• আজ ২৬শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সালমান শাহ্‌ হত্যা মামলা: ভিডিওটি নিয়ে যা বললেন এই মামলার আইনজীবী, তদন্তে নেমেছে পিবিআই

❏ সোমবার, আগস্ট ৭, ২০১৭ বিনোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সময়ের কণ্ঠস্বর: বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ্‌ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রাবেয়া সুলতানা রুবির বক্তব্যসহ ভিডিও সাক্ষীর প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করবেন আইনজীবীরা। আজ সোমবার সালমান শাহ হত্যা মামলার আইনজীবী ফারুখ আহম্মেদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

ফারুখ জানান, মামলার আসামি রুবি যেহেতু হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা আদালতের নজরে আনতে ভিডিও দাখিল করা হবে ও তদন্ত কর্মকর্তাকে ভিডিওটি দেওয়া হবে।

এই আইনজীবী বলেন, ‘ভিডিওটির মাধ্যমে বোঝা যায় যে, সত্য কখনো চাপা থাকে না। সত্য ঘটনা উৎঘাটন হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার পাবোই।’

আসামি রাবেয়া সুলতানা রুবি ৬ আগস্ট (গতকাল) তার নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে আসেন। যেখানে তিনি স্বীকার করেন, নব্বই দশকের সবচেয়ে সফল এ নায়ককে হত্যা করা হয়েছে। তিনি নিজে এতে যুক্ত না থাকলেও তার স্বামী জ্যানলিন চ্যান, ছোট ভাই রুমী, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরাসহ বেশ কয়েকজন হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। আমেরিকা প্রবাসী এ নারী ঠিক কোথায় থেকে এ ভিডিওটি প্রকাশিত করেছেন তা উল্লেখ করেননি। তবে তিনি যে বেশ আতঙ্কগ্রস্ত, ভিডিওটিতে তা ফুটে ওঠে।

প্রকাশিত এ ভিডিওটিতে তিনি জানান- জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা সালমান শাহ আত্মহত্যা করেনি, তাকে খুন করা হয়েছে।

রাবেয়া সুলতানা রুবি বলেন, ‘সালমান শাহ্ আত্মহত্যা করেনি, সে খুন হয়েছে। আমার হাজব্যান্ড এটা করিয়েছে আমার ভাইকে দিয়ে। সামিরার ফ্যামিলি এটা করিয়েছে আমার ভাইকে দিয়ে আর সবাই মিলে- বাকিরা সব চাইনিজ মানুষ। আমি রুবি এখানে ভেগে এসেছি। এই কেস যেন না শেষ হয়। আমি যেভাবে পারি ঠিকমতো যেন সাক্ষী দিতে পারি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমাকেও খুন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দয়া করে আমার জন্য দোয়া করেন, আমি ভালো নাই। আমি কী করব আমি জানি না, শুধু এইটুকু জানি-সালমান শাহ্, মানে ইমন আত্মহত্যা করেনি, তাকে সামিরা, আমার স্বামী ও সামিরার পরিবারের সবাই মিলে খুন করেছে। প্লিজ কিছু করেন।

এরা কী মানুষ (চাইনিজ কমিউনিটি)– আপনারা জানেন না। আমি ভেগে এসেছি এইখানে। দয়া করে আপনারা কাউকে জানান। আমার ছোট ভাই রুমীকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে। পরে রুমীকেও খুন করানো হয়েছে। আমি জানি না রুমীর কবর কোথায় করা হয়েছে। রুমীর লাশ তুলে যদি আবার পোস্টমর্টেম করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে- তাকেও খুন করা হয়েছে। এরমধ্যে আমার খালু মমতাজ হাসান আছে, খালাতো ভাই জুম্মা থাকতে পারে।’

তার স্বামীর পরিচয়ও তিনি তুলে ধরেন, ‌‘আমার হাজব্যান্ড জ্যানলিন চ্যান, জন চ্যান নামে বাংলাদেশে পরিচিত ছিল, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে সাংহাই চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক ছিল। আমিই লাস্ট মানুষ যে কিনা খুনের বিষয়ে জানি। আর আমি এটা প্রমাণ করতে পারবো ইনশাল্লাহ। দয়া করে একটু সাহায্য করেন, একটু সাহায্য করেন। এরা বাসার মধ্যে আমাকেও খুন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সুযোগ করতে পারেনি। আমি আমার স্বামীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তুমি আমাকে খুন করতে চাও, না? ও আমাকে বলেছে– তোকে তো খুন করলে সেই কবেই খুন করতাম। এটা তো আমি জানি যে, আমাকে খুন করতে চায়, কারণ আবার কেসটি ওপেন হয়েছে। প্লিজ দয়া করে কিছু করেন।’

সালমানের মা নীলা চৌধুরীকে উদ্দেশ করে রুবি বলেন, ‘নীলা ভাবি, আপনার ছেলেকে খুন করা হয়েছে। আমি ভেগে আসছি। না হলে আমাকেও মেরে ফেলতো ওরা সবাই মিলে।’

গতকাল এই ভিডিও প্রকাশের পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সালমান শাহর ভক্তরা ভিডিওটি শেয়ার করে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও দাবি করছেন।

সালমান শাহ হত্যা মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেসটিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। এ বিষয়ে আজ সোমবার বিকেলে পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার (মেট্রো) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমিও শুনেছি, ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এটা আমাদের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগে আমাদের কাছে তেমন কোনো সূত্র ছিল না। কিন্তু ওই নারী দেশে নেই। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ভিডিওটি সংগ্রহ করা হয়েছে।’

আলামতের অভাবে মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত করা যাচ্ছে না, উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সালমান শাহ হত্যা মামলায় কয়েক পর্যায়ে তদন্ত হয়েছে। অনেক আলামত নষ্ট হয়েছে। এ কারণে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। তবে এ ভিডিওতে কিছুটা হলেও সংঘট ঘুচবে। অপেক্ষা করুন, সময়ই সব বলে দেবে।’

আলোচিত এই মামলার নথি থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ নিহত হন। সে সময় তাঁর বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন।

১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানের বাবা তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে একটি অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিএমএম আদালত অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগটি একসঙ্গে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

পরবর্তী সময়ে একই বছরের ৩ নভেম্বর সিআইডি ঘটনাটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করে সিআইডি। একই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সিআইডি পুলিশের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

সিআইডির দাখিল করা প্রতিবেদনে সালমানের বাবা সন্তুষ্ট না হয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করেন।

ওই রিভিশন মামলার ওপর শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটিকে ফের বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে এ মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।

২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সিএমএম বিকাশ কুমার সাহার কাছে মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পরে ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সালমান শাহর মা নীলুফার চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজির আবেদন করেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন মিলে সালমান শাহকে হত্যা করতে পারে। একসময় মামলাটি তদন্ত শুরু করে র‌্যাব। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬ এর বিচারক র‌্যাব মামলাটি তদন্ত করতে পারবে না বলে আদেশ দেন। এরপরই মামলাটি পিবিআইকে দেওয়া হয় তদন্তের জন্য।