ফরিদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এখন দুর্নীতির শীর্ষে : চরম দুর্ভোগে গ্রাহকরা

৪:৩৪ অপরাহ্ন | বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৭ ঢাকা, দেশের খবর

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুর জেলার প্রধান ক্রাইম জোন এখন জেলার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি। দিনের বেলা যেখানে শুধু টাকা উড়ে। এ অঞ্চলের মানুষের মুখে এখন একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে, “পাসপোর্ট অফিসটি এখন হরিলুটের কারখানা, টাকা ছাড়া কারো ভাগ্যে পাসপোর্ট মিলে না”।

pasport

পাশাপাশি এ কথাটি শোনা যায় এডির চেয়ে ইউডিএ বড়, ইউডির চেয়ে পিয়ন বড়। মোট কথা এই পার্সপোর্ট অফিসটির রন্ধে রদ্ধে দুর্নীতির আখরায় পরিণত হয়েছে। এই অফিসটির মেইন গেট থেকে শুরু করে পরিচালক পর্যন্ত তথা (২য় তলা পর্যন্ত) ঘুষ বাণিজ্যের অভয় আশ্রমে পরিনত হয়েছে। দেশ ভরে একটি কথা প্রচলন আছে প্রমান ছাড়া কোন কিছু ধরা, জানা সম্ভব নয়। কিন্তু আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটির এমন সিস্টেম একজন পাসপোর্ট গ্রাহকও যদি অফিসে প্রবেশ না করে তারপরেও দিন শেষে একশত থেকে দেড়শত লোকের ফাইল জমা নেওয়া হয়।

প্রশ্ন উঠছে তাহলে ফাইল জমা দিলো কে ? এখানেই মজার ব্যাপার। কিভাবে ফাইল অফিসে ঢুকে ? প্রতি বৃহস্পতিবার, সাপ্তাহিক অফিসের শেষ কর্মদিবসে দুপুর ১ টা থেকে ২টা পর্যন্ত অফিসের কাজ চলে। ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা করে ৪ টার দিকে ১ দিনের ছুটি কাটাতে ছুটে যে যার নিজ বাড়ীতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উক্ত অফিসের এক কর্মচারী সূত্রে জানা যায়, দিন শেষে এই অফিসের হিসাব সহকারীর নেতৃত্বে পাসপোর্ট ফাইলের যাবতীয় টাকা একত্রিত করে সহকারী পরিচালকের কাছে নিয়ে যায় আর সেখানেই হয় ভাগবাটোয়ারা। প্রতি বৃহস্পতিবারে ভাগবাটোয়ারা শেষে পিওন পায় ১০ হাজার টাকা, হিসাব সহকারী পায় ৩০ হাজার টাকা এবং প্রতিদিন ১২০-১৫০ টি ফাইলের প্রতিটির জন্য ৯০০/- টাকা করে সহকারী পরিচালকে দিতে হয়।

সে হিসেব মোতাবেক দেখা যায় সপ্তাহ শেষে সহকারী পরিচালকের একার ভাগেই প্রায় ৪ লক্ষ টাকার উপরে আসে এবং অন্যান্যদের ভাগে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। এই অফিসের ১০ জন আনছার ও ৬ জন কম্পিউটার অপারেটরদের এবং ৬/৭ জন অফিস ষ্টাফের রয়েছে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ৫ থেকে ১৫/২০টি পাসপোর্ট ফাইল। আর এই ফাইলগুলো যার যার প্যান্টের পকেটে থাকে। সর্বশেষে, অফিসে জমা পড়ে অফিসের সহকারী পরিচালকের টেবিলে। ঘুরে কাগজপাতি যাচাই পূর্বক কর্মকর্তা স্বাক্ষর করে কাঙ্খিত ব্যক্তি/মহিলাকে ফিংগারিং করাতে বসায়। পড়ে ঐ গ্রাহককে একটি রিসিভ/স্লিপ দেওয়া হয়। আর এখানেই হয় ঘুষের কারবার।

