ঢালাও ভাবে ডাক্তারের লোভী বলার পুর্বে একজন ডাক্তারের কিছু কথা শোনার সময় হবে কি? (শেষ পর্ব)


ডাক্তার

ডাঃ মারুফ রায়হান খান, সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক।

চলুন আজ ডাক্তারদের আরো কিছু লোভী গল্প বলি আপনাদের।

৫। প্রসববেদনা উঠেছে রাত ১০টায়। লেবার রুমে আনা হয়েছে যে কোনো সময় ডেলিভারি হবে। পৌনে ৪টার দিকে ডেলিভারি হলো। পুরো সময়টাতে দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি বাচ্চার অপেক্ষায়, মাঝে মাঝে পাশে একটু টুলে বসেন, অযথা বসে থাকেন না গ্লাভস খুলে বইয়ের পাতায় চোখ বুলান। সামনে ‘সিম্পল এমবিবিএস’—এর অপমানজনক তকমা এড়াতে পোস্টগ্রাজুয়েশান নামক সোনার হরিণের পেছনে দৌঁড়াবেন তিনি।

৬। অন্যদের কথা বাদ দিই। আমার বন্ধুদের কথায় আসি। তখন থার্ড ইয়ারে নতুন নতুন সার্জারি ওয়ার্ড করা শুরু করেছি। স্যার একটা পেশেন্ট দেখাতে নিয়ে গেলেন— তার ফিকাল ফিস্টুলা ডেভেলপ করেছে। রোগী স্যারের হাত বড় নির্ভরতার সাথে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন— “সার আমি বালো অমু তো, গরীব মানুষ আমরা সার।” স্যার আশ্বাস দিয়ে এলেন ঠিকই, পরে আমাদের ডেকে শোনালেন হৃদয়বিদারক কথাটা। সম্ভাবনা খুব একটা ভালো না।

রোগীটির যে জটিলতা— তাতে তাকে মুখে খাবার দেয়া যাবে না। শিরার(Vein) মধ্য দিয়ে পর্যাপ্ত পানি, ইলেক্ট্রোলাইটস, খুব প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো তরলাকারে সরবরাহ করতে হবে। চার সপ্তাহ যদি তাকে এভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায় তাহলেই তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা । প্রচুর খরচ এতে, অনেক বেশিই বলা চলে। যদি দিতে না পারা যায়, তাহলে এ পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।

২য় বারেও মেয়ে সন্তান হওয়ায় উনাকে ফেলে নাকি চলে গিয়েছে তার পাষণ্ড স্বামী, বাবাও জীবিত নেই। স্যার বললেন, দেখ তোমরা কিছু করতে পারো কিনা। এর আগের দিনই আমাদের কলেজে পিঠা উৎসব ছিল। যে টাকা প্রফিট হয়েছিল, সেটা দিয়ে আমরা একটা পার্টি দেব ভেবে রেখেছিলাম। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো— যা টাকা সবাই মিলে ইনভেস্ট করেছিলাম এবং যা লাভ হয়েছে সব দিয়ে দেব উনার ট্রিটমেন্টের জন্য। শুধু তা না, এর পরদিন থেকে সব ক্লাসমেটরা যে যেভাবে যেখান থেকে পেরেছে টাকা জোগাড় করে একসাথে জমা করেছে।

আমাদের টিচাররা ওষুধ কোম্পানির সাথে কথা বলে কমদামে ওষুধের ব্যবস্থা করেছে। এভাবে প্রায় ৩ মাস ধরে চললো তার ব্যয়বহুল চিকিৎসা। অপারেশান হলো। কোনো টাকাই তার কাছে ছিল না। রিলিজের দিন সবাই মিলে গেলাম হসপিটাল ডিরেক্টরের কাছে। অনেক কম টাকা ব্যয়ে তাকে রিলিজ করা হোল। এতো টাকা উঠেছিল যে, পুরো চিকিৎসার পরেও আমাদের কাছে আরও টাকা থেকে গিয়েছিল।

যাবার সময় সে টাকাটা আমরা দিয়ে দিলাম যাতে কিছু করে খেতে পারে। ছাগল কিনে পালা শুরু করলো। তা দিয়ে সংসার চলে না। আবার অভিযোগ তাদের। একটা অর্গানাইজেশানের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করা হলো সেলাই মেশিন। তার মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো মোহাম্মদপুরের একটা ভালো মাদ্রাসায়।

একটা সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন একজন স্যার ফ্রি দেখে নিজের কাছে থাকা ওষুধ দিয়ে দিলেন। সেদিনের কথা ভোলা সম্ভব না—আমাদের এ উদ্যোগটা দেখে এক স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন, মানিব্যাগ থেকে একটা বড় নোট বের করে দিয়ে বলেছিলেন, এ স্পিরিটটা ধরে রাখিস সবসময়। স্যারকে আমার একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে এখন— সে স্পিরিট ধরে রাখা এই বর্বর সময়েও কি ধরে রাখা সম্ভব।

৭। আমাদের স্যার-ম্যাডামরা আমাদেরকে শেখান রোগীদের বাবা-মা বলে সম্বোধন করতে— চাচা,মামা, খালা না। রোগীদের উপর যখন পরীক্ষা দিতে হয়, তখন রোগী যদি একটুও ব্যথা পায় কিংবা অন্য কোনোভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে— তাহলে সে ছাত্রের আর পাশ করা লাগবে না। এভাবেই ট্রেইনড হয় প্রতিটি ছাত্র।

৮। যক্ষ্ণার রোগীর ডিসচার্জ পেপারে Rifampicin যখন লেখা হোল পাশে লিখে দেয়া “এই ঐষধখানা খাওয়ার পর হলুদাভ কমলা রঙ্গের মূত্র নির্গত হইতে পারে” হোল এই টাইপের একটা বাণী। কয়েকদিন পর আবার রোগীকে ভর্তি করা হোল— রোগীর নাকি জণ্ডিস হয়েছে!

একজন রোগীকে বলা হললো তার অপারেশানের জন্য মুখে কোনো খাবার দেয়া যাবে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পানি খাওয়া যাবে? ভাইয়া বললেন, না। তার পরের প্রশ্ন, “টাইগার খাওয়া যাবে কি?” “আমি এমপি সাহেবের চামচা, অমুক কমিশনারের একমাত্র ছাত্তিবাহক আমি, আমার কাম আগে কইরা দেন, তাত্তাড়ি কইরা দেন”

—এসব চোখরাঙানি দেখার পর কোনো ডাক্তারের মন-মেজাজ যদি একটু খারাপ হয়ে যায় এত ব্যস্ততা ও কাজের চাপের মধ্যে তাহলে সেটা কি অতি অস্বাভাবিক। ডাক্তারের জুতোটা আপনি নিজের পায়ে না পড়লে কখনোই তাদের সাইকোলজিটা ধরতে পারবেন না।

তা আপনি যত বড় সাংবাদিকই হোন আর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হোন আর ঢাকা বোর্ডের বাংলা বিষয়ের প্রশ্নকর্তা হোন। (নিজেদের ভালো কথা আমরা নিজেরা বলতে চাই না। কোনো মিডিয়া আমাদের দু’একটা ভালো কথা লিখতে চাইছে না, ছড়িয়ে দিচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষের বিষবাষ্প। জনতা ভুল বুঝছে। তাদের এখন জানার অধিকার আছে আমাদের ভেতরের কথাগুলো।)

আগের পর্ব পড়তে চাইলেঃ http://www.somoyerkonthosor.com/2017/02/05/93939.htm

◷ ৮:৫০ অপরাহ্ন ৷ বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০১৭ মুক্তমত