🕓 সংবাদ শিরোনাম

ভয়ংকর হচ্ছে খুলনা বিভাগ, একদিনেই রেকর্ড ৩২ জনের মৃত্যুটাঙ্গাইলে নতুন করে ১৪৯ জন করোনায় আক্রান্ত, ৩ জনের মৃত্যুইভ্যালিসহ ১০ ই-কমার্সে কেনাকাটায় নিষেধাজ্ঞা দিলো ব্র্যাক ব্যাংকনওমুসলিম ওমর ফারুক হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন-সংবাদ সম্মেলন, ৬ দফা দাবিআ.লীগ অতীতে জনগণের সঙ্গে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে : কাদের২৪ ঘন্টায় রাজশাহী মেডিকেলের করোনা ওয়ার্ডে ১৬ জনের মৃত্যুইভ্যালির সম্পদ ৬৫ কোটি, দেনার পরিমাণ ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকাবঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধাঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে কঠোর অবস্থানে পুলিশশাহজাদপুরে মহাসড়কের ১ হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

  • আজ বুধবার, ৯ আষাঢ়, ১৪২৮ ৷ ২৩ জুন, ২০২১ ৷

দিনাজপুরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য কুঠির শিল্প


❏ বুধবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৭ দেশের খবর, রংপুর

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরে প্রকৃতির দূর্যোগ প্রতিরোধি ও পরিবেশের পরমবন্ধু বাঁশঝাড় হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জীববৈচিত্র ধ্বংস হওয়া রোধে সহায়ক এই বাঁশঝাড় এখন প্রায় বিলুপ্ত পথে। বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য কুঠির শিল্পও। এ শিল্পের সাথে জড়িতরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে।

গ্রামীণ জনপদে এক সময় বাঁশঝাড় ছিল না এমনটা কল্পনাও করা যেতো না। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ। বিশ্বে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। বাংলাদেশে জংলি ও আবাদি প্রকৃতির ২৬ প্রজাতির বাঁশ জন্মে। কিন্তু বনাঞ্চলের বাইরেও এখন যেভাবে গ্রামীণ বৃক্ষরাজি উজাড় হচ্ছে তাতে হারিয়ে যাচ্ছে এ বাঁশঝাড়।

বাঁশ ফাঁপা কান্ড বিশিষ্ট একটি ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। বাঁশের বিস্তৃতি অতি ব্যাপক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কম বেশী এটা জন্মায়। এ দেশের বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। গৃহ নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, মাদুর, ঝুড়ি, ফাঁদ, হস্তশিল্পসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে বাঁশের রয়েছে বহুল ব্যবহার। প্রকৃতপক্ষে বাঙালির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশ। জন্মের পর বাঁশের চাঁছি দিয়ে নাড়ি কাটা হয়। তারপর বাঁশের তৈরি দোলনায় দোল খায় বাঙালি শিশুরা। মৃত্যুর পর বাঁশের খাটিয়ায় তুলে বাঙালি শেষযাত্রা করে। কবরের ওপরে বাঁশ বিছিয়ে তারপর মাটি দেওয়া হয়। বাঙালির দোলনাও বাঁশের, সমাধিও বাঁশের।

বাঁশসহ বৃক্ষ নিধনের ফলে দৈনন্দিন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। অথচ জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জীববৈচিত্র ধ্বংস হওয়া রোধে সহায়তা করতে পারে এই বাঁশ গাছই। বাঁশ গাছ অন্য যে কোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। জেলার জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প। এক সময় এ গ্রামীণ জনপদে তৈরি হতো হাজারো বাঁশের পণ্য সামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহিণীরা তৈরী করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য ‘কুটির শিল্প। প্রকৃতপক্ষে বাঁশ শিল্পের স্থান অনেকটাই প্লস্টিক সামগ্রী দখল করে নিয়েছে।

