দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিবাহ-বিচ্ছেদ!

১১:৩৩ পূর্বাহ্ন | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭ আলোচিত বাংলাদেশ

রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার- ‘তালাক’ একটি সুনির্দিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া। যার অভিশাপে দেশের হাজারো পরিবার ভেসে গেছে কূল-কিনারাহীন দুঃখের সাগরে। আর এই দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয় সারাজীবন।

তালাক শব্দটি শুনতে একটু কেমন বিশ্রী মনে হয়। আমাদের সমাজে তালাকের বিপরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে কিছুটা শ্রুতিমধুর শব্দ ডিভোর্স (বিবাহ-বিচ্ছেদ) শব্দটি। ডিভোর্স শব্দটি শুনতে যতই মধুর হোক কিন্তু এর দ্বারা বোঝানো অর্থের ব্যাপ্তি মোটেই কম নয়। ধর্মীয়, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ডিভোর্সেরও বৈধতা রয়েছে। একজন স্বামী যেমন স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারেন তেমনি স্ত্রীও স্বামীকে ত্যাগ করতে পারেন।

তবে সকল ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট কতগুলো কারণ থাকতে হবে। সমগ্র দেশজুড়ে ডিভোর্স এর পরিমান ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় তা গোটা জাতির মাথা ব্যথা ও উদ্বেগের কারন হয়ে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর-দক্ষিণ) তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার। গতবছর এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ৬ হাজার। যা ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ৯ হাজার। এর আগে ২০১৪ সালে ৮ হাজার ২১৫টি, ২০১৩ সালে ৮ হাজার ২০১৪, ২০১২ সালে ৭ হাজার ৯৯৫, ২০১১ সালে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫ হাজার ৩২২ এবং ২০১০ সালে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার।

প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এই সংখ্যা। বর্তমানে রাজধানীতেই নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ৪৯ হাজার বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন। ঢাকা শহরের তুলনায় সারাদেশে এই চিত্র আরো ভয়াবহ। কেবল ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে। প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় বাড়ছে এই সংখ্যা। কারন হিসেবে পরকীয়া, যৌতুক প্রথা, মাদকাসক্তি সহ বিভিন্ন বিষয় চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর মেহতাব খানম বলেন, দুটি কারণে বিবাহ-বিচ্ছেদ বাড়ছে। প্রথমত, মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত হচ্ছে। তারা এখন অনেক সচেতন। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য না করে ডিভোর্সের পথ বেছে নিচ্ছেন। মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হওয়ায় আত্ম-অহঙ্কার বেড়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাঁধন মানতে নারাজ তারা। আছে অনেক ধনীর দুলালীর আত্ম-অহমিকাও। বাধাহীন জীবনে অনেক ক্ষেত্রে তারা জড়িয়ে পড়ছেন পরকীয়ায়। আসক্ত হচ্ছে নানা মাদকে।

দ্বিতীয়ত, মোবাইল কোম্পানিগুলোর নানা অফার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ফেসবুক এবং পর্নোগ্রাফির মতো সহজলভ্য উপাদান থেকে আকৃষ্ট হয়ে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা হারাচ্ছেন। ফলে বিয়ের মতো সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং নৈতিক বিষয়টি ছিন্ন করতে একটুও দ্বিধা করছেন না তারা।

মিরপুরের নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি মো. আমির হোসেন বলেন, বিয়ে বিচ্ছেদের হার প্রতিবছরই বাড়ছে। আর এই বিচ্ছেদের আবেদনের ৭০ ভাগই আসে নারীদের কাছ থেকে। এক্ষেত্রে একপাক্ষিক তালাকের আবেদনই বেশি। তবে সমঝোতার ভিত্তিতেও সম্পর্ক শেষ করছেন কোনো কোনো দম্পতি। এ ছাড়া পরে সালিশে কিছু সংসার টিকলেও, তার সংখ্যা নগণ্য।

স্বামী বা স্বামী পক্ষের যৌতুক দাবি, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, মাদকাসক্তি, পরকীয়া, দু’জনের জীবনযাপনে অমিল, সন্দেহপ্রবণতা, স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ না পাওয়া, স্ত্রীর অবাধ্য হওয়া, ফেইসবুক ও টুইটারে মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক সম্পর্কে জড়ানো এবং ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী জীবনযাপন না করায় তালাকের ঘটনা ঘটছে।

তবে বিবাহ বিচ্ছেদের নেতিবাচক পরিণতির প্রধান শিকার হন সন্তানেরা। তারা বেড়ে ওঠে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির’ সন্তান হিসেবে। যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। তারা এক ধরনের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে’ ভোগে।  মনোচিকিত্‍সকরা মনে করেন, ‘‘সন্তানরা যদি বাবা মায়ের স্বাভাবিক সঙ্গ এবং ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। তারা সমাজ, পরিবারকে নেতিবাচক হিসেবেই দেখে। তাদের মধ্যে জীবন বিমুখতা তৈরি হয়, ভবিষ্যতে যে পরিণতি হয় তা খুবই দূর্বিসহ ও ভয়াবহ।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি