ছাগলনাইয়ায় তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ

৮:০২ অপরাহ্ন | মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৫, ২০১৭ আলোচিত, দেশের খবর

আবদুল্লাহ রিয়েল,ফেনী: রোগী মৃত্যুর অভিযোগ করেছে তাদের স্বজনরা। ভুক্তভোগী রোগীর আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নানা অব্যবস্থাপনা, প্যাথলজি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমস্যা, সর্বোপরি অদক্ষ ডাক্তার ও নার্সদের ভুল চিকিৎসা রোগী মৃত্যুর মুল কারন।

উন্নত সেবার মান নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে এ ধরনের মনোহারী ও চটকদার বিজ্ঞাপন দিলেও মুলত রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ভুয়া বিল তৈরী করে গলাকাটা টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খালদখল, সড়ক ও জনপথের রাস্তা দখলের কারনে বিভিন্ন সময়ে যাত্রীরা দূর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে।

তা ছাড়া চিকিসক ও নার্সদের অনৈতিক সম্পর্কের কথাও লোকমুখে মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে নানা সময়। অনৈতিক সম্পর্কের দায়ে একজন ডাক্তারকে হাসপাতাল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ভুক্তভোগী বাঁশপাড়া গ্রামের কপিল উদ্দিন ভূঞা জানান, ডেলিভারীর নির্দিষ্ট তারিখের আগেই হাসপাতালের অদক্ষ ডাক্তার ও তাদের আলট্রাসনোগ্রামের ভুল রিপোর্টের কারনে তার নবজাতক সন্তানটি মারা যায়। কপিল উদ্দিন বলেন, ‘সিজারের আগে আমার বাচ্চার ওজন তারা বলে ২কেজি ৬শ গ্রাম কিন্তু সিজারের পরে ওজন করা হলে বাচ্চার ওজন হয় ১কেজি ৬শ গ্রাম।

অবশেষে ডেলিভারীর ৯দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার নবজাতক ছেলেটি মারা যায়।’ কপিল আরো জানান, তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালের মালিক শিল্পপতি এমএ কাসেম আমার ছেলের মৃত্যুর পর বলে তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় নাই। হাসপাতালের নার্স থেকে শুরু করে ডাক্তার, কর্মচারী, কর্মকর্তা সকলের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ বলে জানায় ভুক্তভোগী কপিল। এছাড়া তাদের কোন উন্নতমানের চিকিৎসার কোন যন্ত্রপাতি নেই। সে তার নবজাতক শিশুর মৃত্যুর জন্য অবিলম্বে তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতাল বন্ধ ঘোষনা ও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

আরেক ভুক্তভোগী উপজেলার পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামের রাবেয়া বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন ‘আমার স্বামী ফয়েজ আহাম্মদের হার্নিয়া অপারেশনের জন্য তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভুল চিকিৎসায় আমার স্বামী মারা যায়। আমার চার ছেলে সবাই প্রবাসে থাকার কারনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেঁচে যায়। তারা দেশে থাকলে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হতো।

অপারেশনের আগে আমার স্বামী হাসি মুখে কথা বলে। অপারেশনের সময় আমার স্বামীর ব্লাড প্রেশার ২০০ এর উপরে ছিলো যা লোকমুখে শুনলাম। ওইদিন রাত ১১টার সময় তারা তাদের গাড়ীতে করে আমার স্বামীর লাশ বাড়ীতে পৌঁছে দেয়। আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিচার চাই’

ভুক্তভোগী উত্তর আঁধারমানিক গ্রামের সাহাদাত হোসেন জানান, তার স্ত্রী আয়েশা আক্তারের (২০) জ্বরের সাথে খুব কাশি ছিল। এ অবস্থায় তাকে তারেক মেমোরিয়ালে ডাক্তার দেখানো হয়। তখন ডাক্তার বলে তাকে হাই এন্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়া যাবে না। দিলে বাচ্চার ক্ষতি হবে। সিজারের পরে হাই এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিলে কাশি ভালো হয়ে যাবে। ঘন ঘন কাশির মধ্যে তারা আমার স্ত্রীর সিজারের সিদ্ধান্ত নেয়।

আমাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, আমরা বোর্ড মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনার স্ত্রীর কোন সমস্যা হবে না। ডেলিভারীর দিন দুপুর ২টায় অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে রাত ১২টার পরেও আমার স্ত্রীকে অপারেশন থিয়েটার থেকে নিয়ে না আসায় আমার শোর-চিৎকারে তাকে বের করা আনা হয়। জ্ঞান ফিরে আসার পর আমার স্ত্রী জানায়, সিজারের সময় তার হঠাৎ হুশ ফিরে আসে তখন ডাক্তার পুনরায় ইনজেকশন পুশ করে। অপারেশনের দিন রাত ১টার দিকে আমার স্ত্রী কফের সাথে রক্ত বমি হচ্ছিল বার বার।

তখন অনেক ডাকাডাকি করা হলেও ওই সময় হাসপাতালের একজন লোককেও খুঁজে পাওয়া যায় নাই। জানা যায়, রাত ১১টার পর ওই হাসপাতালে ঢোল পিটিয়ে ওয়ার্ড বয়, নার্স, ডাক্তার কাউকে পাওয়া যায় না। সবাই এক সাথে আনন্দ ফুর্তি করে থাকে। পরেরদিন ডাক্তারের সাথে দেখা হলে ডাক্তার বলে আমাদের কাছে কোন ম্যাজিক নাই। আপনার স্ত্রী ভাল হতে সময় লাগবে। তাদের ভুল চিকিৎসার কারনে একাধারে ৪দিন নড়াচড়া করতে পারে নাই আমার স্ত্রী। তাদের হাসপাতালে ২দিনে ২৫ হাজার টাকা বিল করা হয়।

এছাড়া আমি বেশির ভাগ ওষুধ বাইর থেকে নিয়ে আসি। আমি বললাম যে আপনাদের হাসপাতালে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে নাকি ৩০% ছাড় দেওয়া হয়।

৩০% ছাড় দেওয়ার পরও এতটাকা বিল কিভাবে হয়! তখন তারা উত্তর দে এটা হলো হাসপাতালের সিস্টেম। আপনাদেরকে সম্পূর্ন টাকা পরিশোধ করতে হবে। আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে সিজারের ২দিন পর তাকে ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে ভর্তি করি। ডায়াবেটিস হাসপাতালের ডাক্তার জানায়, আমার স্ত্রীর যক্ষা হয়েছে কিন্তু তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালের ডাক্তারা কোন রোগই ধরতে পারে নাই। অপারেশনের ৪দিনের মাথায় আমার স্ত্রী ডায়াবেটিস হাসপাতালে মারা যায়।

যাদের কারনে আমার সন্তান মাতৃহারা ও আমি নিঃস্ব, আমি তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করি সরকারের কাছে।’ দক্ষিণ সতর গ্রামের মোঃ হানিফের স্ত্রী শিউলি আক্তার জানান, রক্তশূন্যতার কারনে জরুরী ভিত্তিতে তারেক মেমোরিয়ালে ভর্তি হই। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে এক ব্যাগ রক্ত আমাকে দেয়া হয়। রক্তদাতারা রক্ত দিয়ে চলে গেলে পরবর্তীতে হাসপাতালের লোকজন রক্তের জন্য এক্সট্রা ৬শ টাকা দাবী করে। আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে ফোন করলে তারা বলে আমরা বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে থাকি।

এ রকম আরো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালের বিরুদ্ধে। তবে অনেকে ভয়ে অনেককে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলেনা।

এসব অভিযোগ স্তুপের ব্যাপারে তারেক মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোশারাফ হোসেন জানান, সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে আমরা সীমানা প্রাচীর নির্মান করি নাই। খাল দখল করে কালভার্ট নির্মান করার অনুমতি আছে কিনা আমার জানা নেই।

বাঁশপাড়া গ্রামের কপিল উদ্দিন ভূঁঞার নবজাতক শিশু ও উত্তর আঁধার মানিক গ্রামের সাহাদাতের স্ত্রীর মৃত্যুর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই তিনি। পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামের ফয়েজ আহাম্মদের হার্নিয়া অপারেশনের সময় মৃত্যু হলে তার উত্তরে মোশারফ জানান, অপারেশনের সময় যে কোন রোগীর মৃত্যু হতে পারে এটাই স্বাভাবিক।

এ ব্যাপারে ফেনীর সিভিল সার্জন ডাঃ হাসান শাহরিয়ার কবির জানান,‘ অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন ও সজাগ রয়েছে। যত ক্ষমতাশালীই হোক অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা।