‘শোক প্রকাশ’ লেখার এত জায়গা কোথায়!


পলাশ মল্লিক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট- যে মানুষটিকে ভালবাসা লোকের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে লেখার জায়গা কোথায়? তাকে নিয়ে লিখতে হলে তো লেখার ধারণ ক্ষমতার মতো জায়গা থাকতে হবে। যে মানুষটি স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে লাখো যুবককে তাকে নিয়ে লেখার লাইনতো সীমাবন্ধ স্থানে থাকার কথা নয়। তার প্রতি মানুষের যে ভালবাসা আর তার মৃত্যুতে মানুষ যে কতটা শোকাহত তা প্রকাশ করার জন্য জায়গাটা কোথায়?

তিনি তো অল্প সময়ে জয় করে নিয়েছে অগনিত মানুষের মন। আর তাইতো দেশের কোটি কোটি মানুষের মনের গভীর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস আর সেইসাথে দুচোখ থেকে বেড়িয়েছে জল। কারণ তিনি তো আর কেউ নন তিনি তো স্বপ্ন দেখা মানুষের আনিসুল, তিনি তো নতুন ঢাকা গড়ার কারিগর আনিসুল, তিনি তো সবুজ ঢাকা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা আনিসুল।

বনানীর ৮০ নাম্বার বাড়ির সামনে যে শোক বই রাখা হয়েছে তার কয়েকটি তো বেশ আগেই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। প্রিয় মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে লিখে যাচ্ছেন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কর্মজীবি মানুষসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। শুধু ঢাকা নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছে প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করে শোক বইটিতে কয়েকটি শব্দ লিখতে। একটা মানুষকে মানুষ কতটা ভালবাসেন তা শোক বইতে লেখা শব্দ গুলোই বলে দিচ্ছে।

যাকে স্মরণ করে লিখছে তিনি কি জানতেন কতজন মানুষের মাঝে তিনি আর্দশের প্রতিমূর্তি হয়ে বেঁচে ছিলেন? তিনি কি জানতে পেরেছিলেন তার মৃত্যুতে কত মানুষ নীরবে দুচোখ দিয়ে কয়েক ফোটা জল ছেড়ে দিবেন? আমার মনে হয় না তিনি জানতেন।

বনানীর যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন তা আগের জায়গাতেই আছে, বাড়ির কোন পরিবর্তন হয়নি। বাড়ির বাহিরের সার্বিক চেহারাটারও কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে কোন কিছুর পরিবর্তন না হলেও বাড়িটির দিকে তাকালে মনে যে আলোয় আলোকিত ছিল বাড়িটির সে আলোটা নিভে গেছে। বাড়িটির দিকে তাকালে মনে হয় একটা স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। কারণ এ বাড়িতে বসে বসেই হয়তো চিন্তা করতেন কিভাবে ঢাকাকে আধুনিক শহর করা যায়। কি করে নাগরিকদের সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা প্রদান করা যায়। কি করে উন্নত দেশের শহর গুলোর মতো ঢাকাকে সাঁজানো যায়।

তার প্রতি ভালবাসা থেকেই শোক বইটিতে লিখে যাচ্ছেন সবাই। ফেনীর নাঙ্গম উদ্দিন বিজয় লিখেছেন, আমার দেখা সবচেয়ে ভাল ও সঠিক কথা বলা একজন মানুষ। তার প্রত্যেকটা কথায় যে কত কিছু শেখার আছে তা বলে বুঝানো সম্ভব না। তিনি মাকে ভালবাসতেন আর আমি আশা করি এই ভালবাসা তার প্রতি আল্লাহকেও ভালবাসতে বাধ্য করবে। আমার প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। অনেক অনেক ভালবাসা, আর পরলোকে জান্নাত লাভ করুন এটাই চাই।

বরিশালের গৌরনদীর মিলন ভূইয়া লিখেছেন, তোমার মতো মেয়র আর পাব কিনা বলতে পারিনা তবে তোমাকে ভুলতে পারবো না।

