গাজীপুরে মর্ডাণ মেলায় চলছে জুয়া ও অশ্লীলতা : নির্বিকার প্রশাসন


❏ শনিবার, ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৭ ঢাকা, দেশের খবর

রেজাউল সরকার (আঁধার), গাজীপুর প্রতিনিধি: মেলা আমাদের প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ন জায়গা জুড়ে রয়েছে। গ্রাম বাংলার এই বিশুদ্ধ ঐতিহ্য মেলার নাম শুনেই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে নির্মল আনন্দ। এলাকা জুড়ে উৎসব-আতিথেওতা পূর্ণ এক সুখময় স্মৃতি। তবে সে মেলা গুলো ছিল নির্দিষ্ট কোন উপলক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। বর্তমানে শুরু হয়েছে মর্ডার্ণ মেলার নামে হাউজি, জুয়া ও অশ্লীলতা।

juya

বছর জুড়েই জেলার বিভিন্ন স্থানে চলছে এই মেলা। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের মেনেজ করে চলতে থাকা এ সকল মেলা এলাকার জনসাধারনের জন্য ভীতিকর ও পীরাদায়ক। রাতভর নারীদের নগ্ন নৃত্য, মাদক সেবন, হাউজি, ওয়ান টেন সহ নানা ধরনের জুয়া, আসামাজিক ও অশ্লীল কার্মকান্ড চলে এসব মেলায়।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেড়াইদেরচালা এলাকায় বিশাল সামিয়ানা টানিয়ে প্রায় বছর ব্যাপী চলছে এক মর্ডাণ মেলা।

এছাড়া সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাক ও হাতাপাড়ায় প্রায়ই মেলা বসে। এ সকল অসামাজিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বেপরোয়া মেলা কার্তৃপক্ষের হাতে ইতি পূর্বে ৪ সাংবাদিক আহত হলেও এখনো চলছে মেলা। এ বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করলে মেলা উচ্ছেদ করবেন বলে জানান।

শ্রীপুরের বেড়াইদেরচালা এলাকা ঘুরে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মেলার নামে সারাদিন শ্রীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রকাশ্যে মাইকিং করে চলছে লটারী বিক্রি। কোমলমতি শিক্ষার্থী, কিশোর, তরুণ ও যুবকরা যাচ্ছেন মেলা নামক ওইসব আসরে। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন তাদের অমুল্য সম্পদ সন্তান বখে যাবে এই ভেবে। কয়েকদিন আগে শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। দীর্ঘদিন যাবৎ মেলা চলার কারনে শিক্ষকদের দাবী পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। এসব কর্মকান্ডে জিম্মি হয়ে পড়েছে শ্রীপুরের বেড়াইদেরচালা এলাকার জনগণ। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ধর্না দিয়েও এর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। অসহায় এলাকাবাসি নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করছেন। মেলার নামে অশ্লীলতা বন্ধে মহামান্য হাইকোর্ট, প্রধানমন্ত্রী, সচিব, পুলিশের আইজিপিসহ সকলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা চেয়েছেন তারা।

মেলার নামে নানা অপকর্ম, অনৈতিক, অশ্লীল, অবৈধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করলে পুলিশে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, জঙ্গী সদস্য হিসেবে আটক করে নেয়াসহ নানা হুমকি দেয়া হচ্ছে আয়োজকদের পক্ষ থেকে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতেও ভয় পাচ্ছে।

শিল্পাঞ্চল বেড়াইদেরচালা এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে হাজার হাজার টাকার পণ্য কিনে আত্মসাত করে অনেক ভাড়াটিয়া স্বপরিবারে বাড়ি ছেড়েছে। স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী আলিমুদ্দীন বলেন, তারা মিয়া নামে এক পোষাক শ্রমিক তার বাড়িতে স্বপরিবারে ভাড়া থাকতো। তার বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মইচ্চার চড়। প্রতি রাতে মেলায় গিয়ে জুয়া আর লটারী খেলে নি:স্ব হয়েছে। পরে চার হাজার টাকা বকেয়া রেখে সে স্বপরিবারে পালিয়েছে। স্থানীয় মান্নারচালা গ্রামের নাজিমুদ্দিনের মেয়ের জামাই বাবুল জুয়ার আসর আর লটারী খেলে সব টাকা পয়সা নষ্ট করেছে। আলীমুদ্দিনের দোকান থেকে ৬ হাজার টাকার বকেয়া পণ্য নিয়ে সে এখন উধাও।