এই জমাকৃত ফাইলগুলো শুধুমাত্র অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইন রক্ষায় নিয়োজিত আনসারদের। তথা অফিস ষ্টাফদের পকেট ফাইল। প্রতি পাসপোর্ট বাবদ সরকারী জমা এবং ঘুষ কত ? সরকারী নিয়মানুযায়ী অতি জরুরী একটি পাসর্পোট করতে ব্যাংক জমা (৬৯০০ ছয় হাজার নয় শত) টাকা + পরিচালক স্বাক্ষর ফি ৯০০ টাকা + পুট আপ ফি ১০০+ অতিরিক্ত খরচ ২০০ টাকা মোট ৮২১০/- টাকা। সাধারণ নরমাল পাসপোর্ট ব্যাংক জমা ৩৪৫০+পরিচালক খরচ ৯০০ + পুট আপ ফি ১০০+ অতিরিক্ত খরচ ২০০) ৪৬৫৫/- টাকা অভ্যান্তরীন জরুরী ও অতিজরুরী এবং গোপনীয় পাসপোর্ট রয়েছে আলাদা আলাদা খরচ।

অভ্যন্তরীন পাসাপোর্ট হলো, শুধুমাত্র কাঙ্খিত পাসপোর্ট গ্রাহক মাত্র ২ কপি ছবি নিয়ে আসবেন। ফরমপুরণ করা, চেয়ারম্যান/ বা নোটারী পাবলিক অথবা সরকারী গেজেটেট কর্মকর্তার সত্যায়িত সিল ও সই সহ ফিংঙ্গারিং মাত্র ৩০ মিনিটে কমপ্লিট হয়ে যাবে, দরকার শুধু চাহিদা মোতাবেক টাকা। এসব পরিচালনার জন্য অফিস এডি ও অফিস পিয়নের আলাদা লোক রাখা আছে প্রয়োজন শুধু ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই ফাইলটির ডিএসবি রিপোর্টও এডি দায়িত্ব নিয়ে করিয়ে দেন।

গোপনীয় পাসপোর্ট হলো, ফরিদপুর অঞ্চলের বাহিরের অনেক আদম দালাল পার্টি ও বিভিন্ন মামলার দাগী আসামীর হত্যা মামলায় নিশ্চিত যাবতজীবন সাজা অথবা ফাঁসি হতে পারে এ রকম আসামীদের বিভিন্ন জেলার ভোটার আইডি কার্ডের ব্যক্তিগত আইডি নং ঠিক রেখে কম্পিউটার থেকে রঙিন ভোটার আইডি কার্ড বের করে ফরিদপুরের ঠিকানায় পাসর্পোট করে দেয় এতে আদম ব্যবসায়ীরা নারী পাঁচারে ও দাগী আসামী পালাতে নিশ্চিত সফল হয়।

টাকায় পরিমান সর্বনিম্ন ২০/২৫ হাজার টাকা। অফিসে পাসপোর্ট জমার নিয়ম কি? সরকারী নিয়মানুযায়ী সহকারী পরিচালক সকাল ১০ টা থেকে ১.০০ টা পর্যন্ত অথবা অধিক সময় পর্যন্ত পাসপোর্ট ফাইল জমা দিলে নানা ধরণের ভুল কাগজপত্রাদীর সমস্যা দেখিয়ে তাহা ফিরিয়ে দেন। পরে অফিস সহকারী ও এম.এল. এস.এস ১ হাজার টাকা দিলে ফাইলটি জমা নিয়ে নেন। কাগজপত্র ঠিক থাকলে ঐ সময় ৩০ মিনিটের মধ্যে ফাইল রিসিভ শাখায় জমা পড়বে এবং দায়ীত্বপ্রাপ্ত আনছার ঐ সকল পুরুষ অথবা মহিলাদের ফিঙ্গারিং করানোর জন্য অফিসে প্রবেশ করাবে। কম্পিউটারের কাজ শেষে গ্রাহকদের একটি ডেলিভারী স্লিপ দেওয়া হয়। এখানেও আবার পুটআপ ঝামেলা। টাকা দিলে রিপোর্ট আগে যায়, না দিলে ফাইল ও রিপোর্ট পরে থাকে দীর্ঘদিন।

