• আজ শুক্রবার, ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ৯ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও মজার প্রায় দুইশতাধিক প্রবাদ-প্রবচন ব্যাখাসহ! (পর্ব-২)


❏ সোমবার, জানুয়ারি ২৩, ২০১৭ ইতিহাস-ঐতিহ্য, জানা-অজানা

সময়ের কণ্ঠস্বর, জানা, অজানা ডেস্ক- দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা-লম্ব কোনো গভীর জীবনসত্য লোকপ্রিয় কোনো সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যে সংহত হয়ে প্রকাশিত হলে তাকে প্রবাদ বলা হয়।

বাংলায় প্রবাদ ও প্রবচন প্রায় সমার্থক শব্দ হলেও এ দুয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ করা যায়। প্রবাদ অজ্ঞাত পরিচয় সাধারন মানুষের লোক পরম্পরাগত সৃষ্টি। কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল বিজ্ঞজনই প্রবচনের স্রষ্টা। তাদের পরিচয় আমাদের অজানা নয়। এককথায় প্রবাদ লোক-অভিজ্ঞতার ফসল, প্রবচন ব্যক্তিগত মনীষীর সৃষ্টি। প্রবচনের আধুনিক প্রতিশব্দ হচ্ছে—সুভাষন বা সুভাষিত। প্রবচন বা সুভাষিতর কিছু নিদশন:

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও মজার প্রায় দুইশতাধিক প্রবাদ-প্রবচন ব্যাখা সহ! (প্রথম পর্ব)

১০১ থেকে ২০৯ 

১০১/ লাং (প্রেমিক) ধরলে ঠাকুর, মাছ ধরলে মাগুর ” কথ্য ভাষার এই প্রবাদ টাও একি অর্থে ব্যাবহার হয়।
ব্যাখ্যাঃ স্বার্থপর ব্যক্তি অন্যের স্বার্থ নষ্ট করে হলেও নিজের স্বার্থ ঠিক রাখে। অন্যের তেল আঁচলে ভরলে পরে যাবে জেনেও তাকে আচলে ভরার পরামর্শ দিয়ে নিজের তেলটুকু পাত্রে ভরার পায়তারা করছে।

১০২/ শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা।
শুঁটকির বাজারে বিড়াল চৌকিদার।
ব্যাখ্যাঃ চোর-ডাকাতের কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে এই প্রবাদ টি বলা হয়।

১০৩/ কর্কশ কথা অগ্নিদাহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
ব্যাখ্যাঃ কোন মানুষকে কটাক্ষ করে কথা বললে এই প্রবাদ বলা হয়

১০৪/ তেল কম ভাজা মচ মচ।
ব্যাখ্যাঃ আয়োজনের স্বল্পতা থাকলেও প্রত্যাশা বেশী হওয়া।

১০৫/ হওয়া ছল যায় গড়াগড়ি,
পেটের ছলের জন্য খাড়ু গড়ি।

ব্যাখ্যাঃ (ছল = ছেলে, খাড়ু = হাতে বা পায়ে পরার চুড়ি বিশেষ, গড়ি = তৈরি করি ) আশু প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে অনাগত বিষয় নিয়ে ব্যাস্ততা দেখান।

১০৬/ পয়সা নাই দুই আনা
বউ চায় সেয়ানা।
ব্যাখ্যাঃ নিজের সামর্থ্য বা যোগ্যতার চেয়ে বেশী প্রত্যাশা করা।

১০৭/ যে খাইছে সাত বার, তার জন্য ভাত বাড়,
যে খায়নাই একবার, তার জন্য চাল ঝাড়।

ব্যাখ্যাঃসুবিধা বঞ্চিত ব্যাক্তিকে বাদ দিয়ে সুবিধা প্রাপ্ত ব্যাক্তিকে পুনরায় আনুকুল্য দেখানোর ক্ষেত্রে এ কথা বলা হয়। (তেলা মাথায় তেল দেয়া)।

১০৮/ পান্তা ভাতে ঘি নষ্ট,
বাপের বাড়ী ঝি নষ্ট।

ব্যাখ্যাঃ বিয়ের পরে মেয়েদের বাবার বাড়িতে দীর্ঘ দিন থাকা ঠিক নয়।

১০৯/ মূলধন ছাড়াই ব্যাবসা করার জন্য অযথা নাচানাচি করা।
দ্যাশ বুইঝ্যা ব্যাশ, পাথার বুইঝ্যা চাষ ।
(দ্যাশ = দেশ, ব্যাশ = বেশ, পাথার = জমি)
ব্যাখ্যাঃ দেশের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পোশাক আশাক পরতে হয়, আর জমির অবস্থা বুঝে চাষাবাদ করতে হয়।

১১০/ পাশের বাড়ী বিয়ালো গাই,
সেই সুত্রে পাড়াতো ভাই”

ব্যাখ্যাঃ দূর সম্পর্কের আত্মীয় সম্পর্কে (তুচ্ছার্থে)এ কথা বলা হয়।

১১১/ “ঘড় পোড়ার মাঝে আইছে আলু পোড়া দিতে”
ব্যাখ্যাঃ অপরের বিপদের মাঝেও নিজের লাভের সর্বোচ্চ চেষ্টা, যার ফলে বিপদগ্রস্থের কষ্ট আরো বহুগুন বেড়ে যায়।

১১২/ আমার নাও আমার ছইয়া
আমিই থাকি বাইরে বইয়া।
(কুমিল্লার একটি আঞলিক প্রবাদ)
ব্যাখ্যাঃ তাকে ছারাই সব কিছু করে ফেলা বা সুবিদা ভোগ করা যে ঐ জিনিসের মালিক।

১১৩/ যে যেমনঢেমনি জগত দ্যাখে তেমনি

ব্যাখ্যাঃ যে সাধু সে মনে করে জগত সাধুময় তেমনি যে চোর তার দৃষ্টিতে সাধু খুজে পাওয়া দুরহ ।

১১৪/ গাঙ ও নাই যে ডুবাইয়া নাবো,
মা ও নাই যে কাইন্দা কব।

ব্যাখ্যাঃ (গাঙ = নদী; নাবো = নাইবো = স্নান করর) কষ্টের কথা শোনার মত সমব্যথি না পাওয়া গেলে এ কথা বলা হয়।

১১৫/ জ্যান্তে দেয়না চাল ভাজার খোলা
মরলে দেবে রামায়নের পালা।

ব্যাখ্যাঃ (খোলা অর্থ পাত্র) জীবিত অবস্থায় কাউকে সামান্যতম সাহায্য না করে তার মৃত্যুর পর অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেয়া।

১১৬/ নতুন নতুন খই এর মোয়া মচ মচ করে।

ব্যাখ্যাঃ শুরুতে সব বিষয়ের প্রতি মানুষের উৎসাহ বেশী বেশী থাকে।

১১৭/ পরের হাতের পিঠা
খাইতে লাগে মিঠা !
পরের হাতের পান
খাইলে মুখে আসে গান !

আহ্লাদীলো ঢ্যাপের খই
এতো ঠমক পাইলি কই?

ব্যাখ্যাঃ অতি মাত্রায় আদুরে ভাব দেখিয়ে যারা সহজসাধ্য কাজও কঠিন বলে এড়িয়ে চলে তাদের ক্ষেত্রে এ উক্তি করা হয়।

১১৮/ যার দউলতে রামের মা
তারে তুমি চেননা।
ব্যাখ্যাঃ যার দ্বারা কার্য সম্পন্ন হয় তাঁকে মূল্যায়ন না করা।

১১৯/ তোমরা তো কও আহা !
আমার গেছে টাহা (টাকা)।

ব্যাখ্যাঃ বিপদের পরে লোকজন সান্তনা দিতে পারে কিন্তু যার সর্বনাশ হয়ে যায় সে ই তার মুল্য বোঝে।

১২০/ আমার শিল আমার নোড়া, ভাঙ্গ আমার দাঁতের গোঁড়া ।
ব্যাখ্যাঃ কারও অস্ত্র দিয়ে তাকেই ঘায়েল করতে চাওয়া ।

১২১/ শরিরের নাম মহাশয়, যাহা সহাও তাহাই সয় ”

ব্যাখ্যাঃ মানুষের শারীরিক ক্ষমতা তার চেষ্টার উপর নির্ভরশীল ।

১২২/” ভরা পেটে সন্দেশে কয় ছুঁচোর গন্ধ ”

ব্যাখ্যাঃ চাহিদা বা তৃপ্তি মিটে গেলে সুস্বাদু খাবারও বিস্বাদ মনে হয় ।

১২৩/ বারো বচ্ছর চোংগার মইধ্যে থাকলেও কুত্তার ল্যাঁজ সোজা অয় না
ব্যাখ্যাঃ খারাপ মানুষকে বার বার ভাল হবার কথা বলেও যখন ভাল হয়না তখন এই কথা বলা হয়

