🕓 সংবাদ শিরোনাম

সাংবাদিক রোজিনাকে হয়রানি ও হেনস্থার প্রতিবাদে রাঙামাটি প্রেসক্লাবের মানববন্ধনসাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নির্যাতনের প্রতিবাদে টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের মানববন্ধনঝালকাঠিতে জমি নিয়ে বিরোধে কৃষককে কুপিয়ে হত্যা,আটক-২মাত্র ২০ ঘন্টায় ১০ লক্ষ দর্শক পেল“ তাকে ভালোবাসা বলে” নাটকটিবিয়ের কথা বলে প্রেমিকাকে তুলে নিয়ে রাতভর ধর্ষণভারতে করোনায় একদিনে মারা গেলেন ৫০ চিকিৎসকদেশে বিশেষ অভিযান চালাবে ইন্টারপোলসাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নেওয়া হলো আদালতেতুমুল সমালোচনার মুখে ‘জেরুজালেম প্রেয়ার টিম’পেজ সরিয়ে নিল ফেসবুক কর্তৃপক্ষইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছে বিশ্বের ২৫টির মতো দেশ!

  • আজ মঙ্গলবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ ৷ ১৮ মে, ২০২১ ৷

সৌদির যৌনদাসত্বের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নবীগঞ্জের যুবতীকে দেশে আনা হচ্ছে


❏ শনিবার, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০১৭ দেশের খবর, সিলেট

মতিউর রহমান মুন্না, নবীগঞ্জ প্রতিনিধি: সৌদি আরবে যৌনদাসত্বের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার হওয়া নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামের নির্যাতিতা যুবতী কল্পনাকে দুয়েক দিনের মধ্যে দেশে আনা হচ্ছে।

hobiganj

বতর্মানে মেয়েটি সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তায় রয়েছে। নারী পাচারের বিভিন্ন তথ্য উদঘাটনের জন্য গ্রেফতারকৃত দালালদের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক সুমন মালাকার সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, আজ অথবা আগামীকালের মধ্যে নবীগঞ্জের মেয়ে কল্পনাকে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এছাড়া নারী পাচারের বিভিন্ন তথ্য উদঘাটনের জন্য গ্রেফতারকৃতদের আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। তিনি আরো জানান, অন্যান্য আসামী ও দালালদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান চলছে।

উল্লেখ্য, নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামের এবাদ আলীর কন্যা কল্পনা দারিদ্র্যতা থেকে মুক্তি পেতে দালালের খপ্পরে পড়ে গত ৬ ডিসেম্বর গৃহকর্মীর চাকুরী নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যায়। এরপর তার উপর শুরু হয় শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানকার দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে তিন/চার দিনের জন্য একেকজন আরব নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। তখন শুরু হয় তার উপর পাশবিক নির্যাতন। বিষয়টি টেলিফোনে মা-বাবাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানায় মেয়েটি। পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ নেতাদের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দেয় সে।

মেয়েটির দরিদ্র মা-বাবা নেতাদের কাছে টেলিফোনের কর্তাবার্তার আধা ঘন্টার রেকর্ড নিয়ে দৌঁড়ালে তারা তাদেরকে ম্যান পাওয়ারের মামলা দিতে বলেন। এ ব্যাপারে মামলা দিলে দালাল চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং সৌদি আরবে মেয়েটির কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে যায়। পরে কোন উপায় না পেয়ে মেয়েটির মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজন ছুটে যান হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর কাছে।

বুধবার দুপুরে এমপি কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় সিআইডি পুলিশ ঢাকা নয়া পল্টনের এলাকার গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ ট্রাভেল এজেন্সী থেকে দালাল চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করে। আটককৃতরা হলো গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ এর জেনারেল ম্যানেজার মোঃ শাহজানুর রহমান, পরিচালক এরশাদ উল্লাহ ও আবু তাহের।

তাদের মধ্যে আবু তাহের শায়েস্তাগঞ্জের ফরিদপুর গ্রামের রমিজ আলীর ছেলে, শাহজানুর রহমান ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার বাগদানা গ্রামের মৃত সিরাজুর রহমানের ছেলে ও এরশাদ উল্লাহ কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাতালিয়ার মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে।

