গ্রামের সেই দুরন্ত কিশোরী তুলির নিষিদ্ধপল্লীর যন্ত্রনাময় জীবনে আসার গল্প!

প্রতিকি ছবি
❏ বুধবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৭ আলোচিত, আলোচিত বাংলাদেশ, জানা-অজানা

চোখে কাজল, ঠোটে রং লাগিয়ে তুলি প্রতিদিন সেজে থাকতো  কিশোরী । প্রতিবেশি কাশেম ভাইকে মুগ্ধ করতে এভাবে প্রতিদিন সাজতে ভালো লাগতো ওর। বুকে হাজারটা স্বপ্ন পুষে রেখে তুলি নামের এক কিশোরী চেয়েছিলো জিবনের প্রতিটাদিন প্রিয় মানুষটিকে মুগ্ধ করতে সাজবে সে।

কিন্তু বিধিবাম!  তুলির চোখভরা সব স্বপ্ন মুছে গেছে নির্মম বাস্তবতায়। সময়ের খরস্রোতে খড়কুটো তুলির জীবনে রাত-দিন আসে নিয়ম করেই। প্রতিদিন সাজতেও হয় নানা রঙ্গে ।তবে প্রিয় মানুষ কাশেম ভাইয়ের জন্য নয়! এখন সেই নিত্যদিনের সাজ তার খদ্দেরের জন্য।

এ, এস, এ, মামুন,সময়ের কণ্ঠস্বর,  ঢাকাঃ

সচেতনতা সৃষ্টি ও ভিকটিমাইজড হয়ে এই জীবনে আসা যৌন কর্মীদের আইনি সহায়তার নানা সাপোর্ট নিয়ে একটি এনজিওতে কাজ ছিলো আমার। সেই সুবাদে তুলির সাথে পরিচয়। বরাবরই চুপ-চাপ থাকা তুলির কাছে জানতে চেষ্টা করেছিলাম বেশ ক’বার। প্রতিবারই ‘দির্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হেঁসে এড়িয়ে গিয়েছিলো তুলি। স্পষ্টই সেই এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে যে একটা গভীর কষ্ট লুকিয়ে আছে সেটা বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হতোনা কারোই। তুলির এড়িয়ে যাওয়াটাই আগ্রহ বাড়ায় আমার।  এরপর একদিন তুলিকে বললাম, তোমার জীবনের কথা জেনে, সবাইকে জানাতে চাই। হয়তো তোমার গল্প থেকে কেও সচেতন হতে পারে। অনাগত কোন ভুল থেকে রক্ষা করতে পারে নিজেকে। এবার কিছুটা সহজ হয় তুলি। ধীরে ধীরে বলতে  থাকে তার অন্ধকার জীবনে আসার গল্প।

” তখন আমার বয়স ১৪ বছর। বিশ্বাস করবেন না, কাঁশবাগানের ধার দিয়ে হাটতে কি যে ভাল লাগতো। একবার কাঁশবনের ধার দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম. উঠে দেখি আমার সামনে ‘ও’ দাঁড়ায়ে আছে। বললাম, ও টা কে? মুচকি হেসে বলল, আমি ওকে ভালবাসতাম। ওর নাম কাশেম । আমাদের পাশের গ্রামেই বাড়ি। শুন্য দৃষ্টি ছুড়ে তুলি বলতে থাকে , কত যে ভালবাসতাম ওকে। কাশেমও আমাকে খুব ভালবাসত।

আমার জন্য সে লিপিস্টিক, চুরি, মালা, চুলের ব্যান্ড হাতে তুলে দিল। আমি কি যে খুশী। ঐদিন সারা বিকাল আমরা কাঁশ বাগানের ধারে বসে কত কথা যে বলেছি। ও বলেছিল সামনের মাসে আমাদের বাড়িতে বিবাহের পয়গাম পাঠাবে। এক বুক নিঃস্বাস ছেড়ে তুলি বলল, হায় রে পয়গাম। মনের আশা মনেই রইল। একনাগারে কথা বলে একতু থামে তুলি। দীর্ঘদিন পর মনের কথা প্রকাশ করার পর একটা স্বস্তির ছবি ফুটে উঠে ওর সরল মুখে।

