চাঞ্চল্যকর মিতু হত্যাকান্ডে নতুন মোড় : তীব্র সন্দেহ শ্বশুরের, মিলেছে বাবুল-বর্ণির ফোনালাপের রেকর্ড!

১২:০৫ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৯, ২০১৭ Breaking News, Uncategorized, আলোচিত বাংলাদেশ, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর – সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডে নতুন মোড় নিয়েছে।

মিতু খুন হওয়ার পর থেকে এতদিন জামাতা বাবুল আক্তারের পক্ষেই বলে আসছিলেন তারই শ্বশুর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। গতকাল মোশাররফ হোসেনের কণ্ঠেই শোনা গেছে মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারকে সন্দেহ করার মতো তথ্য। আকস্মিক জামাতা বাবুল আক্তারকে নিয়ে সন্দেহ কেন সৃষ্টি হল জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন জানান, সাম্প্রতিক কিছু আচরণ এবং বাবুল আক্তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য গণমাধ্যমে আসায় এই সন্দেহের সৃষ্টি।

সূত্রে জানা যায়, বাবুল আক্তার ও নিহত এসআই আকরাম হোসেনের স্ত্রী বনানী বিনতে বশির বর্ণির ফোনালাপের কিছু তথ্য ইতোমধ্যে মোশাররফ হোসেনের হাতে এসেছে। এতে তার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাবুল আক্তারের শ্বশুর বলেছেন, নিহত এসআই আকরাম হোসেনের বোন তার কাছে ফোনালাপের কিছু রেকর্ড দিয়েছেন। তবে এই রেকর্ড কার এ বিষয়টি স্পষ্ট করেননি তিনি।

ওদিকে বাবুল আক্তারের সঙ্গে পুলিশের নিহত এসআই আকরাম হোসেনের স্ত্রী বনানী বিনতে বশির বর্ণির পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এর জের ধরেই বাবুল আক্তার তার স্ত্রীকে হত্যা করেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। অবশ্য মঙ্গলবার এবং গতকাল বুধবার মাগুরা প্রেসক্লাবে বর্ণি বাবুল আক্তারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয় নিয়েও গতরাতে প্রশ্ন তুলে বাবুল আক্তারের শ্বশুর পুলিশি তদন্তের দাবি করেছেন।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ বলেছেন, ‘বাবুলের মায়ের পরিবারে খুনের ইতিহাস আছে। এখন যেসব শুনছি তার কিছুটাও যদি সত্য হয়, তাহলে তো বুঝব, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাবুল আমার বাসায় থেকে অভিনয় করেছে। আসলে তখন তো আপনারা তাকে প্রশ্ন করতে পারেননি। আমিই আপনাদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। এটা তার এক ধরনের কৌশল ছিল।’

গত বছর ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম শহরে প্রকাশ্যে খুন হন বাবুলের স্ত্রী মিতু। তার কিছুদিন আগে এসপি পদে পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্ব ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন বাবুল।

প্রথমে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য জঙ্গিদের সন্দেহ করা হলেও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্তের কথা জানায় পুলিশ। কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরবাড়ি থেকে তুলে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে এনে বাবুলকে ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর নানা গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু বলা না হলেও কয়েক মাস পর বাবুলের পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

mitu-babul-borni

গত ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন মিতুর বাবা মোশাররফ ও মা সাহেদা মোশাররফ নীলা। দুই সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন বাবুল। তখন সাংবাদিকরা গেলে তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেনই কথা বলতেন, বাবুলের পক্ষেই ছিল তাদের অবস্থান।

মেয়ের মৃত্যুর জন্য এখন জামাতা সন্দেহে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ বলেন, ‘আমাদের মতামত ছাড়াই বাবুল আমার নাতিদের নিয়ে বাসা ছেড়ে চলে গেছে। কোনো ধরনের যোগাযোগ করে না। আদ-দ্বীন হাসপাতালের মালিক বাবুলকে চাকরি দিয়েছেন। তিনিও বলেছিলেন, বাবুল যেন অন্তত দুই বছর এখানে থাকে। সে চাকরি পেয়ে ওই কথাও শোনেনি।’