বেড়াইদেরচালা গ্রামের আলহাজ্ব করম আলী (৮০) বলেন, গত এক বছরের অধিকাংশ সময় মেলার নামে নানা ধরণের অবৈধ কর্মকান্ড চলছে। ১৫ দিন বিরতির পর গত তিন সপ্তাহ যাবত আবার শুরু হয়েছে। এ এলাকায় অসুস্থ বৃদ্ধ, নারী ও শিশু রয়েছে যারা শব্দের জন্য রাতে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমাতে পারেন না। সাধারণ মানুষ এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তিনি জানান, আয়োজকেরা নাকি টাকার বিনিময়ে দুই মাস মেলা চালানোর মৌখিক অনুমতি নিয়ে এসেছেন। আর সেখানে মেলার নামে যা চলছে তা কোনো বৈধ কাজ নয়।

চন্নপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বলেন, বেড়াইদেরচালা ও আশপাশের এলাকায় বাড়ির উঠোন বা বারান্দায় কোনো জিনিস রাখা যায় না। প্রায় প্রতি রাতেই কারও না কারও বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতি রাতে মেলার আশপাশের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারীরা বিভিন্ন জেলার খেটে খাওয়া দিনমজুর ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। ভয়ে মুখ বুজে সহ্যও করছেন।

আইনশৃঙ্খলা অবনতিতেও মেলার প্রভাব পড়েছে। স্থনীয় দিনমজুর রিয়াজ উদ্দিন জানান, গত দেড় মাস আগে বয়রারচালা গ্রামের ফিরোজ মিয়ার ২টি, বাচ্চু মিয়ার ১টি, ও আলম মাস্টারের ২টি গরু চুরি হয়েছে। চন্নপাড়া খন্না বাড়ী থেকে তিনটি গরু জবাই করে গোশত নিয়ে গেছে চোরের দল।

বেড়াইদেরচালা গ্রামের হাজী আসাদুল্লাহ বলেন, বছর ব্যাপী মেলার কারণে অন্যদের মতো আমার সন্তানদেরও লেখাপড়া বিঘিন্ত হচ্ছিল। তাই তাদের উত্তরার একটি স্কুলে ভর্তি করেছি। মেলা নামক এসব কর্মকান্ড চলতে থাকলে এলাকার পরিবেশ নষ্ট করতে আর কিছুই লাগবে না।

বেড়াইদেরচালা বাজারের মৌসুমী ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, মহামান্য হাইকোর্ট, প্রধানমন্ত্রী, সচিব, আইজিপি ছাড়া কেউ মেলার নামে অশ্লীলতা বন্ধ করতে পারবে না।

স্থানীয়রা জানান, রাতে শত শত প্রাইভেটকার থাকে মেলা প্রাঙ্গণে। এসব গাড়ীতে জুয়াড়ীরা যাতায়াত করে। মেলার আয়োজকেরা গাড়ীর ভাড়া বহন করেন।

মেলার এসকল অশ্লীল ও অসমাজিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলার অনেক সংবাদিক একাধিকবার লাঞ্ছিত ও আহত হয়েছেন। গত জুন মাসে সদর উপজেলার হোতপাড়া এলাকায় মেলার অশ্লীলতা, জুয়া ও অসামাজিক কর্মকান্ডের প্রতিবেদন করতে গিয়ে ৭১ টেলিভিশন, আর টিভি , মোহনা টিভি ও জি টিভির গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মেলা পরিচালনাকারীদের হামলার শিকার হয়ে গুরুত্বর আহত হন।

গাজীটিভি’র গাজীপুর প্রতিনিধি আল মামুন বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরও মেলা চলমান তাই এ বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে মেলা কারিরা আমাদের উপর চড়াও হয়। আমিসহ আমার আরো চার সহকর্মী আহত হয়। তারপরও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে মেলার নামে অসামাজিক কর্মকান্ড চলছে।

একই ঘটনায় আহত অপর সাংবাদিক মোহনা টিভি’র গাজীপুর প্রতিনিধি আতিক জানান, মেলা পরিচালনাকারীদের খুঁটির জোর বেশী তাই আমরা নিউজ করেও কোন ফল হয়না।

শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছুর রহমান নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বলেন মেলা বন্ধ করে দেয়া বা এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা নেয়া এখন আমার আয়ত্বের বাইরে। কারা কোথা থেকে অনুমতি নিয়ে মেলার নামে অশ্লীলতা করছে জানি না।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, কোনো রকম মেলার অনুমতি সেখানে নেই। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একাধিকবার ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মেলার নামে সকল আয়োজন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরও কীভাবে চলছে তা আমার জানা নেই। প্রয়োজনে আমাদের বিরুদ্ধেও নিউজ করেন আমরা পারছিনা এই মেলা বন্ধ করতে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রায়হানুল ইমলামের কাছে মোবাইলে বিষয়টি চাইলে তিনি সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, আমরা এ বিষয়ে একাধিকবার ভ্রাম্যামন আদালত চালিয়েছি। মেলা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছি। আবারো ভেঙ্গে দিব।