১২৪/ ধর্মের ঢাক আপনি বাজে।
ব্যাখ্যাঃ পাপ কোন দিন চাপা থাকে না।

১২৫/ চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী।
ব্যাখ্যাঃ অসৎ লোককে উপদেশ দান বৃথা।

১২৬/ অভাগা যেদিকে চায়,
সাগর শুকিয়ে যায়।
ব্যাখ্যাঃ দূর্ভাগার সকল কাজেই ব্যর্থতা নেমে আসে।

১২৭/ অভাবে স্বভাব নষ্ট,
অন্ধ লোকের বেজায় কষ্ট
ব্যাখ্যাঃ অভাবে পড়লে সততা থাকে না।

১২৮/ আতি দর্পে হত লঙ্কা।
ব্যাখ্যাঃ অহংকার পতনের মূল।

১৩০/ বিপদে পড় নহে ভয়
অভিজ্ঞতায় হবে জয়
ব্যাখ্যাঃ বিপদে পড়েই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়, আর অভিজ্ঞতার বলেই বিপদকে জয় করা যায়। তাই বিপদে ভয় পেতে নেই।

১৩১/ কপালে নাই ঘি,
ঠকঠকালে হবে কি!
ব্যাখ্যাঃ নিঃষ্ঠুর নিয়তি। ভাগ্যে না থাকলে কিছুই পায়া যায় না। (যদি আপনি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন।)

১৩২/ খনা বলে শুনে যাও
নারিকেল মুলে চিটা দাও
গাছ হয় তাজা মোটা
তাড়াতাড়ি ধরে গোটা।
ব্যাখ্যাঃ অনেক আগে, সেই ছোট বেলায় দেখেছি- ধান মাড়ানোর পরে যে চিটা ধান (যে ধানের ভিতরে চাল হয় না) পাওয়া যেত, সেগুলি ছোট নারকেল চারার গোঢ়ায় দিয়ে দিতো। এখানে হয়তো এটার কথাই বলা হয়েছে।

১৩৩/ বেঙ ডাকে ঘন ঘন
শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান।
ব্যাখ্যাঃ বৃষ্টি হবার আগে আগে ব্যাঙগুলি অবিরাম ডাকতে থাকে।

১৩৪/ শুনরে বাপু চাষার বেটা
মাটির মধ্যে বেলে যেটা
তাতে যদি বুনিস পটল
তাতে তোর আশার সফল।
ব্যাখ্যাঃ বেলে মাটিতে পটলের ফলন সবচেয়ে ভালো হয়।

১৩৫/ জামাই কৈন্যার দেখা নাই
শুক্কুর বারে বিয়া
ব্যাখ্যাঃ কেউ অতি আগাম পরিকল্পনা করলে এই প্রবাদ বলা হয়।

১৩৬/ মাটিতে থাপ্পর পরলে, গুনাহগার চমকে উঠে।
“চোরের মন পুলিশ পুলিশ”-এর সমর্থক।
ব্যাখ্যাঃ পাপী ব্যাক্তি সর্বদা পাপ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে থকে যা তার আচরনে ফুটে উঠে।

১৩৭/ তোর তেল আঁচলে ধর
আমার তেল ভাড়ে ভর।
ব্যাখ্যাঃ স্বার্থপর ব্যক্তি অন্যের স্বার্থ নষ্ট করে হলেও নিজের স্বার্থ ঠিক রাখে। অন্যের তেল আঁচলে ভরলে পরে যাবে জেনেও তাকে আচলে ভরার পরামর্শ দিয়ে নিজের তেলটুকু পাত্রে ভরার পায়তারা করছে।

১৩৮/ আমি যার করি আশ
সেই করে সর্বনাশ
ব্যাখ্যাঃ যার কাছ থেকে সাহায্য আশা করা হয়েছে তার কাছ থেকে উল্টো ফল পেলে এই প্রবাদ বলা হয়।

১৩৯/ পেট কাটলে মশাও মরে, হাতিও মরে
ব্যাখ্যাঃ বড় বিপদ ছোট-বড় সবার জন্য সমান বিপদজনক।
১৪০/ বাছা শাকে পোকা বেশী।
ব্যাখ্যাঃ বেশী মাত্রায় খুঁতখুঁতানি থাকলে ভালো কিছু আশা করা যায়না।
১৪১/ বেআক্কলরে আক্কল দিলে নিজের আক্কল ক্ষয়,
আক্কলরে আক্কল দিলে আরো আক্কল হয়।
~চট্টগ্রাম
ব্যাখ্যাঃ বুদ্ধিহীনরা সুপরামর্শ দিলে কোন কাজে লাগেনা, বুদ্ধিমানকে সুপরামর্শ দিতে গেলে আলোচনার মাধ্যমে নিজেরও কিছু বুদ্ধি বৃদ্ধি হয়।

১৪২/ হাত দিয়ে হাতি ঠেলা।
ব্যাখ্যাঃ- অসম্ভবকে সম্ভব করার বৃথা চেষ্টা।
১৪৩/ তোমরা তো কও আহা !
আমার গেছে টাহা (টাকা)।
ব্যাখ্যাঃ বিপদের পরে লোকজন সান্তনা দিতে পারে কিন্তু যার সর্বনাশ হয়ে যায় সে ই তার মুল্য বোঝে।
১৪৪/ সাতার না জানলে, বাপের পুকুরেও ডুবে মরে
~রাজশাহি
ব্যাখ্যাঃ অনভিজ্ঞ ব্যক্তি সুবিধাজনক স্থানে থাকলেও বিপদগ্রস্ত হয়।
১৪৫/ যে নয় আমার অনুগত, কাইন্দা প্রেম বাড়াবা কত?”
অর্থ- যে তোমার কথা শোনে না বা যুক্তি মানে না তাকে উপদেশ দেয়া বৃথা
১৪৬/ টানবার যে সে না টানলে
লাভ নাই কোন কানলে
ব্যাখ্যাঃ কেদে কোন কার্য উদ্ধার করা যায় না, যদি কর্তা বিরুপ থাকে।

১৪৭/ সেদিন আর নাইরে নাথু, খাবলা খাবলা খাবা ছাতু ”
ব্যাখ্যাঃ- আগের মত জিনিস-পত্রের দাম এত সস্তা নেই যে চাইলেই পর্যাপ্ত পরিমানে খাবার আয়েশ করে খাওয়া যাবে।
১৪৮/ মাছ চিনে গভীর জল
পাখী চিনে উচু ডাল
ব্যাখ্যাঃ নিজ নিজ পরিবেশ অনুযায়ী অভিজ্ঞতা লাভ হয়।
১৪৯/জাতে মাতাল
তালে ঠিক।
বিচার মানি তাল গাছটা আমার।
ব্যাখ্যাঃ- কিছু মানুষকে দেখে মনে হয় কিছুই বুঝেনা, কিন্তু নিজের স্বার্থের বেলায় দেখা যায় সে সবই বুঝে।

সিলেটি প্রবাদ প্রবচন নিয়ে

১৫০/ রান্ধুনীর আতো, রউ মাছে কান্দে, না জানি কেমনে রান্ধে’।
ব্যাখ্যাঃ- রান্ধুনী মানে যে রাধতে জানে না ভাল মত।তেল নুন পএইমান মত দিতে পারে না।মাঝে মাঝে চিনি আর লবনের পার্থক্য ধরতে পারে না-এই টাইপের।
আতো মানে হাতে।
রান্না চিনে না এমন রাধুনীঁর হাতে পড়লে, রউ মাছ ও কাদেঁ!তার কত স্বপ্ন ছিল তাকে খেয়ে সবাই বলবে, কি একটা মাছ!ফাটাফাটি জিনিশ!কিন্তু এই রাধুনীর হাতে পড়ছে,এখন তো কেউ মুখেও দিব না।

১৫১/ এক গাতো দি দিলাম ধুমা, আর গাতোদি যায়
যার লাগি দিলাম ধুমা তারে খায় মশায়।
(গাত মানে গর্ত,ধুমা মানে ধোঁয়া।)

আক্ষরিক ব্যাখ্যাঃ- এক গর্তে দিলাম ধোঁয়া অন্য গর্তে যায়/

১৫২/ যার জন্য ধোঁয়া দেয়া, তারে মশায় খায়(কামড়ায়)।
ব্যাখ্যাঃ-একজনের জন্য কষ্ট করলাম কিন্তু তার কোন লাভ হল না।উল্টা অন্য আরেকজনের লাভ হয়ে গেল।দুনিয়া বড়ই বিচিত্র!