তাদেরকে আটকের সময় গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টান্যাশনাল লিঃ ট্রাভেল এজেন্সী থেকে চুনারুঘাটের জারুলিয়া গ্রামের আয়েশা আক্তার রেবা নামের কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। ফলে বিদেশে পাচার হওয়া থেকে রক্ষা পায় মেয়েটি।

তাদেরকে গ্রেফতারের পর তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সিআইডি পুলিশ গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। এ সময় সৌদি আরবে এক দালালকেও আটক করা হয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা রাতে গ্রেফতারকৃতদের হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদেরকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। সেই সাথে উদ্ধারকৃত মেয়েটির জবানবন্দি গ্রহণ করেন বিচারক। জবানবন্দি গ্রহণের পর মেয়েটিকে তার বাবা-মার জিম্মায় দেয়া হয়।

উদ্ধারকৃত মেয়েটির বাবা জানান, একই উপজেলার ছনখলা গ্রামের এয়াকুব মিয়া ও শাহজাহান মিয়ার মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে তার মেয়েকে সৌদি আরব পাঠানোর জন্য বায়না করেন। এ হিসেবে দালাল এয়াকুব মিয়াকে তিনি ৩০ হাজার টাকা দেন। মঙ্গলবার রাতে ইয়াকুব মিয়া মেয়েটির মেডিকেল সম্পন্নের জন্য ঢাকায় নিয়ে যায়।

তিনি আরো জানান, মেয়েটির প্রাপ্ত বয়স ১৭ হলেও পাসপোর্টে তার বয়স ২৮ বছর দেখানো হয়। এছাড়া দালালরা তাকে আরেকজনের বিবাহিতা স্ত্রী হিসেবে দেখায়।

এদিকে সৌদি আরবে উদ্ধার হওয়া কায়স্থগ্রামের মেয়েটির মোবাইলে রেকর্ড করা কথা থেকে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারী এক সাথে বন্দী রয়েছে। তাদেরকে কয়েক দিনের জন্য একেক জন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়া হয়। সেখানে তাদের উপার্জিত টাকা দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোন কথা বললে তাকে কিল-ঘুসি-লাথি মেরে আঘাত করা হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে কায়স্থগ্রামের মেয়েটি তার বাবাকে বলে ‘বাবা আমাকে বাঁচাও। যেভাবে পার আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে নেয়ার ব্যবস্থা কর’। মায়ের সাথে কথা বলার সময় সে মাকে বলে- ‘আম্মা, আম্মাগো আমারে বাঁচাও। সেকুল আমারে দালালের কাছে বেঁচে দিয়েছে। দাম্মামে একটি ঘরে আমাদের আটকে রাখা হয়।

এছাড়া একেক দিন একেক বাড়িতে পাঠানো হয়। আম্মা আমারে যদি জীবিত দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমারে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওরা আমাকে মেরে ধরে শেষ করে দিচ্ছে। বেইজ্জত করছে। এখন যে বাড়িতে আছি ওই বাড়ির মহিলারে বলে তোমাদের কাছে ফোন করছি। আর হয়তো ফোন করতে পারবো না। দ্রুত আমাকে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।

কল্পনা বলেন, আম্মাগো ওরা জানোয়ার। এরপর তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন, ‘আব্বা আমাকে বাঁচাইবানি। আব্বা আমারে বাঁচাইলে সেকুলের বাড়ি যাও। ওরে বলো আমারে ফিরাইয়া আনতে। দুই দিনের মধ্যে যদি আমাকে দেশে না নিতে পারো তাহলে আমারে আর খুঁজে পাবে না। সেকুল কণ্ট্রাক করে আমাদের বিদেশ পাঠাইছে। আমাদের বিভিন্ন বাড়িতে পাঠায় আর টাকা নেয় কফিল। আমাকে দেশে না নিলে ফাঁস দিয়ে মরবো। একেক বাড়ি থেকে নিয়ে আমাদের রাখে ওদের অফিসে। ওটা একটা যমঘর। খাওন দেয় না। একটা রুটি ঢিল মারে। ওইটা খাইয়া থাকতে হয়।

তোমরা যদি আমারে দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।’ টানা ৩১ মিনিটের ওই টেলিফোন কথাবার্তায় বেশির ভাগ সময়ই কল্পনা হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। আর তাকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক মানবজমিনসহ দেশের বিভিন্ন গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়। অপর দিকে এ ঘটনার পর থেকে দালাল চক্র এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।