রাজধানীতে রমরমা যৌন বানিজ্যের নেপথ্যে চমকে দেয়া ‘ভাড়াটে স্বামীর’ রহস্য উম্মোচন (অনুসন্ধান পর্ব-১)

১২:০৫ পূর্বাহ্ন | সোমবার, জানুয়ারী ৩০, ২০১৭ Uncategorized, আলোচিত, আলোচিত বাংলাদেশ, স্পট লাইট

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রবিউল ইসলামকে সাথে নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম, সময়ের কণ্ঠস্বর-

ভাড়ায় চালিত সিএনজি, রিক্সা, অটো সহ অনেককিছুর নামই আমরা জানি। নাগরিক জীবনে দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে ভাড়া করা সামগ্রীর সাহায্য নিয়েই চলতে হয় আমাদের। বলা যায়, প্রয়োজন মেটাতে বেশিরভাগ জিনিসপত্র মেলে ভাড়াতেই । কিন্তু চোখ ছানাবড়া হবে যখন জানবেন এখন ভাড়াতেই মিলছে ‘স্বামী’।

হ্যা, পাঠক ! ঠিকই জেনেছেন । চুক্তি করে ভাড়াতেই এখন মিলছে স্বামী ! ভাড়ায় স্বামীর এই ব্যবসা বেশ রমরমা এখন রাজধানীজুড়ে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক সময় ছোট- খাটো বিভিন্ন প্রয়োজনে ‘স্বামী ভাড়ার’ এই ব্যবসা চললেও মুলত এই চুক্তি সমাজের চোখের আড়ালে রমরমা যৌন বানিজ্যে চালাতেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘জনপ্রিয়’ ।

দিনপ্রতি কমপক্ষে ১শ’ টাকা থেকে শুরু করে  মাসে তিন থেকে থেকে পাঁচ সাত হাজার (স্থান-কাল পাত্র ভেদে কিছু ক্ষেত্রে দশ-বিশ হাজার)  টাকায় এসব স্বামী ভাড়ার চুক্তি  হয়ে থাকে। তবে এর চেয়েও অবাক করার মত বিষয় হলো ‘একই পুরুষ ভাড়ায় খাটেন একাধিক নারীর স্বামী পরিচয়ে। বর্তমানে এসব ভাড়ায় পাওয়া স্বামীর কিছুটা অপ্রতুলতার কারনে পেশাদার ‘ভাড়াটে স্বামীদের অনেকেই একাধিক এমনকি পাচ-সাতজনের ভাড়াটে স্বামী হিসেবেও চালিয়ে যাচ্ছেন এই বানিজ্য।

সময়ের কণ্ঠস্বরের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে একই ব্যক্তির পাঁচ-সাতটি ফ্ল্যাট বাড়িতে স্বামীর পরিচয়ে ভাড়া খাটার বিষয়টি। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে মোজাফফর নামের এক ভাড়াটে স্বামীর গল্পে । তিনি একাই  ৮  নারীর স্বামী হিসেবে ভাড়া খাটেন । ভাড়া খাটার শর্ত হচ্ছে,  সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন স্বামী পরিচয়ে বাসায় অবস্থান করতে হবে, আর বাসার বাজারও করে দিতে হবে।

বাসায় অবস্থান করা ও বাজার করার শর্ত দেয়ার মানে হচ্ছে যাতে আশপাশের লোকেরা কোন প্রকার সন্দেহ না করে। ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে যৌনকর্মীদের স্বামী হিসেবে ভাড়ায় খাটা চারজনের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, মাসে তাদের কারও ভাড়াই পাঁচ হাজারের নিচে নয়, এর চেয়ে বেশিও আছে ২০- ৩০ হাজার পর্যন্ত । আর কেও কেও নিজেই সবকিছু পরিচালনা করে মাসে গুনছেন কয়েকলক্ষ টাকা পর্যন্ত।

‘ভাড়াটিয়া স্বামীদের’  কাছ থেকে জানা গেছে, মুলতঃ বাড়ি ভাড়া নেবার সময় বলা হয় বাসায় নিয়মিত থাকবে তার স্ত্রী ও দুই বা তিন বোন। ওই বোনদের থাকার কথা বলে জায়েজ করে নেয়া হয় আরও দু’-তিনজন যৌন কর্মীকে।