১৫৩/ যোগী চিনি ধিয়ানো, ছাগি চিনি বিয়ানো, ঘোড়া চিনি কানো,
নাপতর পুত যে বাদশা অইছইন তানে চিনি দানো ।
ব্যাখ্যাঃ- যোগী চেনা যায় ধ্যানে, ছাগল চেনা যায় বিয়ানো তে(বিয়ানো মনে হয় দুধ বিয়ানো),ঘোড়া চিনা যায় কান দেখে।আর নাপিতের পুত্র সন্তান বাদশাহ হলে তাকে চেনা যায় তার দান করা দেখে।

১৫৪/ উঠতে বেকা চান, জনম বেকা গ্যাং,
তেতই বেকা ফুলো, মানু বেকা মুলো।
বা,
যার হাতো অয় না, তার হাতাইশ ও অয় না—যার সাত বছরে জ্ঞান বুদ্ধি হয় না,তার সাতাশি বছরেও হবে না।
ব্যাখ্যাঃ- চন্দ্র উঠিবার সময় বাকাঁ থাকে, গাং থাকে সারাজীবন ই বাকাঁ।(গ্যাং মনে হয় খাল)।তেতই মানে তেতুল।তেতুল ফুল বাকাঁ থাকে। আর মানুষ বাকাঁ হয় ছোটবেলায়।এরকম আরেকটি প্রবাদ আছে,

১৫৫/ এড়া মাউগ আগে হাজে, ফাটা ঢোল আগে বাজে।

ব্যাখ্যাঃ-যে কম জানে সে সব ক্কিছু আগে আগে করতে যায়।অনেক টা খালি কলসী বাজে বেশী ভরা কলসী বাজে না টাইপের প্রবাদ।

১৫৬/ জামাই মরলা হাঞ্জা রাইত/ কান্দিয়া উঠইন পথা রাইত

ব্যাখ্যাঃ- এর মানে হল, স্বামীর মৃত্যু হইছে সন্ধ্যায়।কিন্তু বউ মাঝ রাতে দুঃখে কেদে উঠলো।ফথা রাইত হচ্ছে রোজায় সেহরী খাওয়ার যে সময় সেটা।

১৫৭/ সারাদিন দিন অনে আর হনে/ হাই আইলে বারা বানে
ব্যাখ্যাঃ- সারাদিন ঘোরাঘোরি করে,কিন্তু স্বামী ঘরে আসলেই কাজে লেগে যায়!

১৫৮/ আটাত্ চিনা যায় বাড়ী কোন গাঁও।

ব্যাখ্যাঃ- হাটা দেখেই বুঝা যায় কে কোন গ্রামের লোক।

১৫৯/ এন্ডা পাড়ে না মুরগী কর্করানিত ডাটঁ।

ব্যাখ্যাঃ- মুরগী ডিম পাড়ে না,কিন্তু চিল্লানি শুনলে মনে হয় ঘর ভরে ফেলছে।বেয়াদব মুরগী।

১৬০/ ধীরে আটে বয়না, তার লাগ কেউ পায় না

ব্যাখ্যাঃ- অধ্যাবসায় ও স্থিতধী ব্যাক্তির জয় নিশ্চিত।খরগোশ কচ্ছপের গল্পের থিমটাই এই প্রবাধের অর্থ।ধীরে আটে মানে আস্তে হাটে, বয়না মানে বসে না,তার লাগ কেউ পায় না মানে তাকে কেউ ধরতে পারে না।

১৬১/ আইল দারুন বারিষা কাল, ছাইগ্যে চাটে বাঘর গাল ।

ব্যাখ্যাঃ- সময় খারাপ।কেয়ামতের আলামত।প্রবল শত্রু রাও মিত্র এখন!

১৬২/ ঝি দিলাম হাই ঠাইন, পুত দিলাম বউ ঠাইন-আরদাশ করমু কার ঠাইন ।

ব্যাখ্যাঃ- ঝি দিলাম হাই ঠাইন মানে মেয়ে দিলাম মেয়ের জামাইর কাছে,পুত দিলাম বউ ঠাইন মানে ছেলেকে দিলাম বউয়ের কাছে।এখন কাকে আদেশ করব!

