘুম ভাঙলো ঝাঁকুনির কারণে। প্রায় দুই ঘন্টা পর এই ঝাঁকুনির হাত থেকে রেহাই পেলাম। পৌঁছলাম সেন্টমার্টিন ঘাটে। সেখানে হালকা নাস্তা সেরে উঠলাম জাহাজে। জীবনের প্রথম জাহাজ জার্নি। রোমাঞ্চকর একটা ব্যাপার। কিন্তু ভয়ও লাগছিল। কে যেনো বলল জাহাজে নাকি প্রচুর বমি হয়। জার্নিতে আমার বমি হয় না। কিন্তু ভয় দেখানোর পর আর ভরসা পাচ্ছিলাম না। জাহাজে উঠেই একটা বমির ট্যাবলেট খেয়ে নিলাম।

গাঙচিল

সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলেছে। আমাদের সঙ্গী হয়েছে একঝাঁক গাঙচিল। তারা জাহাজের দুপাশে আমাদের সাথে সাথে উড়ে চলেছে। এতোটা কাছে যে হাত বাড়ালেই তাদের ছুঁয়ে দেওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর জাহাজের ক্যান্টিন থেকে এক মগ কফি এনে জাহাজের গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। কক্সবাজারের চা খেতে না পারলেও কফিটা খেতে বেশ ভালো লাগতো। কক্সবাজার থাকাকালীন প্রতিটা দিনই তিন চার মগ কফি খাওয়া হয়েছে।

জাহাজ থেকে নামার প্রায় আধ ঘন্টা আগে সমুদ্রে একটি ডলফিন দেখতে পেলাম। পুরো জাহাজ যেনো একসাথে হৈ দিয়ে উঠল। অতঃপর প্রায় আড়াই ঘন্টা জার্নির পর আমরা পৌঁছলাম সেন্টমার্টিনে।

সেন্টমার্টিনে হোটেল সী-ইনের ১০৩ নম্বর রুমে উঠলাম। জামা-কাপড় পাল্টে খালি পায়ে রওনা দিলাম সী-বীচের উদ্দেশ্যে। ছোট্ট একটা দ্বীপ, অথচ তার কী না গলির শেষ নেই। গলির পর গলি হাঁটতে হাঁটতে লাগলাম, কিন্তু সী-বীচের কোন নামগন্ধ নেই। এর উপর আবার পথের দুধারে সারি সারি খাবারের হোটেল।

সমস্যা খাবারের হোটেলে না, সমস্যাটা হল খাবারের হোটেলে ঝুলে থাকা রান্না করা সামুদ্রিক মাছে। প্রথমেই বলেছিলাম সর্দির কারণে আমার বেশ উপকার হয়েছে। তার সিংহভাগ উপকারই হয়েছে এই সেন্টমার্টিনে। কিন্তু তারপরেও মাছের কড়া গন্ধ নাকে এসে লাগছিল। আমি বেশ খাদ্যরসিক হলেও আমার খাবারের তালিকায় মাছের স্থান হয় সবচেয়ে নিচে। আমি হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম এই সময় আমার সর্দি না হলে তো এই মাছের গন্ধেই মরে পড়ে থাকতাম।

অবশেষে অনেকগুলো গলি পেরুনোর পর সমুদ্রের দেখা পেলাম। প্রায় পৌনে এক ঘন্টার মত গোসল করে ফিরলাম হোটেলে। এরপর আবার গোসল করতে হল। গোসল করে খাওয়ার জন্য পূর্ব নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে বসলাম। সেন্টমার্টিনের খাওয়াদাওয়া প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত থাকায় আগে থেকেই মেনু ঠিক করা ছিল। ভাতের সাথে ডাল, আলু ভর্তা আর সামুদ্রিক মাছ।

ওয়েটার টেবিলে মাছের বাটিটা রাখতেই আম্মু বলে উঠল, ‘সামুদ্রিক মাছ কিন্তু খেয়ে দেখতে হবে। প্রচুর আয়োডিন আছে এই মাছে।’ এরপর আমার আর কী বলার থাকতে পারে? সর্দির কারণে যেহেতু কোন খাবারেরই স্বাদ পাচ্ছিলাম না, তাই মাছ খেতে আর আপত্তি না করে গোগ্রাসে পুরো একটি মাছ খেয়ে ফেললাম। আম্মুও খুশি, আবার আয়োডিন পেয়ে আমার শরীরও খুশি। এক মাছ দিয়ে দুই পাখি মারলাম আর কী!

সমুদ্র বিলাস

দুপুরের খাবার খেয়ে হালকা বিশ্রাম নিলাম। এরপর সেন্টমার্টিনের বিশেষ একটি ভ্যানে চড়ে গেলাম হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি ‘সমুদ্র বিলাস’ দেখতে। একদম সমুদ্র তীরেই অবস্থিত বাড়িটি। মাটি থেকে সামান্য উঁচু জায়গায় অবস্থিত বাড়িটিকে বসে অনায়াসেই সমুদ্র দেখা যায়। কিন্তু বাড়িটিতে গিয়ে দেখলাম দরজায় শিকল ঝোলানো। পাশেই নামফলকে লেখা- ‘ড. হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্র বিলাস’। সবাই সেই নামফলকের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। আর কিছু পর্যটক লাইন ধরে অপেক্ষা করছে ছবি তোলার জন্য।

সমুদ্র বিলাস দেখে আমরা সমুদ্রের তীর ঘেঁষে হাঁটতে লাগলাম। একসময় বালুর পথ শেষ হয়ে গেলো। শুরু হল ছোট ছোট নুড়ি পাথরের পথ। চারিদিকে নুড়িপাথর ছিটানো। নুড়িপাথরের আড়ালে ঢাকা পড়েছে সমুদ্র তীরের বালু। স্থানীয় ছোট বাচ্চা মেয়েরা সেসব নুড়ি কুড়িয়ে মালা গাঁথছে। আর পাশ দিয়ে কোন পর্যটক গেলেই হাঁক পেড়ে বলছে, ‘মালা লাগবে নাকি—মালা?’

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সন্ধ্যা লাগল, টেরই পেলাম না। সেন্টমার্টিনে আবার বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। জেনারেটর দিয়েই সব কাজ চলে। তাই মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে কোনরকমে হোটেলে ফিরে আসলাম। বড্ড কফির তৃষ্ণা পেয়েছিল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কফির খোঁজে।

হোটেলের কাছেই একটি দোকান পেয়ে গেলাম। কফির কাপে চুমুকের সাথে দোকানদারের সাথে চলল আড্ডা। কথা হল তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে। এই তিনমাসই নাকি তাদের ব্যবসার মৌসুম। এই তিন মাসের ব্যবসায় তাদের চলতে হয় বারোটা মাস। কফি খাওয়া শেষে হোটেলে ফিরে এলাম। এরপর রাতের খাবার খেয়ে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে লাগলাম। সারাদিন অনেক হাঁটাহাঁটি করায় খুব বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলাম না। কাঁথা জড়িয়ে চলে গেলাম ঘুমের দেশে।

আগের পর্ব পড়তে চাইলেঃ http://www.somoyerkonthosor.com/2017/01/02/82664.htm (পর্ব ৩)