‘এখন যেহেতু বাবুল চলে গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডাকার পর চট্টগ্রামে যাই। মামলার বাদী হয়েও বাবুল সেখানে যায়নি। অথচ বাদীর দায়িত্ব সাক্ষীকে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সেখানে বলেছি, মাহমুদাকে হত্যার মোটিভটা আমরা জানতে চাই।’

‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বাবুল কেন চাকরি ছেড়ে দিল? আপনারা কী মনে করছেন। ওই তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, আপনি তাকেই প্রশ্ন করুন। তিনি খুব ভালোভাবে জানেন কেন বাবুল চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন’ বলেন মোশাররফ।

বনানী বিনতে বশির বর্ণি নামের যে নারীর সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে, তার স্বামী পুলিশের এসআই আকরাম হোসেন লিটনের মৃত্যুর তদন্তও চেয়েছেন মোশাররফ। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে একটি পত্রিকায় পরকীয়ার একটি সংবাদ হয়েছিল। ২০১৫ সালে ওই এসআই মারা যান। তার বোন জান্নাত আরা রিনী তার পরিবারসহ আমার বাড্ডার বাসায় এসেছিল। তখন তারা বাবুলের সঙ্গে তার ভাইয়ের স্ত্রী বনানী বিনতে বশির বর্ণির এখন যা শুনছি, এমন অভিযোগ বাবুলের বিরুদ্ধে ছিল। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা মাহমুদাকে অত্যাচার করত। ঘটনার ১৫ দিন আগেও বাবুল আক্তারের বাসায় একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।

এখন তো ঢাকায়, নোয়াখালী, বিদেশেও তার পরকীয়ার কথা শুনি। আগে এসব শুনেও পাত্তা দিইনি। মিতুও কোনো অভিযোগ করত না। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা আকরাম। বাবুলের পাশের জেলা ঝিনাইদহের ছেলে আকরামকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করে। তবে ওই সময় পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের হস্তক্ষেপে ওই ঘটনার তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায় বলে অভিযোগ আকরামের বোনের। বাবুলের বাবাও একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক।

আকরামের স্ত্রী বর্ণির সঙ্গে বাবুলের সম্পর্কের জেরেই তার ভাই খুন হয়েছেন বলে দাবি জান্নাত আরা রিনীর। এখন বাবুলের শ্বশুর মোশাররফ হোসেনও তার মৃত্যুর তদন্ত চাইছেন। তিনি বলেন, তারা (আকরামের স্বজন) সব বলেছে, আমরা বলেছি তোমাদের ঘটনার তদন্ত হোক; আমাদেরটাও হোক। দুটো ঘটনা তো মিলেও যেতে পারে। অনেক ঘটনাই তো বেরিয়ে আসছে। এতদিন পরে বাবুলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কেন আসছে, তারও একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন মোশাররফ। আমি তো বাবুলের বিষয়ে সব সময় আগে পজিটিভ বলেছি। তাই আগে তারা কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

জান্নাত আরা রিনী বলেন, তার ভাই আকরাম ২০০১ সালে পুলিশের উপ-পরিদর্শক পদে যোগ দেন। পরের বছর তার একটি মেয়ে হয়। তখন বাবুল আক্তারের এক আইনজীবী ভাই ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বোন তাদের দেখতে আসেন। তাদের আচরণে সন্দেহ হলে ভাই লিটনকে জানাই। লিটন বলেছিল, বাবুল আক্তারের সঙ্গে তার স্ত্রী বর্ণির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এজন্য দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক সুসম্পর্ক আছে। ওই দিনই বাবুল আক্তারের সঙ্গে বর্ণির সম্পর্কের বিষয়টি প্রথম জানতে পারি।