১৬৩/ মায় কাড়ে গু মূত, হইড়্যে খায় ঘি, অমন দুখখর কথা কারে কৈমুগি ।

ব্যাখ্যাঃ- মা কে রেখে যেসব ছেলে শাশুড়ি কে বেশী পছন্দ করে তাদের জন্য এই প্রবাদ।
১৬৪/ তন দেখাইলে মন নাশ, তল দেখাইলে যোগীর ও অয় সর্বনাশ

এটা বুঝতে হলে একটা গল্প পড়তে হবে।ঈশ্বরচন্দ্রের বেতাল পঞ্চবিংশতি তে এই গল্প সন্ধান পাই।কোন এক বনে থাকতেন এক ঋষি।তিনি তেতুল গাছে উল্টা হয়ে ঝুলে ধ্যান করতেন। অনেক বছর ধ্যান করে প্রায় বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। হটাত এক রাজার ইচ্ছা হল উনার ধ্যান ভাঙ্গাবেন।অনেক চেস্টা করেও ভাঙ্গাতে পারলেন না।পরে রাজ্যে ঘোষনা দিলেন যে ওই ঋষির ধ্যান ভাঙ্গাতে পারবে তিনি তাকে অর্ধেক রাজ্য লিখে দিবেন। এক মেয়ে এসে বলল, এইটা কোন ব্যাপার হইল!আমি ঋষির ধ্যান ভাঙ্গাব এবং তার ঔরষজাত সন্তানকে তার কাধে চড়িয়ে রাজ্যে নিয়ে আসব। মেয়েটা তার কথা রেখেছিল সে কয়েকবছর পর সাধু কে রাজ্যে নিয়ে আসল তখন সাধুর কাধে ছিল তারই গর্ভজাত ও সাধুর ঔরষজাত পুত্রসন্তান!!

ব্যাখ্যাঃ- যোগীর ধ্যান ও মেয়েরা ভাঙতে পারে।দে আর পাওয়ারফুল।

১৬৫/ ”আইছেরে ভাই কলি কাল,
ছাগিয়ে চাটে বাঘর গাল।।”
ব্যাখ্যাঃ- অসামঞ্জস্য ।

১৬৬/ ক)“বাপে বেটা -গাছে গোটা,
মায় ঝি-গাইয়ে ঘি।।”
খ) “আগর হাল যেবায় যায়,
পরর হালও অবায় যায়।।”
ব্যাখ্যাঃ- ছেলে-মেয়েরা সাধারনত পিতা-মাতা কে অনুসরণ করে।

১৬৭/ “আদেখায় দেখলা,
পুটিমাছে লেখলা।।”
ব্যাখ্যাঃ- সাধারন কাজ করে অনেক বেশি গর্ববোধ করা।

১৬৮/ ক)“হারা রাইত কানভরি হুনলো বেটায় পুঁথি,
বিয়ানে উঠি জিগায়, সোনাভান বেটা না বেটি”
খ) “সাত খণ্ড রামায়ণ পড়ি কয়,
সীতা কার বাপ।”
ব্যাখ্যাঃ- আদ্যোপান্ত সবকিছু জানার পরও না জানার ভান করা।

১৬৯/ ক) যম, জামাই, ভাইগ্‌না
তিন নয় আপনা।।
খ) ভাইগ্‌না কুটুম নিমকহারাম।।
গ) মামার বাড়িত ভাইগ্‌না বইতল।
ব্যাখ্যাঃ- বিশ্বাসের অভাব।

১৭০/ “পাইয়া পরার ধন,
বাপে পুতে করে কীর্তন।।”
ব্যাখ্যাঃ- পরের ধনে পোদ্দারি।

১৭১/ “চোররে কয় চুরি করিস,
গিরস্তরে কয় হজাগ থাকিস।।”
ব্যাখ্যাঃ- দুমুখো সাপ।

১৭২/ ক)“হক মাতো আহম্মক বেজার,
গরম ভাতও বিলাই বেজার।।”
খ) “উচিত মাতো ভাত নাই,
রাস্তাবায় পথ নাই।। ”
ব্যাখ্যাঃ- রুঢ় সত্য সব সময় তিক্তই হয়।

১৭৩/ “বালা মাইনশে চড় খায়,
গাল হাতইয়া বাড়িত যায়।।”
ব্যাখ্যাঃ- এই ভবে ভালো মানুষের গুরুত্ব একটু কমই।

১৭৪/ “চুরোর মাউগর বড় গলা,
আরও মাংগইন দুধ আর কলা।।”
ব্যাখ্যাঃ- চোরের মার বড় গলা।

১৭৫/ “বোঢ়ায়-ধুঢ়ায়(বিষহীন সাপবিশেষ) রাজ্য পাইলা,
কালসর্প বিওড়ে(গর্ত) গেলা।”
ব্যাখ্যাঃ- অযোগ্য লোকের শাসন।