বর্তমানে পাসপোর্ট অফিসটির চিত্র একটু ভিন্নতর। প্রতিদিন হাতে গোনা ১০/১২ টি ফাইল জমা পড়ে কাউন্টারে অথচ ফিঙ্গরিং করার জন্য ওয়েটিং রুমে দেখা যায় অর্ধশতাধিক নারী/পুরুষ ফাইল হাতে নিয়ে বসে আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, রবি থেকে বুধবার পর্যন্ত অফিস কম্পিউটার চেক করলে দেখা যাবে দিনে ১৩০টি থেকে ১৫০টি ফিঙ্গারিং এর ডেলিভারী স্লিপ বিতরণ করা হয়েছে অথচ লাইনে ফাইল জমা পড়ছে মাত্র ১৫/২৫ টি, বাকী ফাইল কি ভাবে জমা পড়ল এ প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ যারা গরীব এবং কাঙ্খিত ব্যক্তির পাসপোর্ট করা খুব প্রয়োজন কিন্তু তাদের হয়রানির কোন অন্ত নাই।

এছাড়াও সহকারী পরিচালক নিজে পাসপোর্ট রি-ইস্যুর জন্য নেন ২০০০/-টাকাও ডিমো করার জন্য নেন ৫০০০/-টাকা। এলাকার সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে পাসপোর্ট অফিসতো নয় যেন নগদ টাকার হাট। কাঁচা টাকার জন্য প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠতি বয়সী যুবকরা দ্রুত পাসপোর্ট করাতে এসে স্থানীয় যুবকদের সাথে টাকার ভাগা ভাগি নিয়ে অফিস কর্মচরী ও আনছারদের সাথে অহরহ ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। সব মিলিয়ে এই পাসপোর্ট অফিস নিয়ে ঘটতে পারে একাধিক হতাহতের ঘটনা। প্রয়োজন কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারী।

আরো অভিযোগ পাওয়া যায় যে, নগরকান্দা থেকে মহিদুল ইসলাম, শেফালি আক্তার, গেরদা থেকে আসা নবিরন বেগম, বোয়ালমারী থেকে আবদুল জব্বার, সাব্বির হোসেন, ফরিদপুর সদর আলীয়াবাদ ইউনিয়ন থেকে আব্দুল ওয়াহাব, ওয়ার্লেস পারা থেকে ঈমান আলী বলেন, ফরিদপুর পাসপোর্ট অফিসে ফাইল জমা দিতে আসলে কাউন্টারে জমা দিতেই বিভিন্ন ধরনের ভুল দেখিয়ে তালবাহানা করে লাল কালি দিয়ে দাগ কেটে নতুন করে ফাইল প্রসেস করতে বলে। মর্মাহত হয়ে ফিরে যেতে চাইলে পেছন থেকে দালালেরা এসে বলে এই ফাইলেই আপনার পাসপোর্ট করে দেয়া হবে কিন্তু ১২০০/- টাকা দিতে হবে কারণ ১০০০/- টাকা সহকারী পরিচালককে দিতে হবে বাকি ২০০/- টাকা আমাদের থাকবে। সেই পরিস্থিতিতে গ্রাহকেরা সেই অতিরিক্ত টাকা দালালদের দিয়ে সহজেই পাসপোর্ট করিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে ভুক্তভূগীরা মাননীয় জেলার মন্ত্রী, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

এ ব্যাপারে পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আজমলের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।