তুলিকে ওর ঠিকানা জিজ্ঞেস করি, উত্তরে বললো, ভাই আমাকে এইকথাটা জিজ্ঞাস করবেন না । আমি বলবনা।

ঘাড় নেড়ে বললাম, ঠিক আছে তুমি বলে যাও।

আবারো তুলি ফিরে যায় অতীতে, ‘ আমরা খুব গরীব। ৫ বোন, ১ভাই। ভাইটি সবার ছোট। বড় ৩ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু, ২ বোন স্বামীর অত্যাচারে এখন আমাদের বাড়ীতে এসে থাকছে। বাবা দিন মজুর। মা আর বড় দুই বোন বাড়ি বাড়ি কাজ করে। কোন রকমে সংসার চলতো ।

একদিন পাশের গ্রামের রহিম চাচা বাবাকে এসে বললো, তোমার তুলিকে গার্মেন্সের কাজে দিবা। বেতন ভাল। আমাদের গ্রামের ফুলকিও গার্মেন্সে আছে অনেক টাকা রোজগার করে। তুলি গার্মেন্সে্র কাজে গেলে ফুলকির সঙ্গে এক সাথে থাকতে পারবে। কথাটা শুনেই আমার বুকের মধ্যে ধক্ ধক্ করতে লাগলো। আমি কাশেমকে রেখে কোথাও যাব না। আমি মাকে বললাম, আমি না খেয়ে থাকব , তবুও আমি যাব না। কিন্তু আমার দুই বোন, মা, বাবা সবাই আমাকে বুঝানো শুরু করলো। রহিম চাচা রোজ আমাদের বাড়ি আসে আর বাবা মার সাথে ফুসুর ফুসুর করে। রহিম চাচা মাকে বলল, পরশুদিন তুলিকে রেডি করে রাখবেন, আমি ঢাকায় নিয়ে যাবো। কোন চিন্তা নেই, আপনার তুলি খুব ভাল থাকবে।

আমার হাতে আর মাত্র ১ দিন। আমার কথার দাম কে দিবে। ঐদিন কাশেমের কাছে গিয়ে বললাম, কাশেম আমাকে আদর করে বলল তুলি তোমাকে ছাড়া থাকতে আমারও কষ্ট হবে। আমিও ট্রাক এর হেলপার । এখন তুমি যদি ঢাকা যাও, আমিও ঢাকায় গিয়ে ট্রাকের হেলপারের চাকরী নিবো। তুমি ঢাকায় যাও, দুইমাসের মধ্যেই তো আমি তোমাকে আমার বউ করে ঘরে নিয়ে আসবো।

দীর্ঘশ্বাস পড়ে তুলির , ‘ ঘর আর করা হইল না। ও আমাকে কাঁশবাগান হতে দুইটা কাঁশ ফুল ছিরে একটা আমার চুলের খোপায় পড়ায়ে দিল, আর একটা দিয়ে আমার গলায় মালার মত করে জড়াইয়া দিল। তুলি চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারছিল না। অনেকক্ষণ ডুকরে ডুকরে কাঁদলো। আমি তুলিকে বাধা দিলাম না। কারণ এই কাঁদার ভিতরও একধরণের সুখ আছে। প্রিয়জনকে মনে করার সুখ।