এভাবেই রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে চলছে যৌন বাণিজ্য। রাজধানী ঢাকায় সময়ের কণ্ঠস্বর প্রতিবেদকের সরেজমিনে প্রায় ১৫ দিনের চালানো অনুসন্ধানে দেখা গেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

অনলাইনে পাওয়া ঢাকার একটি স্কট সার্ভিসের সাইট থেকে সংগ্রহ করা ফোন নাম্বার দিয়ে শুরু হয় প্রথম অনুসন্ধান। এরপর ‘অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে’ এই প্রতিবেদকের টানা অনুসন্ধানে’ভাড়াটে স্বামী’ সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে

অন্ধকারের নেপথ্য রহস্যের চমকপ্রদ সব গল্প!

অন্ধকারের নেপথ্য রহস্য পর্ব-১ 

 

কালের পরিক্রমায় একসময়ের গার্মেন্টস শ্রমিক শরিফুল মিয়ার হাতে এখন দামী মোবাইল, গায়ে দামী স্যুট চলাফেরার জন্য আধুনিক গাড়ি আর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভাড়ায় হলেও থাকেন ছয়-সাতটি ফ্লাটে !  পুরোদস্তুর ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত এইসময়ের শরিফ ভাই একাই কমপক্ষে আধাডজন স্ত্রীর ভাড়াটে স্বামী বর্তমানে !

বরিশালের বরগুনা জেলা থেকে প্রায় একযুগ আগে কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসা শরিফুল (৩৮ ) তার পরিবার নিয়ে থাকেন লালবাগে একটি ভাড়া বাসায় । দুই মেয়ে একও ছেলে আর স্ত্রী নিয়ে সংসার তার।অনুসন্ধানকালীন বিভিন্ন সময়ে আলাপকালে শরিফুল এই প্রতিবেদককে জানায়, শুরুতে একাই এসেছিলেন ঢাকায়। মিরপুরে একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন সেখানে কাজের সুবাদে পরিচয় হয় হাসিনা নামের এক তরুনীর সাথে।

একসময় কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে পড়ে দুজনেই। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে দুজনেরই । বাসায় খরচ পাঠানোতো দূর ঢাকায় নিজেদের থাকা-খাওয়াই অসম্ভব হয়ে যায়। অনেক ভেবে কুল-কিনাড়া না পেয়ে আলাদা আলাদা খরচ বাঁচাতে বিয়ে না করেও দুজনে স্বামী-স্ত্রী  পরিচয়ে উঠে মোহাম্মদপুরে এক ভাড়া বাসায়। এরপর খরচ যোগাতে সহজ পথেই বেছে নেয় যৌন ব্যবসার পথ। সেসময় মোবাইল ফোন কিছুটা সহজলভ্য হবার সুবাদে প্রথমদিকে ধারে-কাছের পরিচিতজনদের নানা কৌশলে ফোনে আমন্ত্রন জানিয়ে শরিফুল খদ্দের ম্যানেজ করতো। শুরুর দিকে সপ্তাহে তিনচারজন খদ্দের যোগাড় হলেই বেশ চলে যেতো তাদের খরচ।

এরপর চাহিদা বাড়তে থাকে পরিচয় হয় খুলনা থেকে কাজের সন্ধানে আসা আরও  এক তরুনী মনিরার সাথে। চুক্তির ভিত্তিতে শরিফুলের শ্যালিকা পরিচয়ে মনিরা উঠে পড়ে তাদের সাথে । ততদিনে আগের বাড়ির মালিক ব্যাপারটা আচ করায় বাসা বদল করে এবার ভালো পরিবেশে মিরপুরে একটি ফ্লাট নেয় শরিফুল।

আলাপকালে শরিফুল জানায়, ততদিনে এমন সহজ উপায়ে টাকা উপার্জনের নেশায় পেয়ে বসেছিলো তার । এরইমধ্যে পরিচয় হয় স্থানীয় কিছু বখাটের সাথে। বাসায় মনিরা ও হাসিনা রং নাম্বারে ফোন করে প্রথমে প্রেম ও পরে নানা কায়দায় সিরিজ আকারে নিয়ে আসতেন নতুন নতুন খদ্দের। অনেক সময় নানা তথ্য সংগ্রহ করে  টার্গেট করে ফোন দিয়ে ফাঁদে ফেলা হতো অনেককেই। (পরের পর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত থাকবে) ।