বনানী বিদ্যানিকেতনের মারিয়া, ফারিয়া, মুক্তি, ফারিন, আজরিন, সাফা লিখেছেন, স্যার, আপনার হাসিটা অনেক মায়াবী এবং অসম্ভব সুন্দর। আপনি দলমত নির্বিশেষে সকলের মন জয় করে নিয়েছিলেন। কিশোর- কিশোরীদের মাঝে অনেক প্রিয়। প্রার্থনা করি, আল্লাহ আপনাকে জা্ন্নাতবাসী করুক। আপনার অবদান আমরা ভুলবো না।

উত্তরার মেহেধী হাসান লিখেছেন, আনিসুল হক স্যার আপনি সারাজীবন আমাদের ছাত্রদের মনে একজন রোল মডেল হয়ে থাকবেন। আপনার কথা, বক্তব্য এখনো বীনা হয়ে বাঁজে। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসী করুন।

গুলশানে প্রনব বৈদ্য লিখেছেন, স্যার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আজকাল আর তেমন পছন্দ করেন না তার কৃতকর্মের জন্য কিন্তু আপনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, আপনি দেখিয়েছেন সৎ ইচ্ছা থাকলে মানুষের জন্য কাজ করা সম্ভব। সালাম জানাই আপনাকে।

ঢাকা উত্তর ১৬, ১৭, ১৮ সিটি কাউন্সিলর শাহনাজ পারভিন মিতু লিখেছেন, স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল কাউন্সিলর জীবনের আড়াইটি বছর। নগর পিতা আনিসুল হকের সাথে একসাথে কাজ করেছি। তিনি আমাদের পিতার মতো স্নেহ করে সৎ পথে চলে কাজ করার কথা বলেছেন। আমরা পিতাকে হারালাম। এমনি হাজারো লেখনির মধ্যে দিয়ে আনিসুল হককে স্মরন করেছেন সবাই।

১৯৫২ সালে চট্রগ্রামের বিভাগের নোয়াখালি জেলার কোম্পানীগঞ্জের সাধারন পরিবারে জন্ম নেয়া আনিসুল হক যে মানুষের মনে এতটা জায়গা করে নিবে তা কে জানতো? জীবনে অনেক ধাপ অতিক্রম করে যখন তিনি ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন অণেকেই ধারণা করে ছিলেন বর্তমান রাজনীতির মারপ্যাচে তিনি হয়তো কিছু করে দেখাতে পারবেন না।

কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন ইচ্ছে থাকলে আর স্বপ্ন দেখতে জানলে সবই সম্ভব। তিনি ঢাকার চিত্র অনেকটাই পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছেন। অনেককেই বলতে শুনেছি তিনিই পারবেন ঢাকাকে আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে। যোগ্য লোককেই মেয়র করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, আনিসুল হকের জন্ম চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালি জেলার কোম্পানীগঞ্জে ১৯৫২ সালে। তার শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটে তার নানাবাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তার উপস্থাপনায় ‘আনন্দমেলা’ ও ‘অন্তরালে’ অনুষ্ঠান দুটি জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠানও উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আনিসুল হক আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদের জন্য মনোনয়ন লাভ করেন এবং বিজয়ী হন।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র। শনিবার দুপুর ১:০০টায় বাংলাদেশ বিমান এয়ালায়েন্সের ০০২ বিমানের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকা আনা হয়।

এরপরে শনিবার বাদ আসর আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজা শেষে বিকাল ৫টার দিকে বনানী কবরস্থানে ব্যক্তি জীবনে সফল ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা আনিসুল হকের দাফন সম্পন্ন হয়।

সময়ের কণ্ঠস্বর/রবি

◷ ৬:১০ অপরাহ্ন ৷ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৫, ২০১৭ আলোচিত বাংলাদেশ, গুণীজন সংবাদ