• আজ ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

লন্ডন হামলার ঘটনায় ত্রিমুখি আতংকে সময় কাটছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের!


সময়ের কণ্ঠস্বর, প্রবাসী ফিচার ডেস্ক-লন্ডনে সন্দেহভাজন জঙ্গি হামলার পর তিন ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে সেখানকার বাংলাদেশিদের মধ্যে । একদিকে তারা লন্ডনবাসী হিসেবে অন্যান্য ব্রিটিশদের মতো করেই নিজেদের হামলার লক্ষ্যবস্তু মনে করছেন সেখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি ।

অন্যদিকে ‘হেইট ক্রাইমের’ শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা। এসবের পরেই  রয়েছে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর হওয়ার আশংকা ।

এবারের হামলার পর সেখানে সে মাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা গত বারো বছরে দেখেনি লন্ডনবাসী। কেউ কেউ একে ‘যুদ্ধাবস্থা’ বলেও উল্লেখ করছেন। এর আগে ২০০৫ সালে লন্ডনে জঙ্গি হামলার পর এমন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গিয়েছিল।

এর আগে স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১০টা ৮ মিনিটে আমরা খবর পাই, লন্ডন ব্রিজে একটি গাড়ি কয়েকজন পথচারীকে চাপা দেয় । গাড়িটি পরে বোরো মার্কেটে যায়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা সেখানে বেশ কয়েকজন মানুষকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করে।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশংকা প্রকাশ করে  জানান, হামলার সময় তারাও হয়তো ওই স্থানে থাকতে পারতেন। আর এসব হামলায় লন্ডনে থাকা যে কোনও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে যে কোন সময়েই।

লন্ডন প্রবাসী সাইফুল ইসলাম টেলিফোনে সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান,   দুই সপ্তাহ আগে সেখানে জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশিসহ এশীয় কমিউনিটির কেউ কেউ হেইট স্পিচ এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকারও হয়েছেন। সাম্প্রতিক ওই ঘটনার পর ঘৃণাজনিত হামলার পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশি কমিউনিটির  প্রায় সবাই।

এভাবে দুহাত তুলে পুলিশ কর্ডনের মাঝ দিয়ে হেঁটে ঘটনাস্থল ছাড়নে অনেক আতঙ্কিত মানুষ। রয়টার্স

বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে  আরেকটি আতঙ্কের কারণ হলো অভিবাসী আইন কঠোর করা। ক্রমাগত যুক্তরাজ্য এবং তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার ফলে অভিবাসী আইন কঠোর করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশিরা।

লন্ডন প্রবাসী কুমিল্লার মতিন আহমেদ জানান, অভিবাসী আইন কঠোর করলে তা যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস, ব্যবসা এবং যাতায়াতে বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে বলে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বর্ননায় হামলার ভয়াবহতা

এক বিবৃতিতে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সহকারি পরিচালক পিটার রোডস লন্ডন ব্রিজের এ হামলায় হতাহত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় ৪৮ জন আহত ব্যক্তিকে লন্ডনের পাঁচটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছি।’ পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলেই ছয়জন নিহত হয়েছেন।

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারি কমিশনার মার্ক রোলি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, হামলাকারীরা অন্তত ছয়জনকে হত্যা করেছে। পুলিশ তিন হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেছে। এখন মেট্রোপলিটন পুলিশের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ, সিটি অব লন্ডন পুলিশ, লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং লন্ডন ফায়ার ব্রিগেড।

পুলিশের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে লন্ডন ব্রিজে জনতার ভিড়ের মধ্যে একটি ভ্যান চালিয়ে দেয় তিন হামলাকারী। এর পর তারা সাদা রঙের ওই ভ্যান থেকে ছুরি হাতে বেরিয়ে আসে এবং কাছের বারা মার্কেট এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়।

ম্যানচেস্টারে হামলার রেশ না কাটতেই যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগের এ ঘটনায় শেষ খবর পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহতের কথা জানিয়েছে পুলিশ। আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে আরও ৩০ জনকে।

৫৩ বছর বয়সী মার্ক রবার্টস  নামের  একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, “এটা ছিল ভয়ানক,”

রবার্টসের মত আরও অনেকে এদিন সাক্ষী ছিলেন লন্ডন ব্রিজ ও বারা মার্কেটে এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার। প্রথমে সাদা একটি ভ্যান ব্রিজের ফুটপাতে হাঁটতে থাকা মানুষের ওপর তুলে দিয়ে হামলাটি শুরু করা হয়।

“মনে হচ্ছিল চালক নির্দিষ্ট করে একটি দলকে লক্ষ্য করেছিল। আমি স্থানুর মত দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত,” বলেন রবার্টস।

