আড়াইহাজারের সবজি রপ্তানি হচ্ছে বর্হিবিশ্বের ৫০টি দেশে


এম এ হাকিম ভূঁইয়া, আড়াইহাজার প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের নগর জোরার গ্রামের শাহ আলম মিয়া। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেও কোনো চাকরী না পেয়ে অনেকটা হতাশ হয়ে পড়ে ছিলেন।

arai-hajar

পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় তার ওপর ছিল বাড়তি চাপ। অনেক চেষ্টা করেও চাকরী নামের সোঁনার হরিণ ধরা দিচ্ছিল না তাকে। বেকারত্বের অভিশাপে যেন কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল শাহ আলমকে। তারপরও মনবল নষ্ট হয়নি। হঠ্যাৎ ২০১৩ সালে স্থানীয় এক বন্ধুর পরামর্শে জমি বন্ধক নিয়ে সবজি চাষ শুরু করেন শাহ আলম মিয়া। প্রথম বছরেই তিনি লাভের মুখ দেখতে পান। অবশেষে তার হাতে ধরা দিল সোঁনার হরিণ। সবজি চাষের আয় দিয়ে সংসারের খরচ মিটিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করা হচ্ছে। স্বল্প সময়ে অধিকলাভ জনক ও ঝুঁকিমুক্ত হওয়ায় তার মতো অনেক বেকার যুবক এটাকে পেশা হিসাবে নিয়েছেন।

সেচের অভাবে যেসব জমিতে একটি মাত্র সফল হতো সেখানে বছর জুড়ে হচ্ছে সবজি। দিগন্ত জুড়ে সবুজের শুধু সমরোহ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে সবজি চাষ করে অনেক বেকার যুবক স্বাবলম্বি হয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী সবজি চাষ করে লেখাপড়ার খরচ জোগাচ্ছেন। চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। স্থানীয় বিভিন্ন এনজিও এসব চাষিদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২১০০ হক্টের জমিতে এ বছর সবজির চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ১,৯২০ মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন। জানা গেছে, সবজি রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আবুদাবিসহ বর্হিবিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে। জমিতে পোকামাকড় দমনে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব বালাই (উদ্ভিদ থেকে তৈরি কীটনাশক), আলোর ফাঁদ ও সেক্সফিউরোমন ফাঁদ। এতে অটুট থাকছে সবজির গুনগতমান। উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে এ বছর সবজি চাষ করা হয়েছে। সবজি চাষে নতুন উদ্যোগক্তা সৃষ্টির পাশপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে চাষিদের সার্বক্ষণিক বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন উপসহাকারি কৃষি অফিসার আকলিমাসহ অন্যান্য কৃষি কর্মকর্তারা।

নগরজোয়ার এলাকার চাষি শাহ আলম বলেন, বেকারত্বের অভিশাপে আমাকে যেন কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল। তখন ২০১৩ইং সাল। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় সংসারের পুরো চাপ পরে আমার ওপর। স্থানীয় কলেজ থেকে ড্রিগ্রী পাশ করি। দীর্ঘদিন চাকরীর পেছনে ঘুরেছি। কিন্তু চাকরী নামের সোঁনার হরিণ আমাকে ধরা দেয়নি। বাবার একার আয়ে সংসার চলতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছিল। বন্ধ হয়ে যায় ছোট ভাইবোনের লেখাপড়া। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও সামনেই এগোতে হবে।

তিনি জানান, স্থানীয় একটি এনওজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৫০ শতাংশ পতিত জমি বন্ধক নিয়ে ফুলকপি ও বাঁধা কপির চাষ করেন। সে বছরই তিনি লাভের মুখ দেখতে পান। পরে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বছর ঘুরতেই শাহ আলম আরো ৬০ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে সীম, গাজর, শালগুম ও মুলার চাষ করেন। জমিতে পোকামাকড় দমনে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশকের পরিবর্তে জৈববালাই (উদ্ভিদ থেকে তৈরি কীটনাশক), আলোর ফাঁদ ও সেক্সফিউরোমন ফাঁদ। এতে উৎপাদ হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি। অটুট থাকছে সবজির গুনগতমান।

শাহ আলম জানান, চলতি বছরের এ পর্যন্ত সবজি বিক্রি করে তিনি প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় করেছেন। তার জমিতে ৩ জন শ্রমিক প্রতিমাসে ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন। শাহ আলম মিয়া জানান, রাজধানীর শ্যামবাজারের তিনজন সবজি ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে সবজি কিনে বিদেশ রপ্তানী করছেন।

শিলপান্দি এলাকার চাষি নাইম জানান, তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ১২ জন। সংসারের অভাব অনটন যেন পিছু ছাড়ছিল না। বাবা লোকমান মিয়ার একার আয়ে সংসার চলতে অনেক কষ্ট হতো। উপয়া না পেয়ে পাওয়ারলুমে কাজ করেছেন তিনি। মাঝে মধ্যে রিকশাও চালিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০১৪ইং স্থানীয় এক শিক্ষকের পরামর্শে কৃষি কাজের চিন্তা ভাবনা করি। একটি এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পতিত জমিতে লাউ ও মিষ্টি কুমড়ার চাষ করি। সে বছর প্রায় ১ লাখ টাকার মতো আয় হয়। পরে আরো ৯০ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর ও লালশাকের চাষ করা হয়। চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

লিটন ও শাহ আলমের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সবজি চাষ করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত শিক্ষিত বেকার যুবক স্বাবলম্বি হয়েছেন। তারা বলে, সবজি প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তাদের আরো লাভ হতো। স্থানীয় কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে জামেলা পোহাতে হয়। বিভিন্ন এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করতে হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আবদুল কাদির সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, বর্হিবিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে। স্বল্প শিক্ষিত ও উচ্চ শিক্ষিত প্রায় শতাধিক যুবক সবজি চাষে জড়িত রয়েছেন। তারা চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন। উৎপাদন বাড়াতে তাদের নানা পরামর্শসহ প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

◷ ১২:০০ অপরাহ্ন ৷ বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৭ ঢাকা, দেশের খবর