জালের ফাঁকে ইলিশ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে চলে যায়!


এস আই মুকুল, ভোলা প্রতিনিধিঃ
মানুষ স্বপ্ন দেখে তাঁর কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছার জন্য, কিন্তু কিছু মানুষের স্বপ্নই নেই! আছে শুধু বাস্তবতার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার এক অনিশ্চত জীবন। যেখানে শিশুকাল থেকে মাছ ধরা, জীবনের সবটুকু শেষ করেও ভাগ্যের কোন বদল হয়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও হিসাব মেলাতে পারছেনা জেলেরা। জীবনের বাকি কয়টা দিন হয়তো এই কাজ করেই জীবনটা পার করে দেবেন। পরের প্রজম্ম মৎস্যজীবী হলেই যেন জেলে জীবনের পরম প্রশান্তি। ভোলার উপকূলের জেলেদের হিসাবটা ঠিক এমনই।

জেলেদের জীবন চলছে অনিশ্চয়তায়, কেননা মেঘনায় মাছ আহরণ করতে গেলে হঠাৎ করে জলদস্যুরা অপহরণ করা ও সর্বস্ত্র লুটে নেওয়াসহ নানবিধ সমস্যার শিকার হয়ে থাকেন। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থেমে নেই তাঁরা। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে নদী থেকে সাগরে আসা-যাওয়া করেন এখাকার জেলোরা। যখনই মহাজনের ডাক আসে তখনই নৌকা কিংবা ট্রলার নিয়ে ছুটেন নদীতে। ঘরে ফিরে আসার মনোবাসনা নিয়ে নদী থেকে সাগরে গেলেও অনেকেরই আর ফেরা হয় না।

শত প্রতিকূলতার পরেও মহাজনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে উপকূলের হাজারো জেলে পরিবার। জালের ফাঁকে ইলিশ আটকালেও জেলেদের ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই ইলিশ চলে যায় মহাজনের মোকামে। ইলিশ ভর্তি জেলে নৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে বাঁজ পাখির মত ছোঁ মারে মহাজনের লোকেরা। মহাজনদের খুশিমত বেঁধে দেওয়া দামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে জেলেরা। প্রতিবাদের শক্তি নেই জেলেদের। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে। দিন রাত হাড় খাটানির মাধ্যমে আহরিত মাছের লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয় এসব জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজার হাজার জেলে পরিবার বংশ পরস্পরায় নদীতে মাছ শিকার করে নিজেদের জীবন-জীবিকা চালিয়ে আসছে। মাছ আহরণই তাদের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু ভরা মৌসুমে নদীতে মাছ কম থাকায় জেলেদের জালে চাহিদানুরূপ হারে মাছ শিকার না হওয়ায় চরম হতাশা হয়ে পড়ছে জেলেরা।

আর এতে তাদের জীবন-জীবিকায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। জেলেরা মৌসুমের শুরুতে নৌকা মেরামত, জাল কেনার জন্য মহাজনদের কাছে আহরিত সকল মাছ বিক্রয় করার শর্তে টাকা ধার হিসেবে নেয়। নদীতে যখন মাছের অকালত্বে মহাজনদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় অধিকংশ জেলে বছরের পর বছর জিম্মি থেকে যায়। ফলে বিভিন্ন সময় আহরিত মাছের বাজার মূল্য থেকে অনেক কম মূল্যে জেলেদের মাছ বিক্রয় করতে বাধ্য করে মহাজনারা।

তাছাড়া নদীতে জলদস্যুদের কবলে পড়ে অনেক সময় চাঁদা প্রদান সহ সর্বস্ব দিতে হয়। অনেক সময় জলদস্যুদের হাতে জীবন পর্যন্ত চলে যায়। ইলিশ ধরার মৌসুমে জলদস্যুদের উৎপাত বেড়ে যায়, তার উপর মহাজনের বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে পানির দরে মাছ বিক্রয় করতে বাধ্য হয় মেঘনার জেলেরা।

জেলেদের জীবনযাপনের সার্বিক চিত্রে দেখা গেছে, যে সময়টুকু ইলিশের জাটকা ধরা বন্ধ থাকে সেই সময়ে ৯৯ দশমিক ৫২ শতাংশ জেলে ভিজিএফ এর চালের অপেক্ষায় থাকেন। ৩৭ শতাংশ জেলে বাকিতে খাবার কিনে খান আর ২৭ শতাংশ জেলে কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে জাটকা ধরেন। আবার এর মধ্যে ওই সময়ে সঞ্চয় ভেঙ্গে খাবার খান ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ জেলে আর ৬ শতাংশ জেলে টাকার অভাবে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন। তবে বিকল্প হিসাবে মাছের ব্যবসা করেন ৪ শতাংশ এবং আর বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকেন আরো ২ শতাংশ জেলে।

গবেষণায় উঠে এসেছে অভাব থাকলেও জেলেদের অধিকাংশই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে চান না কিংবা যেতে চাইলেও যেতে পারেন না পিছুটানের কারনে।

◷ ১:২৪ অপরাহ্ন ৷ শুক্রবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৭ দেশের খবর