বঞ্চিত হচ্ছে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীরা: নিয়োগ প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন পরিবর্তন জরুরি নয় কি ?

৩:২৫ অপরাহ্ন | মঙ্গলবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৭ শিক্ষাঙ্গন, স্পট লাইট

রবিউল হোসেন, সময়ের কণ্ঠস্বর:

দেশের প্রায় প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রশ্নের ক্যাটাগরি জনিত সমস্যার কারনে আটকে যাচ্ছে ব্যবসায় অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা। ফলে বিসিএস, ব্যাংকসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই নিয়োগ প্রশ্নপত্রের ক্যাটাগরি জনিত সমস্যার কারনে এই অনুষদের শিক্ষার্থীরা চাকুরী ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে! এমতাবস্তায় ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ‘নিয়োগ পরীক্ষায়’ প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন পরিবর্তন জরুরি নয় কি?

বানিজ্য বিভাগ থেকে একজন শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে ৫-৭ বছর লেগে যায়। বিসিএস সহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ প্রশ্নপত্রে) পরীক্ষায় এই ৫-৭ বছরের পড়াশুনা থেকে সরাসরি প্রশ্ন আসে না। অর্থাৎ প্রাথমিক যাচাই-বাছাই প্রশ্নপ্রত্রে (এমসিকিউ ) ব্যবসায় অনুষদের প্রাসঙ্গিক কোন প্রশ্ন দেওয়ার জন্য কোন ক্যাটাগরি নাই। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারন বিজ্ঞান ও গনিত প্রশ্ন রাখা হয়, মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস, সুশাসন ও সরকার ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন রাখা হয়, বাংলা ও ইংলিশ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ও ইংরেজি প্রশ্ন রাখা হয়। কিন্তু ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতে সরাসরি কোন প্রশ্ন রাখা হয় না। যেহেতু নিয়োগ প্রশ্নপত্রের ক্যাটাগরিতে এই অনুষদের প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন দেওয়ার বিধান থাকে না ফলে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীরা (দেশের উচ্চ শিক্ষিতদের বড় একটি অংশ) চাকুরীর ক্ষেত্রে সমান সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে ! নিয়োগদানকারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের নীতিনির্ধারক ও নিয়োগকর্তাদের এবিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহন করা প্রয়োজন।

business-student

অনেকের মনে ভাবনা আসতে পারে, বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষাতে অন্যান্য অনুষদের ন্যায় এই অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট নম্বরের প্রশ্ন থাকে। কিন্তু এক সারি চারা গাছ থেকে যদি অর্ধেক চারা গাছকে ছোট অবস্থায় ঢাকনা দিয়ে দেওয়া হয় হয়, তাহলে ঢাকনা ভেঙ্গে কয়টি চারা বেরুতে পারবে? এ প্রশ্ন বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ডের নীতিনির্ধারক ও প্রশ্নকর্তাদের কাছে সবিনয়ভাবে পেশ করিলাম! এভাবেই ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীরা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রশ্নের ক্যাটাগরি জনিত সমস্যার কারনে বাছাই পরীক্ষাতেই ছিটকে পড়ছে। এবার আসুন বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষায় যদি কেউ বোথ ক্যাডারে আবেদন না করে, তাহলে তো ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা সাধারনত কোন কাজে আসছেনা। ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বাছাই পরীক্ষাতে (এমসিকিউ) নির্দিষ্ট নম্বরের কোন ক্যাটাগরি রাখা হয়না। মাঝে মাঝে ২-৩ টা প্রশ্ন থাকে তাও আবার অর্থনীতি ও ব্যাংকিং রিলেটেড।

