পাম গোত্রের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ গোল গাছ, দেখতে গোল না হলেও নাম তার গোল গাছ

৫:৫৬ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ২, ২০১৭ দেশের খবর, বরিশাল

ds


জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের ৩৩৪ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে একটি প্রজাতি হল গোলগাছ। দেখতে গোল না হলেও পাম গোত্রের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির এ উদ্ভিদ স্থানীয় নাম গোলগাছ। সারিবদ্ব ঘন ঝোপের মত বেড়ে ওঠা গোলগাছ গাছের ডাল দেখতে অনেকটা নারিকেল গাছের মত। পাতাও অনেকটা নারিকেল গাছের পাতার মত। তবে নারিকেল গাছের মত লম্বা কান্ড নেই। অনেকে একে নারিকেল গাছের প্রজাতিও মনে করেন।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় গোলগাছ একটি অর্থকারী সম্পদ। সাগরের জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহমান এলাকার বিভিন্ন নদী-খালের মোহনায় পলি জমে জেগে ওঠা চর এবং পাড়ে গোলগাছ জন্মাতে দেখা যায়। বন বিভাগ আফিস সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, সুন্দরবনে প্রচুর গোলগাছ জন্মে । এসব এলাকার পলিযুক্ত মাটি, মৌসুম ভিত্তিক নোনা পানি এবং অবাধ পানির প্রবাহ গোলগাছ বেড়ে ওঠার জন্য সহায়ক।

গোলগাছের রস, শিকর, ফল এবং পাতার রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। এর পাতা ঘরের চাল, নৌকার ছাউনি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কুটির শিল্পের আপরাপর কাজেও গোলগাছের পাতার রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। গোলপাতা এবং রস সংগ্রহ করে মিঠা তৈরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে উপক’লীয় জনপদের অনেক মানুষ। প্রতিবছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে একটি বা দুটি লম্বা ছড়ায় ফল ধরে। খেজুর গাছের মত কাধিতে এই ফল হয়। স্থানীয় ভাষায় এই ফলকে গাবনা বলে। পরিপক্ক হলে এই ফল কেটে খাওয়া যায়। খেতে অনেকটা কাঁচা তালের শাসের মত। তবে নোনতা স্বাদ যুক্ত, রসালো এবং সুমিষ্টি।

গোলগাছের রস সংগ্রহকারীদের স্থানীয় ভাষায় বলা হয় শিয়ালী। ভাল মানের রস অহরনের জন্য শিয়ালীরা কার্তিক মাসের শুরুতেই হৃষ্টপুষ্ট ছড়াটি রেখে ফল সহ বাকী অংশটা কেটে ফেলে। বিশেষ পদ্বতিতে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হয়। দিনে দুবার কেটে রস সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রীহিত রস অধিক তাপে উনুনে ফুটিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। অতি মিষ্টি এই গুড় খুবই প্রিয়। এক সময় এ গুড়ের পরিচিতি এলাকার তেমন থাকলেও এখন এটি বেশ বান্যিজিক প্রসারতা লাভ করেছে। এখন বিভিন্ন হাটে-বাজারে এ গুড় পাওয়া যাচ্ছে। খেজুর বা আখের গুড়ের মত কেজিতে বিক্রি হলেও গোলের গুড় দর বিক্রি একটু বেশি। আখের রসে যেখানে শতকরা ১৫-২০ ভাগ শর্করা থাকে সেখানে গোল গাছের গুড়ে শতকরা ১৩-১৮ ভাগ শর্করা থাকে। এ রসের পিঠা বা পায়েস অতি মুখরোচোখ হয়। অনেকে এর রস দিয়ে তাড়ি (এলকোহল) তৈরি করে।

গোলগাছের নানামুখী ব্যবহার, গুন এবং অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভজনক হওয়া সত্বেও কেবলমাত্র পৃষ্টপোষকতার অভাবে এর বিকাশ ও প্রসার ঘটছেনা। দেশের নদী বা খালের মোহনার পতিত জমিতে গোলগাছ চাষ, রক্ষানাবেক্ষনে কৃষকদের আগ্রহী করে এর বানিজ্যিক প্রসার ঘটাতে পারলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি লাভবান হত। চাহিদার বিপরীতে বিপুল চিনি ঘাটতি পুরনে এই গাছ থেকে আহরিত রসের মাধ্যমে চিনি উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো যেত। প্রাকৃতিক এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতে আনা যেত বৈপ্লবিক পরিবর্তন।