চোখ মুছে একটু পর তুলি শুরু করে আবার, বাড়িতে মা আমার জন্য ক্ষীর, পিঠা বানালো, বাবা একটা বড় দেখে ইলিশ মাছ আনলো। সবাই মিলে খেতে বসলাম। কতদিন পরে যে এত ভাল খাবার খেলাম । অভাবের সংসার, একবেলা খেলে, আরএক বেলা না খেয়ে থাকি। আমার বাবা আমার জন্য না জানি ধার করে ইলিশ মাছ আনছে কে জানে। মনে মনে বললাম , আমি তোমাদের ঠিক গোসত দিয়ে ভাত খাওয়াবো। তোমাদের সব ধার শোধ করবো। আমার ছোট বোন বলল, তুই আমার জন্য একটা বাসনা সাবান আর একটা লাল জামা ঢাকা থেকে আনবি। আমি আমার বোনের মাথায় হাত রেখে বলেছিলাম, তোর জন্য আমি লাল জামা আনব। সবার ছোট ভাইটা বলল, তুই আমার জন্য একটা বল আনবি। লালু বল খেলে, আমি খেলতে চাইলে আমাকে লালু খেলতে নেয়না। আমি বললাম ঠিক আছে সব আনবো। বেলা মাথার উপর হতে গড়ায় গেছে।

রহিম মিয়া বাড়িতে এসে বাবাকে ডাক দিল। আমার বুকের মধ্যে কেমন যে লাগতেছিল গো রফিক ভাই, তা আপনাকে কি করে বুঝাই। মা একটা টোপলা এনে আমার হাতে দিল। বলল, এইটার মধ্যে মুড়ি, গুর আর নারিকেলের নারু আছে। তোর দুইটা জামাও এর মধ্যে আছে। আমি তোর জন্য একটা লাল দেখে গামছা কিনে এর মধ্যে রেখে দিছি। মার সেই লাল গামছাটা রফিক ভাই এখনো আমার কাছে আছে। ওই গামছাটার মধ্যে এখনো আমি মার গদ্ধ পাই। বেলা পশ্চিমে হেলে গেলে বাড়ি হইতে ঢাকার দিকে রওয়ানা হইলাম। আমার বাবা, মা, বোন অনেক দূর পর্যন্ত আগাইয়্যা দিল। একটু দূরে খেঁজুর গাছের তলায় কাশেম দাড়াইয়া আছে। আমার কাছে আসলো। আমার হাতে একটা বড় প্যাকেট ধরায়  দিল। আমি নিলাম। বুকে জড়ায়া ধরলাম। বললাম আমার জন্য দোয়া কোরিও। রহিম মিয়া তখন একটু দূরে এগিয়ে গেছে। হাঁক দিয়া বলল, তুলি তারা তারি আয়। একটু পরেই সন্ধা নেমে যাবে। হাটছি আর ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেছি।

এরপর , ফার্মগেটের একটা টিনের বাসায় উঠলাম। ছোট একটা ঘর, তার মধ্যে ফুলকি, পরি আর লতা থাকে। ওরা সবাই আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করলো। ডাল ভর্তা দিয়া রাতে ভাত খেলাম। রাতে তাদের সাথে ঘুমাইলাম। সকালে কাশেমের প্যাকেট টা খুলে দেখলাম, ওইটার মধ্যে একটা সাবান, লিপস্টিক, তেল, আর একটা মেচেন্ডা রংয়ের শাড়ি, ব্লাউজ আর পেটিকোট। আমার কান্না এসে গেল। দুইদিন এভাবে থাকলাম। পরের দিন ঘরে একটা খারাপ লোক আসলো। পরীর সাথে কি সব বাজে বাজে কথা বলল। আমার দিকে আর চোখে তাকালো, আর খারাপ খারাপ কথা বললো। পরীর শরীরে হাত দেয়। আমি ঘর হতে বাইরে আসলাম। লতা বলল আমি গোয়ালন্দ আমাদের বাড়িতে যাচ্ছি। তিনদিন দিন পরে আসবো। লতা চলে গেল। ফুলকি আর পরীও আজ রাতে ঘরে আসলো না। আমার ভয় করতে লাগলো।

