এক স্ত্রীকে নিয়ে দুই স্বামীর টানাহেঁচড়া: মামলা-পাল্টা মামলা, ঘোষণা করেছেন যুদ্ধ !


সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক– ঢাকাই ফিল্মকেও হার মানায় তাদের কাহিনী। এক স্ত্রীকে নিয়ে দুই স্বামীর টানাহেঁচড়া, এ ধরনের কাহিনী সেলুলয়েডের ফিতাতেই মানায়। বাস্তবে শিক্ষিত-ভদ্র মহলে প্রকাশ্যে এ ধরনের ঘটনা খুব একটা ঘটে না। যতই দিন যাচ্ছে ঘটনা ডালপালা মেলছে। একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা-পাল্টা মামলা করে চলছেন। ঘোষণা করেছেন যুদ্ধ। আদালতের আপসের পরামর্শও আমলে নিচ্ছেন না কেউই। এ নিয়ে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি চলছে বিচারবিভাগীয় তদন্তও। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদবে বলা হয়, তাঁরা তিনজনই সমাজের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। পেশাগত ডিগ্রি, খ্যাতি, সম্মান কোনো কিছুতেই যেন কমতি নেই তাদের। তথাপিও লাগামহীন তারা। নেই মান-সম্মানের তোয়াক্কা। লজ্জার মাথা খেয়ে কয়েক বছর ধরে তারা লড়ে চলছেন একে অপরের বিরুদ্ধে। তাদের কাণ্ড বিব্রত করেছে আইনজীবীদেরও। রসময় আলোচনার জন্ম দিয়েছে আদালতপাড়ায়। তাদের দেখতে অনেক উৎসুক আদালতে ভিড় জমান।

a116020160928145932ডা: সহেলী আহমেদ সুইটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপিকা। তার দুই স্বামী মিটফোর্ড হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা: মো: মাসুদ ইকবাল এবং উত্তরা নিবাসী ডা: কাজী মিনহাজুল আবেদীন। এ দুই চিকিৎসকের সাথে সহেলীর দুইবার বিবাহ বিচ্ছেদ ও তিনবার বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে এ নিয়ে আদালতে চলছে প্রতারণা, বিয়ের শর্তভঙ্গ, তথ্য গোপন, শ্লীলতাহানিসহ একাধিক মামলা। উল্লেখ্য, ডা: সহেলীর দু’টি সন্তানও রয়েছে।

জানা গেছে, ডা: সহেলী নিজের পছন্দেই ডা: মিনহাজকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে দু’টি সন্তানও হয়। এরই মধ্যে সহেলীর সাথে ডা: মাসুদের সখ্য হয়। সখ্য দিন দিন বাড়তে থাকলে সহেলী-মিনহাজ পরিবারে দাম্পত্য কলহ দানা বাঁধে। অবশেষে বিস্ফোরণ ও পরিণতিতে বিচ্ছেদ। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং মগবাজার কাজী অফিসে তাদের তালাকনামা রেজিস্ট্রি হয়।

এর পর থেকেই সহেলী মাসুদের সাথে বসবাস শুরু করেন। ক’দিন পরেই সহেলী উচ্চ শিক্ষার্থে কানাডা গমন করেন। সহেলীর আমন্ত্রণে মাসুদও সেখানে যান। সেখানকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন অব টরন্টোতে সিভিল ম্যানেজার বিভাগে বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন। বিয়ের পর মাসুদ দেশে ফিরে আসেন। এর কয়েক মাস পর সহেলীও দেশে ফেরেন। তাদের দাম্পত্ব জীবন মোটামুটি চলছিল। কিন্তু এরই মধ্যে পুনরায় সহেলী-মিনহাজের সখ্য গড়ে ওঠে।