হামলাকারীদের ভ্যানটি ফুটপাতে তুলে দেওয়ার পর অন্তত ছয়জনকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন রবার্টস। হামলাকারীরা এরপর ছুরি হাতে বারা মার্কেট এলাকায় নারী-পুরুষ সবার উপর নির্বিচারে হামলা চালায়।

হামলা শুরুর ৮ মিনিটের মাথায় বারা মার্কেট এলাকায় তিন হামলাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয় বলে ব্রিটিশ পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের প্রধান মার্ক রাউলি জানিয়েছেন।

বিবিসি জানিয়েছে, হামলাকারীদের শরীরে ক্যানিস্তারের মত কিছু বাধা দেখে প্রথমে সুইসাইডাল ভেস্ট বলে ভাবা হলেও পরে দেখা যায় সেগুলো অন্য জিনিস, কোনো বিস্ফোরক নয়।
ঘটনার সময় লন্ডন ব্রিজে ছিলেন ৫৩ বছর বয়সী ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট মার্ক রবার্টস। রয়টার্সকে তিনি জানিয়েছেন, ভিড় লক্ষ্য করেই ওই ভ্যানটি চালানো হয়েছিল।

ভ্যানটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মাইল ছিল বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিবিসির সাংবাদিক হলি জোন্স জানিয়েছেন। “চালক আমার সামনে দিয়েই ডান দিকে মোড় নেয় এবং এরপর ৫-৬ জনকে আঘাত করে।”

বিবিসি জানায়, ব্রিটিশ আর্মড পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে স্থানীয় সময় রাত ১০ টা ৮ মিনিটে লন্ডন ব্রিজের কাছে সাদা একটি ভ্যানের আঘাতে আহত কয়েকজন মানুষের কথা জানিয়ে সেখানে যেতে অনুরোধ করা হয়।

কিছুসময় পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউন্টার টেররিজম বিশেষজ্ঞ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তার কিছুক্ষণ পর ব্রিজের দক্ষিণ দিকের বোরো মার্কেট এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়।

গেরার্ড নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে বলেন, “ঘটনার পর আমি এক বৃদ্ধকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি, যিনি বলছিলেন তাকে ছুরি মারা হয়েছে।”

গেরার্ড তিন মুসলিম হামলাকারীকে এক বালিকাকে একের পর এক ছুরি মারতে দেখার কথাও জানান।

“তারা ওই মেয়ের ওপর হামলা চালায় এবং আরেক ব্যক্তিকে ছুরি মারে। তারা রাস্তার উপর দৌড়ে সরাইখানার এক বাউন্সারকে ছুরি মারে।

“আমি তাদের দিকে বোতল, বিয়ারের গ্লাস, চেয়ার, টুল সব ছুঁড়ে মারছিলাম, তবুও আমি ছিলাম অসহায়। তারা দৌঁড়ে আসছিল আর বলছিল, ‘এগুলো আল্লাহর জন্য’,”।

সবকিছুর পর ওই বালিকাকে মারা ছুরির দৃশ্যই গেরার্ডের চোখে ভাসছিল।

“তারা মেয়েটিকে ১০ কি ১৫ বার ছুরি মেরেছিল। মেয়েটি সেসময় বারবার সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছিল।“

গেরার্ডের দাবি, তার ছুঁড়ে মারা জিনিস এক হামলাকারীর পেছনদিকে আঘাত করলে হামলাকারী তাকে ধাওয়া দেয়, তবে শেষপর্যন্ত তিনি অক্ষত অবস্থায় পালাতে সক্ষম হন।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন ব্রিজ ও বরো মার্কেটে বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ওই হামলায় সাতজন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এহেন নির্বোধের ন্যায় কাপুরুষোচিত কাজের কঠোর নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা যুক্তরাজ্যের জনগণের প্রতি সংহতি জানাই।’

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ও যুক্তরাজ্যের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই কঠিন সময়ে শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও প্রার্থনা রইলো।

উল্লেখ যে,লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে পৃথক দুই স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় ১০ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হয়েছেন। হামলার সময় পুলিশের গুলিতে তিন হামলাকারী ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় সময় শনিবার রাতে (বাংলাদেশ সময় রোববার, ০৪ জুন, ভোর পৌনে ৪টার দিকে) লন্ডন ব্রিজ ও পাশ্ববর্তী বোরো মার্কেটে সন্ত্রাসী হামলার এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর লন্ডন ব্রিজে যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

◷ ২:০৪ পূর্বাহ্ন ৷ সোমবার, জুন ৫, ২০১৭ Breaking News, প্রবাসের কথা, ফিচার