ঢালাও ভাবে ডাক্তারদের লোভী বলার আগে একজন ডাক্তারের কিছু কথা শোনার সময় হবে কি! (১ম পর্ব)

৭:৫৮ অপরাহ্ন | রবিবার, ফেব্রুয়ারী ৫, ২০১৭ আলোচিত, মুক্তমত, স্পট লাইট

ডাক্তার

ডাঃ মারুফ রায়হান খান, সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক।

জাহেদ সাহেব একজন লোভী ডাক্তার। এই লাইনটি নিয়ে অনলাইন অফলাইনে বেশ সমালোচনা হচ্ছে গত কদিন ধরে। ডাক্তাররা লোভী, কসাই আরো কত কি। তবে পরেরবার ডাক্তারদের লোভী বলার পুর্বে একজন ডাক্তারের কাছ থেকেই শুনুন জাহেদ ডাক্তারের মতো লোভী ডাক্তারদের কিছু লোভী গল্প।

১) গর্ভবতী মহিলা ভর্তি হলেন অবসটেট্রিক্স ওয়ার্ডে। ডেলিভারি হলো। যে বাচ্চাটি জন্ম নিলো সে স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই জন্ম নিলো, লো বার্থ ওয়েট— মাত্র ১.৫ কেজির মতো ওজন। বাচ্চার অবস্থা বিশেষ ভালো না। নিবিড় পরিচর্যা অতি প্রয়োজন, তাকে পাঠানো হোল NICU তে ভেন্টিলেটরে। যেহেতু প্রাইভেট মেডিকেল, জেনে থাকবেন— ICU তে অনেক খরচ।

আর ওদিকে অবসটেট্রিক্স ওয়ার্ডে ভর্তি বাচ্চার মা। এবার আপনার অবাক হবার পালা। মা একটু সুস্থ হবার পর রোগীর লোকেরা মাকে নিয়ে কেটে পড়লেন, বাচ্চাকে ফেলে!

হ্যাঁ, বাচ্চা তখনও NICU তে,আর উনারা পগারপার! NICU তে দায়িত্বরত ডাক্তাররা বাচ্চার এটেণ্ডেন্ট না পেয়ে বারবার ফোন দিতে লাগলেন উনাদেরকে। হয় উহারা ফোন ধরেন না, নয়তো এই যে আমরা আসছি, অমুক জায়গায় আছি— এসব বলেন। এভাবে কেটে গেলো প্রায় এক মাস।

অবশেষে বাচ্চার মায়ের চন্দ্রমুখ দেখা গেলো। বাচ্চাকে নিয়ে যেতে হলে তো হসপিটালের এতদিনের বিল পরিশোধ করে যেতে হবে। বিল হয়ে গিয়েছে এতদিনে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। উনাদের কাছে কোনো টাকা নেই। বাচ্চাকে কীভাবে নিয়ে যাবেন?

ইন্টার্নরা একসাথে বসলেন কী করা যায়, বাচ্চাটার জন্য তাদের গভীর মায়া জন্মেছে ততদিনে। চাঁদা তুলে তারা জোগাড় করলেন ৪০/৫০ হাজার টাকা। ছোট করে দেখবেন না, ইন্টার্ন ডাক্তারের বেতন আপনার গাড়ির ড্রাইভারের চেয়েও অনেকক্ষেত্রে কম।

এবার তারা গেলেন হসপিটালের ডিরেক্টরের কাছে— বিলটা যদি একটু কানসিডার করেন। অবশেষে প্রায় ১ লক্ষ টাকা মাফ করিয়ে ঐ টাকাতেই বাচ্চাটাকে রিলিজ করা হোল। ঘটনা শুনে কেউ আবার বলে বসবেন না— মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি!

২। আমরা ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এক ইন্টার্ন হাতে কয়েকটা টাকার নোট এবং পাশে এক লোককে নিয়ে আমাদের কাছে এলেন। ঐ লোকের মা মারা গিয়েছেন, দাফন-কাফনের টাকা নেই। আমরা যেন হেল্প করি। যে যা পারি দিলাম। এভাবে তিনি তার বিভিন্ন কলিগদের কাছে যেয়ে যেয়ে টাকা তুলছেন।

তিনি একজন ধনীর দুলালী— সব সঙ্কোচ ভুলে হাত পাতছেন, এমনকি জুনিয়রদের কাছেও! এটা কোনো বিচ্ছিন্ন কিংবা অস্বাভাবিক ঘটনা না। উজবুক টাইপ নিউজ পোর্টালের নিউজ পড়ে গলাবাজি না করে একটু হসপিটালে ঘুরুন— এরকম আরও অনেক কিছুই দেখতে পাবার কথা। আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব প্রায়ই এ ধরনের কাজ করেন।

৩। অনেকটা দু:খের সাথেই বলতে হয়, বাচ্চা প্রসবকালীন সময়ে যে প্রসূতির রক্ত লাগা খুবই স্বাভাবিক এবং এজন্য আগে থেকে রক্তদাতা ম্যানেজ করা উচিত— বেশিরভাগই হয়তো জানেন না, জানলেও হয়তো মানেন না। সে যাহোক, ওটির টেবিলে যখন পেশেন্টের রক্ত প্রয়োজন হয়, রোগীর লোকদের বলা হয়, রক্ত খুঁজে পান না তারা।

সাধারণত রক্তের গ্রুপ মেলে না, রক্তের গ্রুপ মিললে তারা নাকি খুবই দুর্বল, স্বাস্থ্য ভালো না, ভয় পান ইত্যাদি— বাধ্য হয়ে ডাক্তাররাই খোঁজ করেন রক্তের। কখনও সহকর্মীদের, কখনও জুনিয়রদের ফোন করে ব্যবস্থা করেন রক্তের। কখনও নিজে ডিউটিতে থাকা অবস্থাতেই ডাক্তাররা রক্ত দেন অহরহ। খুব কম ডাক্তারই বোধহয় আছেন যারা এরকমভাবে রক্ত ম্যানেজ করে দেন না পেশেন্টদের।

৪। ডাক্তার সাহেবকে একটা ওষুধ কোম্পানি এসে কিছু স্যাম্পল দিয়ে গেলেন। তিনি গ্রহণ করলেন। একটু পর নার্সকে ডেকে বললেন অমুক বেডে ওষুধগুলো দিয়ে আসুন— গরীব মানুষ ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। প্রাপ্ত বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ অনেক ডাক্তারই দিয়ে দেন অসহায় রোগীদের। আমাদের কতো বন্ধুরা স্যাম্পল চেয়ে নিয়ে যান, টাকা নিয়ে যান অসহায় রোগীদের জন্যে সেসব বলতে যাবার মানে হয় না।

সত্যি কথা। কতো ডাক্তার যে তার প্রেসক্রিপশনে ২৫% ছাড় লিখে দেন তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের অনেক শিক্ষক আছেন যাদের কাছে ১০ জন রোগী এলে ৩-৪ জনকেই ফ্রি দেখতে হয়, কখনও আরও বেশি। কতো চিকিৎসক রোগীর অবস্থা দেখে ভিজিট নেবেন আর কী নিজেই উলটো তাকে টাকা দিয়ে দিয়েছেন ওষুধ আর টেস্ট করাবার জন্যে–সে গল্প কি খুব অজানা?

ডাক্তারদের আরো কিছু লোভের গল্প পরের পর্বের জন্য তোলা রইলো।