গত ১২ জানুয়ারি প্রথম আলো পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে দেখলাম- ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজম্যান্ট বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি পাস করে এক তরুণ। চাকরি না পেয়ে, ঢাকা হাতিরঝিল পাড়ে একটা প্লাস্টিকের টেবিল পেতে লোকজনের রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা নির্ধারণ করে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সে আক্ষেপ করে বলেছিল-‘কোন আক্কেলে যে মাস্টার্স পড়তে গেলাম! এর থেকে চাষাবাদ করাই শ্রেয় ছিল। এখন আছি উভয় সংকটে এলাকায় গিয়ে চাষাবাদ করতে গেলেও মানুষ তিরস্কার করবে’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এমবিএ) ছাত্র আবদুল মান্নান বলেন, বিসিএস, ব্যাংকসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই নিয়োগ প্রশ্নপত্রের ক্যাটাগরি জনিত সমস্যার কারনে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীরা চাকুরী ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা কাজে আসছেনা। নিয়োগ প্রশ্ন ক্যাটাগরি সেই মান্দাতাদের আমলেই রয়ে গেছে। বিসিএস, ব্যাংকসহ সকল নিয়োগ পরীক্ষায় (প্রিলিমিনারি ও লিখিত) সবার জন্য লেবেল প্লেয়িং রাখা প্রয়োজন। ব্যবসায় অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের সমান সুবিধা দিতে হলে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে প্যাটার্ন পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। একজন বিসিএস ক্যাডারদের যখন সব বিষয়ে মোটামুটি ধারনা রাখতে হয় ,তাহলে ব্যবসায় অনুষদ সম্পর্কেও ধারনা থাকা প্রয়োজন। মোটকথা সকল নিয়োগ পরীক্ষায় লেবেল প্লেয়িং এর জন্য ব্যবসায় অনুষদ রিলেটেড নির্দিষ্ট নম্বরের প্রশ্ন রাখতে হবে। ইদানিং ব্যাংকিং সেক্টরের নিয়োগ বিজ্ঞপিগুলোতেও চাকুরী প্রার্থীদের যোগ্যতা ‘যে কোন বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়’ ফলে এক্ষেত্রেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। যদি সবার জন্য সমান সুবিধা হয়, তাহলে বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের প্যাসিফিক সেক্টর গুলোতে কেন বানিজ্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা চাকুরীর জন্য আবেদন করতে পারে না ?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সাবেক ছাত্র মো: আলমগীর হোসেন জানান, আমাদের ব্যবসায় অনুষদের একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে চাকরী বাজারের পড়াশুনার কোন মিল নেই। চাকুরী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীদের কথা বাদ দিয়ে করা হয়। ফলে মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগের একডেমিক পড়াশুনা প্রশ্ন কমন পড়ে, কিন্তু আমাদের একাডেমিক পড়াশুনা কোন কাজে আসছেনা। ফলে পড়াশুনা শেষে এই অনুষদের শিক্ষার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনা। প্রশ্নপত্রের ক্যাটাগরি জনিত সমস্যার কারনে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীরা চাকুরীর ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে! দেশের একটি বৃহত্তর অংশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি ।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক ছাত্র মো: দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন -‘২০০৭-০৮’ সেশনে অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিশ্রমের ফসল হিসেবে অনার্স ফাইনাল রেজাল্টে আমি ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম হই। ৩ বছর হয়ে গেছে এখনো কোন ভালো চাকুরীতে যোগদান করতে পারি নাই। আত্মীয়-স্বজনরা যখন ফোন করে জিজ্ঞাসা করে কি চাকুরী করছো? বেতন কত পাও? তখন খুব বিব্রত হই। ভালো চাকুরী হবেইবা কেমনে? ব্যবসায় অনুষদে পরে মনে হচ্ছে জীবনে বড় ভুল করেছি। বিসিএস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন চাকুরী নিয়োগের প্রিলিমিনারি (এমসিকিউ প্রশ্নপত্রে) পরীক্ষায় ব্যবসায় অনুষদের পড়াশুনা থেকে