দু’জনের মধ্যে গোপনে বোঝাপড়া ও মেলামেশা চলতে থাকে। হঠাৎ করেই ৯ মার্চ ২০১৫ ইং তারা বিয়ে করে ফেলেন। এ ক্ষেত্রে সহেলী মাসুদের অনুমতি নেয়া বা তার কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী তালাক নেয়ার তোয়াক্কাও করেননি। মিনহাজের সাথে পুনরায় বিয়ের কাবিননামায় সহেলী নিজেকে তালাকপ্রাপ্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে মাসুদ সহেলী ও মিনহাজের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ৪ জানুয়ারি ২০১৬ ইং দায়ের করা মামলায় স্বামী থাকা অবস্থায় তথ্য গোপন রেখে অন্য পুরুষকে বিয়ে করায় ফৌজদারী দণ্ডবিধির ৪৯৮/১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ফুসলিয়ে বিয়ে করার অভিযোগে মিনহাজকেও এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

এদিকে মিনহাজ ও মাসুদ দুইজনই নিজেকে সহেলীর স্বামী বলে দাবি করায় আদালত ঘটনাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দিলে তারা সহেলীকে অভিযুক্ত বলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এ ব্যাপারে আদালতে সহেলী দাবি করেন, ‘কে বা কারা তার স্বাক্ষর জাল করে মিনহাজকে তালাক প্রদানের একটি আবেদন ঢাকা সিটি করপোরেশনে জমা দিয়েছে এবং তিনি তালাক প্রত্যাহার করেছেন।’ এই তালাকের সাথে তার সম্পর্ক নেই। কিন্তু পিবিআই তদন্ত করে সহেলীর এ দাবির সত্যতা পায়নি।

দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সালিসি পরিষদ গত ১৬ এপ্রিল ২০১৩ ইং মিনহাজকে প্রদানকৃত তালাক কার্যকর করার জন্য সহেলীকে অনুরোধ করেছে। পিবিআই সহেলী কর্তৃক মিনহাজুলকে দেয়া তালাকের ফটোকপি, সিটি করপোরেশন কর্তৃক তালাক প্রত্যাহারের রায়ের কপি, তালাক কার্যকর করার জন্য সিটি করপোরেশনের সালিসি পরিষদের আদেশ ও মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দী নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সহেলীর স্বামী জীবিত থাকা অস্থায় তাকে তালাক না দিয়ে পুনরায় মিনহাজকে বিয়ে করায় তার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৮৯৮ ধারায় এবং সহেলীকে প্ররোচনা দিয়ে বিয়ে করায় মিনহাজকে পেনাল কোডের ৪৮৪ ও ১০৯ ধারায় অপরাধ করেছে মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।

এ দিকে সহেলী তার বিরুদ্ধে দায়ের মামলায় উচ্চ আদালতে কোয়াশমেন্ট আবেদন করবেন বলে আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করেন। এতে আদালত তাকে সময় দেন। এ ছাড়া গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর সহেলী আদালতে মাসুদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়, খিলক্ষেত কাঁচাবাজারে মাসুদ তাকে কুরুচিপূর্ণ কথা বলে এবং প্রকাশ্যে তার শ্লীতহানি করে। তবে তদন্ত সংস্থা এ অভিযোগটি মিথ্যা বলে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেয়। গত ১৬ জানুয়ারি ওই চূড়ান্ত রিপোর্টটি গ্রহণের জন্য ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এ দিন ধার্য ছিল। সে দিনই সহেলী আদালতে নারাজি দরখাস্ত দেন। আদালত ওই আবেদনটি গ্রহণ করে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।

অন্য দিকে মাসুদ ও সহেলী একে অপরের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করে চললে আদালত তাদের আপস মীমাংসার পরামর্শ দেন। উভয় পক্ষ এই মর্মে পাঁচটি আপসনামাও স্বাক্ষর করেন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে আজও মীমাংসা হয়নি।

ডা: মাসুদের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা এ নিয়ে আদালতে মামলা করেছিলাম। পুলিশও প্রতিবেদনে বলেছে ডা: সহেলী স্বামী থাকা অবস্থায় আবার বিবাহ করেছেন। এটা ফৌজদারি অপরাধ। ঢাকা মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু বলেন, দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার পরও এহেন আচরণ লজ্জাজনক। এ নিয়ে আইনজীবীরাও বিব্রত।

◷ ১১:১৫ পূর্বাহ্ন ৷ বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৭ আলোচিত