১৭৬/ “ছালিয়ে লেট-পেট দুইকান কাটা,
ত্রিভুবন দেখাইলেরে তুই চিলাবেটা।”
ব্যাখ্যাঃ- কষ্টসাধ্য কাজ।

১৭৭/ “জলদি কাম(কাজ) শয়তানী,
আস্তে কাম(কাজ) রহমানী।”
ব্যাখ্যাঃ- ধীরে-সুস্থে কাজ করা বাঞ্ছনীয়।

১৭৮/ “চুরে চুরে আলি,
এক চুরে বিয়া করলা আরেক চুরর হালি(শালি)।”
ব্যাখ্যাঃ- চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই।

১৭৯/ “বাপে নায় গুতে,
চুঙ্গা ভরি মুতে।”

ব্যাখ্যাঃ- আতিসাজ্য।

১৮০/ “খাওরা আছইন কররা নাই,
বুড়ি মরলে কানরা নাই।”
ব্যাখ্যাঃ- সুসময়ের বন্ধু(দুধের মাছি)।

১৮১/ “জোয়ানোর জোয়ানকি,
আর বুড়ার এক ধামকি।”
ব্যাখ্যাঃ- অভিজ্ঞতা সব জায়গায়ই কাজে লাগে।

১৮২/ “চেমা ইমানদার থাকি,
খাড়া বেইমান বালা।”
ব্যাখ্যাঃ- স্পষ্টভাষী শত্রু,
নির্বাক মিত্র অপেক্ষা শ্রেয়।

১৮৩/ “দুই নাওয়ে চড়ে যে,
উপোইত হইয়া মরে সে।”
ব্যাখ্যাঃ- এক সাথে দুই কাজ কখনো ঠিক ভাবে হয় না।

১৮৪/ “ঘাট পার হইলেও,
খেওয়ানি হালা।”
ব্যাখ্যাঃ- উপকার করার পরে উপকারীর কথা ভুলে গেলে এই প্রবাদ বলা হয়।

১৮৫/ “হুটকির ভাড়ারও,
বিলাই চকিদার।”
ব্যাখ্যাঃ- যে রক্ষক সেই ভক্ষক।

১৮৬/ “যে যারে নিন্দে,
হে তার পিন্দে।”
ব্যাখ্যাঃ- অকৃতজ্ঞ।

১৮৭/ “আধ মন তেলো হইতো নায়,
আর রাধার নাছও হইতো নায়।”
ব্যাখ্যাঃ- অনিচ্ছা।

১৮৮/ “চুন চুন চুনের ঘটি,
রাইত পোহাইলে উজান-ভাটি।”
ব্যাখ্যাঃ- অস্থায়ী।

১৮৯/ “যার হাতো(সাতো) হয় না,
তার হাতাইশোও(সাতাইশ) হয় না।”
ব্যাখ্যাঃ-সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়।

১৯০/ মায়ের পেটে ভাত নেই বউয়ের চন্দ্রহার!
ব্যাখাঃ- মা কে উপেক্ষাকারী বউ পাগল ছেলে কে তিরস্কার!
১৯১/ “আইজ বুঝবিনা বুঝবি কাইল বুক চাপরাব পারবি গাইল”
ব্যাখাঃ- কাউকে কোন বিষয়ে বার বার সাবধান করার পরেও না শুনলে এই প্রবাদ বলা হয়!
১৯২/ বৌ ভাঈলে চাড়া শ্বাশুড়ি ভাঈলে খোলা।
ব্যাখাঃ-পক্ষপাতিত্ব পুর্ন আচরন।
১৯৩/ বড় উকুন লড়ে-চরে, ছোট উকুন কামড়ায়ে মারে।
ব্যাখাঃ- ছোট শএুর আচমকা আক্রমনে বেশি ক্ষতি হলে এই প্রবাদ বলা হয়্
১৯৪/ আহ্লাদের বউ তুমি,
কেদোনা কেদোনা।
চাল চিবিয়ে খাব আমি,
রেধোনা রেধোনা।
ব্যাখাঃ- বুড়ো যখন তার স্তীকে অতিরিক্ত আহ্লাদ করে তখন এই প্রবাদ বলা হয়।
১৯৫/ বাতাসে পাতিয়া ফাঁদ, ধরে দিতে পারি চাঁদ।
ব্যাখাঃ-দুরুহ কার্য সম্পাদন করে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস কে কটাক্ষ করে এই প্রবাদ বলা হয়।
১৯৬/ মারবো তো গন্ডার,
লুটবো তো ভান্ডার।
ব্যাখাঃ- কোন কাজ করতে হলে বড় লক্ষ্য নিয়ে করা উচিত।
১৯৭/ কথায় টলার চেয়ে পায়ে টলা ভালো
ব্যাখাঃ- যেখানে থাকলে মুখের কথায় নড়চর করতে হবে, সেখানে থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয়।
১৯৮/ হাট-বাজারে লজ্জা নাই,
ঘড়ে ফুলের কুড়ি।
ব্যাখাঃ- নির্লজ্জ মানুষ যখন লজ্জাশীলতার ভান করে তখন এই প্রবাদ বলা হয়।
১৯৯/ ইঁদুর র্গত খুড়েঁ মরে সাপ এসে দখল করে
ব্যাখাঃ- একজন মানুষ কষ্ট করে বাড়ি তৈরি করল আর (গোন্ডারা) খারাপ মানুষ এসে তা দখল করে নিল।