বাঁশের বেতের বাড়ি খেয়ে গরু থেকে মানুষ হয়েছি, বাঁশের মই বেয়ে ওপরে উঠে দেখেছি কে যেন সেটা সরিয়ে নিয়েছে, বাঁশের বাঁশি আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে ডাকাতিয়া, আমাদের চিত্রপট বাঁশের, আমাদের খেলনা বাঁশের, আমাদের বিদ্যুতের খুঁটি বাঁশের, আমাদের পতাকার স্ট্যান্ড বাঁশের, আমাদের কোদালের হাতল বাঁশের, আমাদের গরুর গাড়ি বাঁশের, ছই বাঁশের। আমাদের লাঠিয়ালদের লাঠিও বাঁশের। এমনকি আমাদের খড়মেও বাঁশ ছিল, কাঠের আসবাবে আমরা ব্যবহার করেছি বাঁশের পেরেক। আমাদের কাগজও বাঁশের, কলমও ছিল বাঁশের। আমরা বাঁশের টঙে বসে চা খাই, নৌকা থেকে নামি বাঁশের জেটিতে। আমাদের মাচা বাঁশের, খাঁচা বাঁশের। লালন অবশ্য বলেন, খাঁচা কাঁচা বাঁশের।

বাঁশ মানুষের জন্য পুষ্টিও যোগায়। কচি বাঁশের নরম কান্ড শতাব্দী ধরে এশিয়া জুড়ে খাওয়া হচ্ছে। এতে রয়েছে জার্মেনিয়াম যা কোষের বয়োবৃদ্ধি রোধে সহায়তা করে। খাদ্যগুন ও স্বাদের কারণে চীন, থাইল্যন্ড ও মায়ানমারে বাঁশ ভেজিটেবল হিসাবে বেশ সমাদৃত। কচি বাঁশের ডগা মুখরোচক সবজি হিসেবে খাওয়ার উপযোগী। এ ধরনের কচি ডগা স্থানীয়ভাবে বাঁশ কোরাল নামে পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বর্ষার মৌসুমে বহুল পরিমাণে এটি খেয়ে থাকে।

বাঁশের শাখা ও পাতাও পশুদের জন্য ভাল পশুখাদ্য। বিশ্বের বিরল প্রজাতী পান্ডা কচি বাঁশ ও পাতা খেয়েই বেঁচে থাকে। এমন কি পৃথিবীর বৃহত্তর স্থল স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী হাতীর কাছেও বাঁশ পাতা একটি অতি প্রিয় খাদ্য। এদেশের গ্রামীন জনপদে ছোট ছোট খাল এবং নালা পারাপারের জন্য আবহমান কাল যাবত ব্যবহৃত হয়ে আসছে বাঁশের সাঁকো। শুধু কি গ্রামীন জনপদেই নয়, রাজধানীর কিছু খালের উপরেও দেখা যায় বাঁশের সাঁকো। শুধু সাঁকো আর সেতু হিসাবেই নয় বাঁশ ব্যবহৃত হয় বাড়ীর ছাদ নির্মানের জন্য সেন্টারিং খুটি ও বড় বড় ভবনের নির্মাণ কর্মী ও কাজের নিরাপত্তামুলক কর্মকান্ডেও।

বাঁশের মন্ড কাগজ তৈরীর জন্য বিখ্যাত এ কথা সকলে জানে। এ রকম বাঁশ দিয়ে কাগজ তৈরীর কারখানা রয়েছে দেশে। ইদানিং বাঁশের মন্ড হতে বস্ত্র শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যথা তুলা ও সুতা তৈরী হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি অবলম্বন করে। তাই এ বিষয়টিও যথেস্ট গুরুত্ব রাখে।

