ভোলায় ১৩৮টি সিম কার্ড দিয়ে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ

১১:৪৮ পূর্বাহ্ন | বুধবার, নভেম্বর ২৯, ২০১৭ দেশের খবর, বরিশাল

ভোলা প্রতিনিধিঃ তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। আবার মাদ্রাসার সুপার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৩৮টি সিম কার্ড কিনে শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তির টাকা তুলে আত্মসাৎ ও দাখিল পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায়সহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ওই শিক্ষক হলেন মো. সামসুদ্দিন। তিনি ভোলার সদর উপজেলার পশ্চিম চরসামাইয়্য দাখিল মাদ্রাসার সুপার ও ভেলু মিয়া এ হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

গতকাল মঙ্গলবার ওই শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গ্রামের লোকজন বিক্ষোভ করেছেন। একই দাবিতে ২৭ নভেম্বর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের বরাবর আবেদন করেন গ্রামবাসী। এতে ১২১ জন সই করেছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত শুরু হয়েছে।’

গতকাল সকাল ১০টায় সরেজমিনে দেখা যায়, শতাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গ্রামবাসী জমায়েত হয়ে মাদ্রাসার সামনে বিক্ষোভ করছেন। তাঁরা মাদ্রাসার শিক্ষকদের চারপাশ থেকে আটকে রাখেন। এ সময় ২০ জন ছাত্র জানায়, কোনো নোটিশ ছাড়াই আজ (গতকাল) সুপার মর্নিং ক্লাস ডেকেছেন। তিনি এখন মাদ্রাসায় নেই।

কয়েকজন অভিভাবক বলেন, তাঁরা সুপারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। যেকোনো মুহূর্তে তদন্ত হতে পারে—সে ভয়ে সুপার আজ (গতকাল) হঠাৎ মর্নিং ক্লাস ডেকেছেন। তবে কোনো তদন্ত দল আসেনি।

লিখিত অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, এ মাদ্রাসায় বর্তমানে উপবৃত্তিধারী ১৩৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা ২০১৬ সাল থেকে উপবৃত্তি পাচ্ছে না। ২০১৫ সালে শিক্ষার্থীদের নামে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা আসবে বলে সুপার মো. সামসুদ্দিন অভিভাবকদের মুঠোফোন নম্বর ও ৫০০ টাকা করে মোট ৭০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু সুপার সেসব নম্বর ব্যবহার না করে একটি কোম্পানির মুঠোফোন কোম্পানির ১৩৮টি সিম কার্ড কিনে গোপনে টাকা তুলে নিচ্ছেন। সুপার ২০১৬ সালে উপবৃত্তির ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪২০ টাকা তুলেছেন। ২০১৭ সালে তুলেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২১০ টাকা। এখন বাকি টাকা দেওয়ার সময় হয়েছে। সে টাকাও হাতিয়ে নেওয়ার তালে আছেন সুপার।

কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বলেন, চলতি বছর মাদ্রাসা থেকে নিয়মিত-অনিয়মিত ৩৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। ফরম পূরণের নাম করে তাদের কাছ থেকে সুপার সাড়ে ৩ হাজার করে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা তুলেছেন। অথচ বোর্ড-ফি দেড় হাজার টাকার কম।

মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. লোকমান বলেন, সুপার মো. সামসুদ্দিন তাঁকে মৌখিকভাবে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দিয়েছেন। বাস্তবে মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন নিজেই। তিনিই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফরম পূরণের অতিরিক্ত টাকাপয়সা উত্তোলন ও উপবৃত্তির টাকা লোপাট করেছেন। তাঁরা ১৯৯৯ সাল থেকে বিনা বেতনে এখানে পড়াচ্ছেন। সুপার বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির নামে তাঁদের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে টাকার বিনিময়ে ১৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের ১০ জন আছেন। একজন বেশি টাকা দিলে আগেরজনকে বাদ দিয়ে পরেরজনকে নেন।

স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল মহাজন বলেন, মাদ্রাসার মাঠ ভরাটের নামে ৮-১০ বার গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) বরাদ্দ হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। এ নিয়ে সুপারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

আলতুগাজী, মিতু বেগম ও মো. জামাল উদ্দিনসহ গ্রামের কয়েকজন বলেন, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সবাই সুপারের আত্মীয়। মাদ্রাসার নামে স্থানীয় জয়নাল আবেদীন ও আবদুল কাদের প্রায় ৫০ শতক জমি দান করেছেন। সে জমি থেকে সুপার তাঁর স্ত্রীর নামে ১২ শতক লিখিয়ে নিয়েছেন। এখানকার টাকা তুলে তিনি বহুতল ফাউন্ডেশনের সুরম্য ভবনের মালিক হয়েছেন।

শিক্ষক মো. সামসুদ্দিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে তিনি মাদ্রাসা ছেড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন কিংবা ফরম পূরণের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

মাদ্রাসাটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, মাদ্রাসার সব কাগজপত্র এখনো সামসুদ্দিনের কাছেই থাকে। তবে তিনি ২০১৬ সালে একটি পদত্যাগপত্রে তাঁর সই নিয়ে রেখেছেন।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাং সেলিম উদ্দিন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাকিরুল হক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিখিল চন্দ্র হালদার বলেন, একজন ব্যক্তির দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা বেআইনি। সেটি সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি। তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি