• আজ ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ভাঙছে নদী, জাগছে চর বাড়াচ্ছে “বাংলাদেশের আয়তন”


মো: ইমাম উদ্দিন সুমন, স্টাফ রিপোর্টার : নদী থেকে জেগে ওঠা চর বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের আয়তন। তবে যখন জাগছে চর, তখন আবার ভাঙছেও। শুধু সুবর্ণচর নয়; উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীর সর্বত্রই চলছে এই ভাঙাগড়া। তবে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা ভূমির পরিমাণ ভাঙনের তুলনায় বেশি।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) হিসাব অনুযায়ী, নোয়াখালীতে ৭০ বছরে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয় হলেও একই সময়ে নতুন করে এক হাজার বর্গকিলোমিটার যুক্ত হয়েছে। নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইডিপি) গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রমে দেখা গেছে, ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নোয়াখালী উপকূলে ৫৭৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি নদী থেকে জেগে উঠেছে। আবার একই সময়ে জেগে ওঠা ভূমির ১৬২ বর্গকিলোমিটার নদীতে বিলীন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে টিকেছে ৪১১ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন প্রান্তে জেগে ওঠা চরের পরিমাণ অন্তত ২০ বর্গকিলোমিটার বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পরিচালিত মেঘনা মোহনা সমীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া যায়। আশির দশকের শেষভাগ থেকে জেগে ওঠা চরভূমির পরিমাণ বাড়ছে। পাউবো সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে, নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় ভূমিপ্রাপ্তির হারই বেশি।

নদীর এই ভাঙাগড়ায় যে হারায়, তার হাহাকার ছাড়া কিছুই করার থাকে না। সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের নোয়াখালী জেলা শাখার আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা তারকেশ্বর দেবনাথ নান্টু বলেন, ভাঙা-গড়া তো প্রকৃতির নিয়ম। চাইলেও সব সময় প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা জেগে ওঠা চরে পুরনো অবস্থা ফিরে পায় না। আমাদের নদীশাসন, জেগে ওঠা চরে বসতি স্থাপন নিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি নীতি থাকা প্রয়োজন। নদী ভাঙলে নদীপাড়ের মানুষের কিছুই থাকে না; নদী জনপদেরও কোনো চিহ্ন রেখে যায় না।

নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়েছে নোয়াখালীর আদি শহরটি। এখন যেখানে নোয়াখালী জেলা শহরের অবস্থান, সেটি নোয়াখালী নয়; মাইজদী। নোয়াখালী জেলা শহরের মাইজদীতে স্থানান্তরের ইতিহাস বলতে গিয়ে গবেষক মাহমুদুল হক ফয়েজ বলেন, একদা সমতট নামে পরিচিত এই জনপদে পরবর্তীকালে ভুলুয়া নামে একটি পরগনা প্রতিষ্ঠিত হয়। ভুলুয়া পরগনার ভুলুয়া বন্দরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়। নোয়াখালীর ইতিহাস-ঐতিহ্য, নদীভাঙন ও কৃষি-পরিবেশ নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাত এ গবেষক জানান, বন্যা থেকে এখানকার কৃষি-অঞ্চলকে রক্ষার জন্য কুমিল্লার ফৌজদারের তত্ত্বাবধানে ডাকাতিয়া থেকে রামগঞ্জ-সোনাইমুড়ি-চৌমুহনীর মধ্য দিয়ে একটি খাল কেটে বন্যার পানি বঙ্গোপসাগরের মেঘনা ও ফেনী নদীর সঙ্গমস্থলে নিস্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। খালটি খননের পর ভুলুয়ার নতুন নাম হলো ‘নোয়াখালী’ অর্থাৎ নতুন খাল। আরবীয়, ইংরেজ ও গ্রিক সভ্যতার মিশ্রণে গড়ে ওঠা নোয়াখালী শহর ভাঙনকবলিত হয় উনিশ শতকের শুরুতে। মাইলের পর মাইল সেই ঐতিহ্যবাহী জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, আজকের মাইজদী থেকে পুরনো শহর ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। যেখানে এখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানকার একটি ইউনিয়নের নাম এখনও নোয়াখালী ইউনিয়ন। নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার এক বছর পর জেলা শহর স্থানান্তর করা হয় মাইজদী মৌজায়।

সুবর্ণচরের জেগে ওঠা এবং নোয়াখালীর জেলা শহর বিলীন হওয়ার ইতিহাস কাছাকাছি বলে ধারণা সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমানের। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক এই সচিবের গ্রামের বাড়ি সুবর্ণচরের পূর্বচরবাটা গ্রামে। ১৯৫৯ সালের দিকে এখানে যখন তাদের বাড়ি করা হয়, তখনও তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীতে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতে দেখেছেন তিনি। সন্দ্বীপের চরবদু গ্রামের নানাবাড়িতে জন্ম আতাউর রহমানের। প্রথমে তারা চলে আসেন হাতিয়ায়। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। আতাউর রহমান জানান, সুবর্ণচরের আদি বাসিন্দাদের অধিকাংশই চরবদু থেকে এসেছিলেন। ১৯৭০ সালের পর থেকে চরবাটার যেখানটায় তাদের বাড়ি, তার দক্ষিণ দিকে চর জাগতে থাকে। সেই চর এখন ঠেকেছে অন্তত ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। যে চরে নতুন করে হাতিয়ায় ভাঙনের শিকার হওয়া মানুষ এসে বসত গড়েছেন। এখন ৪৭ বছর আগে জেগে ওঠা সেই চরে আবার ভাঙন দেখা দিয়েছে।

মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। গত দুই বছরে ইউনিয়ন দুটির কমপক্ষে তিন হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলে দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তারা জানান, গত দুই বছরে চরক্লার্ক ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ হেমায়েতপুর (আংশিক), চর বায়েজিদ মৌজা, চর খন্দকার, আলেমপুর, সৈয়দপুর, চর নোমান সমাজ ও চর মোজাম্মেল মৌজাসহ অন্তত ১০টি এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটামাটি হারিয়েছে তিন হাজারের মতো পরিবার। একই সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের (সিডিএসপি) সাত-আট কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও বন বিভাগের রোপণ করা বিভিন্ন জাতের নতুন গাছ। মাত্র দিন ১৫ আগে চরক্লার্ক ইউনিয়নের চর খন্দকারে সাবেক ২ নম্বর কাটাখালি স্লুইস গেটটি বিলীন হয়েছে। ফলে জোয়ারের সময় পানি দ্রুত উত্তরদিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং সেই দিককার সোলেমান বাজার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছে ওই এলাকার হাজারো পরিবারের সদস্যরা।

ভাঙনের শিকার চর খন্দকার সমাজের অলি উদ্দিন বলেন, ভাঙনের কবলে পড়ে দক্ষিণ হাতিয়া থেকে ২০০১ সালে এখানে এসে বাগান কেটে বসতি স্থাপন করেছিলেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বন্দোবস্তের মাধ্যমে স্থায়ী হন। বন্দোবস্ত পাওয়া এক দাগ মানে দেড় একর জমিতে সবজি ও মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে তার ফসলি জমিটুকুর সঙ্গে বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে নদী থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে খাস জমিতে গড়া তাঁবুতে থাকছেন। একই সমাজের গৃহহীন আবদুর রব আবারও গৃহহীন হয়েছেন ভাঙনে। এখন বেড়িবাঁধের যেখানটায় বাস করছেন, সেখান থেকে ৫০০ গজ দূরে তার বাড়ি ছিল। কিন্তু এক বছর আগে তা বিলীন হয়ে গেছে।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনামুল হক এবং চরক্লার্ক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল বাশার বলেন, ভাঙনের চিত্র উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। স্থানীয় এমপিও বিষয়টি অবগত আছেন। তারা জানান, সরকারিভাবে ভাঙনে নিঃস্বদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা নেই। নেই ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা। এমনকি ভাঙনে কত মানুষ সর্বহারা হয়েছে, তারও কোনো তালিকা করা হচ্ছে না।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু ওয়াদুদ বলেন, মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক ইউনিয়নের ভাঙন সম্পর্কে তারা জানেন। তবে ভাঙনে এ পর্যন্ত কত পরিবার গৃহহীন হয়েছে, তার কোনো তালিকা এখনও করা হয়নি।

দুই ইউনিয়নে ভাঙনে বসত-ভিটা ও বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হওয়ার বিষয়টি দফায় দফায় বিদেশি দাতা, সিডিএসপি ও বোর্ডের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘটনাস্থলে এনে দেখানো হয়েছে বলে জানালেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নোয়াখালী জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ অঞ্চলের ভাঙন রোধে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দরকার।রাজীব নূর ও জাহিদুর রহমান,(নোয়াখালী):

◷ ৪:৫৭ অপরাহ্ন ৷ শুক্রবার, ডিসেম্বর ১, ২০১৭ ইতিহাস-ঐতিহ্য, চট্টগ্রাম, দেশের খবর