পরিবেশ বান্ধব বাঁশতন্তুজাত সুতার তৈরী পোশাকের এখন বেজায় কদর বিশ্বের সকল উন্নত দেশের বস্ত্র বাজারে। কৃত্রিম তন্তুর তৈরী বস্ত্রের বিরোপ প্রতিক্রিয়ার কারণে ইউরোপ আমিরিকার ডিপার্টমেন্টার স্টোরে এখন বাঁশ তন্তুজাত বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রের কদর বাড়ছে। এ বস্ত্র দেখতে সুন্দর, নরম মোলায়েম, ভাজ পড়েনা, ইস্তারির প্রয়োজন হয়না। শীত গ্রীস্মে পড়া যায় সমান ভাবে। বাংলাদেশের রপ্তানীমুখী পোশাক শিল্প পুরাটাই নির্ভর করে আমদানি করা থান বস্ত্রের উপরে। তাই যদি বাঁশতন্তু হতে এদেশেই করা যেতো পোশাক তৈরীর জন্য সুতাও প্রয়োজনীয় বস্ত্র তাহলে কত না সহজেই দেশটি এই খাতে স্বনির্ভর হয়ে যেতো। পোশাক শিল্পটি হতো আরো লাভবান, আমাদের মিলিয়ন মিলিয়ন দরিদ্র নারী পুরুষ গার্মেন্টস কর্মীর মজুরীটাও যেতো অনেক বেড়ে। এর জন্য প্রয়োজন বাঁশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও লাগসই প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং বিনিয়োগকারীদের যথাযথ মনযোগ ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। এ দেশের কুটির শিল্পে রয়েছে বাঁশের ব্যপক প্রয়োগ। বাঁশ দিয়ে তৈরী হচ্ছে মাদুর, চাটাই, হাত পাখা, ঝুরী, ধানের ডোলা, কোলা, আসবাব পত্র, খেলনা ঘর, খাট পালংক আরাম দায়ক বিছানা, মুর্তী ও ভাস্কর্য।

ইদানিং আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বাঁশ হতে খুবই শক্তিশালী ও উন্নত মানের রড তৈরী হচ্ছে। জাপানীরা এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছে । তারা বাঁশের তৈরী রড ব্যবহার করে ভুমিকম্প প্রবন এলাকায় বাঁশের ঘরবাড়ী তৈরী করছে । তাছাড়া শক্তিশালী ব্যমবো রড এখন মাছ ধরার ছিপ তৈরীতে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । এরকম রডে তৈরী একটি মাছ ধরা ছিপের দাম দেশ ভেদে ২০০০ ডলারে বিক্রয় হয়ে থাকে । তাই বাঁশ এখন একটি উচ্চ মাত্রার ভেলু এডেড প্রডাক্ট হিসাবে বিবেচিত।

বিভিন্ন প্রকার ঔষধী কর্মে প্রয়োগসহ ব্যামবো ম্যাসেস এখন একটি অতি জনপ্রিয় ব্যমবো থেরাপী। হাতে পায়ে, মাযায়, পিঠের বাত বিষ ব্যথায়  কিংবা রিলাকসেসনের জন্য এটা এখন অতি জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। দুর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্তের অনেক শহড়ে গড়ে উঠেছে ব্যমবো থেরাপী সেন্টার।

অবশ্য জমি জমার দখল নিয়ে বাঁশের লাঠির বহুল ব্যবহার আছে দেশের অনেক অঞ্চলে সেই আদিকাল থেকেই। ধানের জমির দখল নিয়ে মারামারিকে বলে সাঁঝ। কাহিণীর নায়ক রূপাইকে নিয়ে এ রকম সাঁঝের মারামারির একটি দৃশ্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পল্লী কবি জসিমুদ্দীন তার নক্সীকাথার মাঠে।

তবে বাঁশের এই লাঠি অনায়াসেই হতে পারে চিত্ত বিনোদনের জন্য খেলার উপকরণ। মনে প্রাণে চাই বাঁশ পিটা নয়, বাঁশের লাঠি খেলা দেখার জন্য লোকজন দৌঁড়িয়ে এসে ভীর জমাক। গ্রাম বাংলায় বাঁশের লাঠি খেলার বেশ প্রচলন ছিল এক সময়। গ্রামীন এ খেলাটি এখন হারিয়েই যেতে বসেছে।

বাঁশ যেন হয় সুখের হাতিয়ার। এর থেকে যেন বের হয় মিস্টি মধুর জীবনের সুর। যেমনটি হতো শ্রীকৃঞ্চের মোহন বাঁশীতে। শেষ বেলায় আরো একটি বিষয় না বললেই নয় আমাদের দেশের বাঁশ শিল্পীদের তৈরী বাঁশী এখন দেশের সীমা পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও দিয়েছে পারি। মোহন, মরালী, মুখ, নাগিনী, ক্যালেন কিংবা পাখি এমনসব শ্রুতিমধুর নামের বাঁশি তৈরি করে বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার বাঁশির নাম। শুনতে অবাক লাগলেও ঘটনা সত্যি। বাংলাদেশের তৈরি বাঁশি রফতানি হচ্ছে বিদেশে আর আনছে বিদেশী মুদ্রা। বাঁশি রফতানি হচ্ছে – সিঙ্গাপুর, ব্রিটেন, জাপান, কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে। তাই এখন শুধু কৃষ্ণই নন, অনেক বিদেশী রাধিকার হাতেও উঠে এসেছে এদেশের শিল্পীর তৈরী ভুবন বিখ্যাত সুরেলা বাঁশের বাঁশি।

বাঁশ শিল্প একটি লোকশিল্প। এর প্রধান মাধ্যম বাঁশ। সাধারণত গ্রামের লোকেরা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত এবং বেশির ভাগ তারাই এসব ব্যবহার করে। বাঁশের ব্যবহার বিবিধ। ঘর, মাচা, মই, মাদুর, ঝুড়ি, ফাঁদ, হস্তশিল্প ইত্যাদি ছাড়াও মৃতদেহ সৎকার ও দাফনের কাজেও বাঁশ ব্যবহৃত হয়। বাঁশকে দরিদ্র মানুষের দারুও বলা হয়। নিত্য ব্যবহার্য এই বাঁশ কালক্রমে লোকসংস্কৃতি ও কারুশিল্পের প্রধান উপকরণ হয়ে ওঠে।

বাঁশের তৈরি এই শিল্প দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও আদিবাসীদের জীবনাচরণ ও অনুভূতির প্রতীক। আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বাঁশের তৈরি শিল্পকর্ম দীর্ঘস্থায়ী না হলেও লোকজীবনে ব্যবহারের বহুমাত্রিকতা ও প্রয়োজনের কারণে এই শিল্পকর্ম বংশপরম্পরায় চলে আসছে। এর কিছু কিছু শিল্পকৌশল হাজার বছর ধরে অবিকৃত আছে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় বাঁশের মোড়ায়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরএ দিনাজপুর থেকে সংগৃহীত আনুমানিক দশম শতাব্দীর বুদ্ধমূর্তি সিতাতপত্রা (সংগ্রহ নং ১১১৫) পদ্মের পরিবর্তে বাঁশ ও বেতের তৈরি মোড়া সদৃশ একটি আসনে উপবিষ্ট। কালো পাথর খোদাই করে মোড়াটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই মোড়ায় গ্রামবাংলার কেচকি বেড়ার কৌশল অনুসৃত হয়েছে এবং এ ধরনের মোড়া আজও এদেশে তৈরি হয়।

বাংলাদেশের লোকজীবনের খুব কম দিকই আছে যেখানে বাঁশের তৈরি সামগ্রী ব্যবহূত হয় না। বাঁশের তৈরি মাথাল, ওরা, ভার ইত্যাদি কৃষিকাজে ব্যবহূত হয়। মাছ ধরার চাই, খালুই, জুইতা ইত্যাদি মৎস্যজীবীদের হাতিয়ার। বাঁশের দোচালা, চারচালা ও আটচালা ঘর, বাঁশের বেড়া, ঝাপ, বেলকি, দরমা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীক। আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত বর্শা, ঢাল, লাঠি, তীর, ধনুক ও বল্লম হিসেবে বাঁশের ব্যবহার লক্ষণীয়।

