হোগলা পাতায় স্বচ্ছলতা

৯:০৭ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭ ইতিহাস-ঐতিহ্য, দেশের খবর

কৃষ্ণ কর্মকার, বাউফল প্রতিনিধি:
একসময় দেশে গ্রামাঞ্চলের প্রায় পরিবারের বিছানার নিচে ব্যবহার ও ধানের গোলা তৈরির জন্য হোগলা পাতা দিয়ে তৈরী এক প্রকার চাটইর বেশ কদর ছিল। এ কারনে গ্রামের প্রায়ই বাড়িতে বাড়িতে হোগলা পাতা দিয়ে এই চাটই বোনার প্রচলন ছিল। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে ওই হোগলার ব্যবহার অনেকাংশে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

আশার কথা হলো বেশ কয়েক বছর ধরে এই হোগলা পাতায় স্বচ্ছলতা ফিরেছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার প্রান্তি নারীদের। ৯০ দশকের পর উপজেলার বানিজ্যিক বন্দর কালাইয়া লঞ্চঘাট, ধুলিয়া লঞ্চঘাট, কেশবপুর এলাকার তেতুলিয়ানদী তীরবর্তী বশে কয়েকটি বরফকল ও মাছের আড়ত গড়ে উঠায় এ শিল্প আবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

হোগলা শিল্পকে ঘিরে উপজেলার হাজার হাজার পরিবারের নারীরা ফিরেছে স্বচ্ছলতায়। পুঁজি কম এবং সংসারের কাজের ফাঁকে ঘরের নারীরাই এ কাজে বেশি শ্রম দিয়ে স্বাবলম্বী করতে বেশি ভূমিকা রাখছে। তারা হোগলা তৈরি করে জীবনযাত্রার মান উন্নততর করছে। বাউফলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র কালাইয়া বন্দরের লঞ্চঘাট এলাকায় প্রায় ৩০০ পরিবার বসবাস করছে। এদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র শ্রেণির।

বাড়ির ভিটা ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই। অপরদিকে ব্যবসা করার মতো পুঁজিও নেই। প্রায় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অন্যের জমি চাষ কিংবা দিনমজুর হিসেবে কাজ করছে। সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, লঞ্চঘাট এলাকার বাড়িতে বাড়িতে শতাধিক নারীরা হোগলা পাতা বুনছে। কথা হয় বেপাড়ি বাড়ির পুস্পরানী, মালতী রানী ও আড়তী রানীর সঙ্গে, তারা বলেন, দির্ঘ বছর ধরে তারা হোগলা পাতা দিয়ে চাটই তৈরী করছেন। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা এ চাটই তৈরী করে থাকেন। দৈনিক এক জন নারী দশ থেকে বারোটি বুনতে পাড়ে।

একটি চাটইতে খরচ হয় ১০টাকা। বিক্রি করা যায় ২০টাকা করে। দৈনিক একজন নারী ১০০ থেকে ১২০টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। তারা জানান, অধিকাংশ হোগলাই বিক্রি হয় স্থানীয় বরফকল ও মাছের আড়তদারদের কাছে। পারিবারিকভাবে হোগলার ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে।
একই গ্রামের হোগলা শিল্পী শামীমা বলেন, আমাদের পুঁজি কম। স্থানীয় পাইকারদের থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে হোগলা তৈরি করে দিচ্ছি। এতে লাভ কম হয়। ওই গ্রামের দেলোয়ার হোসেন তার পারিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ির উঠানে বসে হোগলা তৈরি করছিলেন।

সেখানে কথা হয় রাবেয়া, আকলিমা, আহিলা ও বিউটি বেগমের সঙ্গে। তারা জানান, পারিবারিকভাবেই তারা এ কাজটির সঙ্গে জড়িত। কেউ মায়ের হাত ধরে, কেউবা শাশুড়ির কাছ থেকে হোগলা তৈরি করতে শিখেছেন। এই হোগলা বাউফল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

হোগলা শিল্পীরা জানান, পুঁজির অভাবে পাতা গুদামজাত করতে না পারার কারণে মধ্যস্বত্বভোগী একশ্রেণির মহাজন পাতা কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। যার কারণে খোদ শিল্পীদের কেবল মজুরি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তারা অভিযোগ করেন, তাদের ওই কাজে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই সহায়তা দিচ্ছে না।

কোনো ব্যাংক বা এনজিও ঋণ দিচ্ছে না। তাদের ধারণা, আমাদের পুঁজি নেই, আমরা সমিতির কিস্তি পরিশোধ করতে পারবো না। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, গ্রামীণ এ শিল্পের সঙ্গে অনেক পরিবারের রুটি-রুজি জড়িত। গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে তথা জাতীয় অর্থনীতিতে সক্রিয়। ভূমিকা রাখার জন্য এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। আর তাই সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে।(সুমন)