২০০/ কাজের বেলায় ভাগে খাবার বেলায় আগে
ব্যাখাঃ- কিছু সুবিধাবাধি মানুষ আছে কাজের সময় ১০০ হাত দুরে থাকে আর খাবার সময় সবার আগে থাকে।

২০১/ ছড়ায় যে জন পথের কাটা,
তার যেন থাকে জুতা আটা।
ব্যাখাঃ- যে অন্যের ক্ষতি করে নিজেও একদিন একই ক্ষতির সম্মুক্ষীন হতে পারে।
পরের অনিষ্টকারী কে সর্তক করে এই প্রবাদ বলা হয়।

২০২/ ভাত পায় না চা খায়,
সাইকেল চালায়া বাথরুমে যায়।
((পাইলায় ভাত নাই,
ডেউয়ায় নাচে))
ব্যাখাঃ- যার কাছে ১০ টাকা নাই সে যদি ১০০ টাকা খরচ করে তখন এই প্রবাদ বলে।
২০৩/ যত দোষ নন্দ ঘোষ
ব্যাখাঃ- অন্যদের সব অপরাধের দায়,
একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

২০৪/ ‘‘মুঘল-পাঠান হদ্দ হল, ফারসি পড়েন তাতিঁ’’
ব্যাখাঃ- পন্ডিতেরা যেখানে ব্যার্থ, মূর্খ লোক সেখানে হাস্যকর চেষ্টায় মাতে
২০৫/ ভেক না ধরলে ভিক দিলে না।
ব্যাখাঃ- পেশা ও কাজের উপযোগী বেশভূষা দরকার হয়।
২০৬/ ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই।
ব্যাখাঃ- নিকট আত্নীয়দের মধ্যে নিত্য কোন্দল।
২০৭/ বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও থান,
এবারে তোমায় ঘুঘু বধিব পরান।
ব্যাখাঃ- খারাপ মানুষ বদমায়েশিতে বারবার সফল হলেও শেষ পর্যন্ত তার শাস্তি হয়।
২০৮/ দশচক্রে ভগবান ভূত।
ব্যাখাঃ- ভগবান নামে এক লোক রাজার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বড় হচ্ছিল। রাজার কয়েকজন লোক তা সহ্য করতে না পেরে ষড়যন্ত করে তার মৃত্যুর কথা রটিয়ে দিল। রাজা একদিন তার গলার স্বর গুনতে পেয়ে ভগবানের মৃত্যু সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে ষড়যন্তকারীরা রাজাকে জানিয়ে দিল যে, মৃত ভগবান ভূত হয়ে এসেছে। সকলের মুখে একই কথা শুনে রাজা বাধ্য হয়ে তাতেই বিশ্বাস করলেন।
২০৯/ বামুন গেল ঘর তো লাঙল তুলে ধর।
ব্যাখাঃ- এক ব্যাহ্মণ লোকজন লাগিয়ে জমি চাষাবাদ করাতেন। কাজের সময় উপস্থিত থাকলে লোকজন ঠিকমতে কাজ করত। ব্রাহ্মণ বাড়িতে গেলে বা অন্য কাজে গেলেই চাষের কাজের লোকজন আরাম করার জন্যে হালকা করে লাঙল ধরত। এতে জমি আলতোভাবে চায় হত। তদারকহীন কাজে এভাবেই ফাকি চলে।