পাল তোলা নৌকা এবং গরুর গাড়ির ছাদ বা ছই নির্মাণের উপাদান হিসেবে বাঁশের বিকল্প নেই। বাঁশি বিশেষকরে অলঙ্কৃত বাঁশি লোকবাদ্যযন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান। বিভিন্ন লোকজ বিশ্বাস থেকে এদেশের মানুষ তৈরি করে বাঁশের খেলনা ও পুতুল। আসবাব হিসেবে মোড়া, চাটাই বহুল প্রচলিত। ইদানীং নগরজীবনে বাঁশের তৈরি আসবাব, ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, কলম ইত্যাদিও লক্ষ করা যায়। চা বাগানে চায়ের পাতা তোলার ঝুড়ি, খাসিয়াদের পান রাখার ঝুড়ি এবং বিভিন্ন উপজাতীয়দের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি পাত্রসমূহ খুবই আকর্ষণীয়। এসব পাত্র বা ঝুড়িতে বুননের মাধ্যমে নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। বাংলাদেশের যে কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে, বাঁশ তাদের অন্যতম।

এক কথায়-জীবনেও বাঁশ মরনেও বাঁশ। বাঁশ গ্রামীণ মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। দৈনন্দিন জীবনের ইত্যকার নানা কাজে আবহমান কাল থেকে বাঁশের ব্যবহার চলে আসছে। গ্রামীণ জনপদের নিম্ন আয়ের মানুষ যারা কাঠ, টিন অথবা ইটের তৈরি ঘর বাড়ি বানাতে পারেনা বাঁশ তাদের নিত্য সঙ্গী।

বাঁশ জাতীয় উদ্ভিদ মাটি এবং জল থেকে ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ নীজের শিকড়রের মধ্যে শোষনের মাধ্যমে বিশুদ্ধায়নের বিষয়ে খুব কার্যকরী বলে প্রমানিত রয়েছে। বিভিন্ন প্রকার ঔষধী কর্মে প্রয়োগ সহ ব্যামবো ম্যাসেস এখন একটি অতি জনপ্রিয় ব্যামবো থেরাপী।

বাঁশ চাষ পরিবেশ বান্ধব। পরিপক্ক একটি বাঁশ প্রতি বছর নতুন শুট গজানোর মাধ্যমে নতুন বাঁশের জন্ম দেয়। তাই মুল উদ্ভিদটিকে ধ্বংস করা ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে এর থেকে প্রয়াজনীয় বাঁশ সংগ্রহ করা যায় নিয়মিতভাবে। অন্য যে কোন গাছের তুলনায় বাঁশ কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেয় খুব দ্রুত। অর্থাৎ বাঁশের ঝোপঝাড় সমপরিমাণ বনাঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে শুষে নেয় কার্বন গ্যাস। বাঁশের শেকড় অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ় যা মাটির ক্ষয়রোধে ভূমিকা রাখে। এর পাতা পড়ার পর তা মাটির সাথে মিশে গিয়ে মাটিকে পুনরুজ্জীবিত করে। বাঁশের শেকড় মাটির নিচে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে একশো মিটার পর্যন্ত। ফলে একজনের বাঁশঝাড়ের শেকড় তার প্রতিবেশির সীমানার মধ্যেও ঢুকে পড়তে পারে। তবে ভূমিধ্বস ঠেকাতে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রজাতির বাঁশ বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে বলে মন্তব্য পরিবেশবিদদের।

দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সরকার জানান, বাংলাদেশের মাটি, পানি আর আবহাওয়া বাঁশ চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় এখানে পরিকল্পিতভাবে বাঁশ চাষ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া এ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বাঁশের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশ চাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর চৈত্র ও বৈশাখ মাসে বাঁশের কোঁড়ল গজায়। এ সময় বাঁশের বিশেষ যত্ন নিতে হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে ৩০০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুলি, বরাগ, রফাই, বাজালি, মৃতিঙ্গাসহ প্রায় ২০ প্রজাতির বাঁশের চাষ হয়। সাধারণত তিন বছরেই একটি বাঁশ পরিপক্ব হয়। প্রয়োজনভেদে একেক প্রজাতির বাঁশ একেক রকম কাজে লাগে। বাঁশ চাষ এরই মধ্যে লাভজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাঁশঝাড় ব্যবস্থাপনা দ্বারা সুস্থ-সবল ও পুষ্ট বাঁশ উৎপাদন করলে ভালো বাজারমূল্য পাওয়া যায়। এতে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ও সম্ভব।

বাংলাদেশ ডিপ্লোমা বনবিদ পরিষদের সভাপতি এ.কে.এম আব্দুস সালাম তুহিন জানান, পৃথিবী জুড়ে বাঁশ ও বাঁশজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও বাঁশ সংশ্লিষ্ট শিল্প গড়ে উঠছে। বর্তমানে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন রকম পণ্য যেমনঃ প্লাইবোর্ড, পার্টিকেল বোর্ড, সিমেন্ট বন্ডেড পার্টিকেল বোর্ডসহ গৃহস্থালির আসবাবপত্র তৈরি করা হচ্ছে। বাঁশ দিয়ে রকমারি আসবাবপত্র যেমনঃ সোফা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ওয়ারড্রব তৈরি করে কাঠের চাহিদা পূরণ করা হয়।

বাঁশের তৈরি এসব আসবাবপত্র ও শৌখিন গৃহসামগ্রী বিদেশেও রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। তাছাড়া মুলি বাঁশ দিয়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়িঘর নির্মাণ, বাড়ির বেড়া, সিলিং তৈরি ও বাঁশের বেত দিয়ে চাটাই তৈরি ঘরের পার্টিশন দেয়া হয়। বাজালি বাঁশ দিয়ে বাঁশি তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশের বাঁশির কদর যুগ যুগ ধরেই শিল্পী সমাজে সমাদৃত হয়ে আসছে। শক্ত প্রকৃতির বরাগ বাঁশ দিয়ে বাড়িঘরের খুঁটি, সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। বাঁশের বহুবিদ ব্যবহারের ফলে বাঁশ চাষে মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবেশবিদ তুহিন আরো জানান, যে বছর বাঁশঝাড়ে ফুল ও বিচি হয় সে বছর বাঁশ কাটা উচিত নয়। বাঁশে ফুল হলে ঝাড়ের সব বাঁশ মরে যায়। এসব বাঁশ থেকে পাকা বীজ সংগ্রহ করে নতুন বাঁশ বাগান গড়ে তোলা যায়। তিনি মনে করেন, বাঁশ চাষ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে, অন্যদিকে আর্থিক সফলতা নিশ্চিত করবে। বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বাঁশ চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষিত হবে।

প্রকৃতি ও জীবন রক্ষায় বাঁশ চাষ ও তার সম্প্রসারন ও বিকাশের জন্য গড়ে তুলতে হবে বাঁশ নার্সারী। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উন্নতমানের দ্রুত বর্ধনশীল বাঁশের আবাদ প্রকল্প করতে হবে বাস্তবায়ন। এতে বাঁশের সবুজ বেস্টনি যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। রক্ষা পেতে পারে আমাদের জীববৈচিত্র। প্রকৃতির দূর্যোগ প্রতিরোধি এবং পরিবেশের পরম বন্ধু এই বাঁশঝাড় কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। এই বাঁশঝাড় টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের যেমন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন জনসচেতনতার। এমনটাই মন্তব্য করেছেন পরিবেশবিদরা।