শরিফুলের ভাষ্যমতে, প্রতিমাসে অন্তত একজনকে টার্গেট করে বাসায় এনে স্থানীয় মাস্তানদের সহায়তায় টার্গেটের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হতো মোটা অংকের টাকা । কৌশল হিসেবে  মুলত অন্তরঙ্গ মুহুর্তের সময় ছবিধারন করে জিম্মি  করা হতো টার্গেটকে, এরপর থানা-পুলিশ ও সম্মানের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হতো। পরে টাকার ভাগাভাগি হতো।

এরপর, ২০১০ এর দিকে ইন্টারনেটের বহুল প্রসারের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে শরিফুল অনলাইনে খদ্দের যোগাড় করার লক্ষে গড়ে তোলে অনলাইন স্কট সার্ভিস। ফেসবুকে পেজ খুলে বিভিন্ন সুন্দরী তরুনী-যুবতীদের ছবি দিয়ে রেট ও স্পর্শকাতর বিবরন দিয়ে আকৃষ্ট করা হতো মানুষকে। শরিফুলের ভাষায় প্রচুর সাড়া মেলে এতে। ততোদিনে নিজের অবস্থার আমুল পরিবর্তন হয়ে যায়। জমানো টাকায় একটি ছোটখাটো গাড়ি কিনে পোশাক-আশাকে দারুন ভদ্রলোক শরিফুল।

এরপর প্রচুর খদ্দের পাওয়া শুরু হলে, নানা কৌশলে বাড়িওয়ালা, স্থানীয় ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে  পর্যায়ক্রমে শরিফুল উত্তরা, বনানী, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, ও  পুরান ঢাকায় মোট ৫ টি ফ্লাটে  ৫ জনকে নিজের স্ত্রী এবং তাদের সাথে  বোন ও শ্যালিকা সহ নানা পরিচয়ে কমপক্ষে ডজনখানেক ‘সুদক্ষ’ যৌনকর্মীকে রেখে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। (পরের পর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত থাকবে) ।

প্রতিটি স্থানে স্বামীর পরিচয়ে  পালাক্রমে সপ্তাহের বিভিন্ন সময়ে   গিয়ে ‘বাড়িভাড়ার শর্ত’ পুরন করে লালবাগে থাকা নিজের আসল পরিবারকেও বেশ সময় দিয়ে চলেছেন সরিফুল নামের এই ঝানু ভাড়াটে স্বামী । স্ত্রী পরিচয়ে থাকা এসব যৌনকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন অফিসে চাকুরিরত নারী, কলেজ পড়ুয়া তরুনীরাও রয়েছেন বলে জানান শরিফুল।

তবে এরকম ব্যবসা অনেক ঝুকির মধ্যেই করতে হয় তাকে। তার ভাষায়, শুরুর দিকে বিপদে কেও পাশে না থাকলেও দীর্ঘ পথচলায় সমাজের অনেক উচুতলার মানুষ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সাথেই পরিচয় আছে তার। এখন কোন সমস্যা হলে তাদের কারো সহায়তায় বেরিয়ে আসতে পারেন সহজে । খদ্দেরের চাহিদা মতে স্কুল, কলেজ পড়ুয়া তরুনীদেরই ডিমান্ড বেশি এই লাইনে। শরিফুল জানালেন, এখন ঢাকায় নতুন নতুন অনেক মেয়েরাই আসছেন এই পথে। অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুনীরা নিয়মিত না হলেও মাঝে মাঝে চলে আসেন উপরি ইনকামের খোঁজে।

চলবে—

বিস্তারিত অনুসন্ধানে রাজধানীতে কমপক্ষে তিন ধরনের কাজের জন্য মহিলাদের স্বামী পরিচয়ে পুরুষ ভাড়া করার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা গেছে। এরমধ্যে সবার চোখ ফাঁকি দিতে যৌন ব্যবসার ক্ষেত্রেই মুলত চলছে ভাড়াটে স্বামীর বাণিজ্য।

( পরের পর্বে বিস্তারিত )