সরাসরি ১টি প্রশ্নও আসে না। যারা মানবিক বিভাগে পড়াশুনা করেছে- তাদের ইতিহাস, ভুগোল, সাধারণ জ্ঞান, সুশাসন ও সরকার, বাংলা, ইংরেজি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা থেকে নিয়োগ পরীক্ষায় কমন পড়তেছে এবং বিজ্ঞান বিভাগে থেকে যারা পড়াশুনা করেছে- তদের বিজ্ঞান, গনিত কমন পড়তেছে। কিন্তু বিসিএস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন চাকুরী নিয়োগ পরীক্ষায় এমসিকিউ প্রশ্নপত্রে ব্যবসায় অনুষদের প্রাসঙ্গিক কোন প্রশ্ন দেওয়া হয় না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক আবদুল জব্বার’র মতামত জানতে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন- আমাদের দেশের নিয়োগ প্রশ্ন ক্যাটাগরি সেই মান্দাতাদের আমলের। গত ৩০-৪০ বছর ধরে ‘নিয়োগ পরীক্ষায়’ একই প্রশ্ন প্যাটার্ন ফলো করে আসছে। আরেকটা বিষয় হলো কোন এক সময় শুধু বিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদ ই চালু ছিল। আমি যখন ১৯৯৬ সালে একটি স্কুলে পড়াশুনা করতাম, তখন স্কুল পর্যায়ে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালু ছিলনা। কলেজে ভর্তির পর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ পাই। লক্ষ্য করলে দেখবেন-আমাদের দেশে যারা সচিব পর্যায়ে আছে, তারা প্রায় সকলেই বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের স্টুডেন্টস। ফলে নিয়োগ পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন প্যাটার্নে ব্যবসায় অনুষদ রিলেটেড নির্দিষ্ট মার্কের প্রশ্ন থাকে না। দেশের নীতি-নির্ধারকদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নীতি-নির্ধারকদের মাথায় রাখাতে হবে যে, সমান সুযোগ পেলে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীরা ব্যাংকিং, ম্যানেজমেন্ট সেক্টরসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবে। সময়ের সাথে সাথে নিয়োগপ্রশ্ন ক্যাটাগরির যে পরির্বতন প্রয়োজন। আমি মনে করি-দেশের বিপুলসংখ্যক স্টুডেন্টদের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রশ্নেপত্রে ব্যবসায় অনুষদ রিলেটেড নির্দিষ্ট নম্বরের প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্র বলেন, ‘ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সসিয়াল সেক্টর গুলোতে ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষার্থীদের প্রায়োরিটি দেওয়া উচিত। এই সেক্টরগুলোর নিয়োগ পরীক্ষায় ( এমসিকিউ ও রিটেনে) ব্যবসায় অনুষদের রিলেটেড সুনির্দিষ্ট নম্বরের প্রশ্ন রাখা উচিত। ব্যবসায় অনুষদের রিলেটেড প্রশ্ন না দেওয়া হলে একাডেমিক পড়াশুনা তো কোন কাজে আসছেনা, তা নীতিনির্ধারকদের ভাবা প্রয়োজন’।

বর্তমান সরকারের ‘শিক্ষার্থী বান্ধব ও পরিবর্তনে বিশ্বাসী সরকার’ বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, যেমন এখন চার বছরের অনার্স কোর্স চার বছরেই সমাপ্ত হচ্ছে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজের ভর্তিতে ‘অনলাইন’ প্রক্রিয়া চালু করার কারনে ভর্তি বানিজ্য ও তদবির প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সময় দেখতাম- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ভালো সাবজেক্টগুলোতে ভর্তির জন্য অমুক নেতার ২০ টি, তুমক নেতার জন্য ২৫ সিট বরাদ্ধের তদবির আসতো… চাহিদাকৃত সিট না দিলে কলেজে ভাংচুর হতো। ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলে বিভাগীয় প্রধান ও প্রিন্সিপালরা আতংকে থাকতেন। সুতরাং ব্যবসায় অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের কথা বিবেচনা করে, সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সেক্টরে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে প্যাটার্ন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রশ্নপত্রে প্যাটার্ন পরিবর্তন হলে দেশের একটি বৃহত্তর অংশের শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শনের সমান সুযোগ পাবে এবং বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের একটি মাইলফলক তৈরি হবে।