রহিম মিয়া আসলো। বলল কিরে তুলি তোর ভয় লাগতেছে। ভয় করিস না। তোর চাকরির জন্য যোগাযোগ করতেছি। সাতদিনের মধ্যে তোর চাকরিটা পাকা হয়ে যাবে। রহিম মিয়া বলল আজ এখানে থাকবো। আমি বললাম এখানে থাকবেন? রুম তো মাত্র একটা। সে বলল আরে ওই পাসে একটু শুয়ে থাকব। রাতে শুয়ে আছি, রহিম মিয়া আমাকে জরিয়ে ধরল। আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। আমার মুখটা সে চেপে ধরলো। বলল তুই এমন করলে তোর চাকরিও দিবো না আর খুন করে ফেলব। শরীরটা আমার ব্যাথা হয়ে গেল। শেষ রাতে একটা লোক আসলো, রহিম মিয়ার হাতে এক বান্ডিল টাকা দিল। লোভী দৃষ্টিতে আমার দিকে দেখল। হাসলো, বললো তোমার চাকরী হয়ে গেছে। রহিম মিয়া অনেক দিন পর একটা খাসা মাল আনছো। গায়ের রং ফর্সা, চেহারা শ্রীদেবীর মতো দেখতে। আমার আর তর সইছে না। আরো যে কত কথা বলল। কিন্তু আমার শরীর স্পর্স করলো না। সকালে ফুলকি আগে ঘরে আসলো। রহিম মিয়া বলল, ফুলকি সাতদিন পর তুলিকে চাকরীতে যোগ দিবে ওকে দেখে রাখবি। এই বলে রহিম মিয়া চলে গেল।

লতা তিনদিন পর বাসায় ফিরে আসলো। বলল, তুলি আমার মার খুব অসুখ। তাই কালকে আবারও যেতে হবে। কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলাম। তাই নিতে এসেছি। তুই যাবি আমাদের বাড়ি? আমি দুইতিন দিন পরই চলে আসবো। আমি রহিম মিঞা আর ঔ ব্যাটার কথা মনে করলাম। ভাবলাম লতার সাথে গেলেই আমার ভাল হবে। আমি ওর সাথে চলে গেলাম। উঠলাম একটা বাড়িতে। একজন মহিলাকে দেখলাম বিছানায় শুয়ে আছে। লতা আমাকে খুব যত্ন করে খেতে দিল। লতা আমার ছবি তুললো। একসাথে বিছানায় শুইলাম।

মাঝ রাতে ঘুম হতে জেগে দেখি লতা বিছানায় নাই। একজন লোক আমার পাশে, আমাকে জরিয়ে শুয়ে আছে। আমি ধরফর করে উঠলাম। আমাকে জোড় করে জরিয়ে ধরলো, আমি কিছুতেই ছাড়াতে পারলাম না। আমার মুখটাকে জামা দিয়ে বেধে দিলো। তারপর আমাকে জোর করে কিসব করল। আমি কাদতে লাগলাম। একটু পর লতা আসলো। আমার সাথে ঠাট্টা করে বলল, কিরে ঘরে কি নাগড় আসছিল? আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। ব্যাটা তুলির হাতে দুটা ১০০ টাকার নোট গুজে দিয়ে চলে গেল। আমি লতাকে বললাম আমি সকালে ঢাকা ফিরে যাব। লতা বলল তোমাকে যাবার জন্য তো এখানে আনি নাই। তোমার আর যাওয়া হইবে না। ফার্মগেটে যে লোকটা আসছিল পরের রাতে সেইলোকটা আসল, আমার সাথে রাতে থাকলো, যাওয়ার সময় বলল বেশি তেরিবেড়ি করবি না। তেরিবেড়ি করলে মেরে ফেলব। এভাবে ১০ দিন থাকলাম। বিশ্বাস করেন আমার শরীরে এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল না । তারা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়া গেল। ঔষধ খাইলাম, ভাল হইলাম।

তারপর গোয়ালন্দের পতিতা পল্লীতে আমাকে নিয়ে রাখল…এরপর থেকে এখানেই আছি।… এবার থামলো তুলি।

ভাই আর কি শুনবেন ! এই হইলো জীবন!  আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে তুলির কথায়।

তুলির সাথে কথা শেষ করে বাসায় ফিরতে বেশ রাত হলো। ফেরার সময় ভাবছিলাম, ‘