মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আগুনমুখা নদীর পাড়

২:৫৩ অপরাহ্ন | সোমবার, জুলাই ২৩, ২০১৮ দেশের খবর, বরিশাল

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: বর্ষা মৌসুম এলেই বাড়ে আগুনমুখায় স্রোত। আর তখন বাড়ে এর ভাঙনের তীব্রতা। ফলে প্রতিবছর ভাংগনে কমছে এর আশেপাশের ভূখন্ডের আয়তন। ভিটেবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নদী পাড়ের মানুষ হচ্ছে ভূমিহীন, নি:স্ব। এমন প্রতিকূলতা কাটিয়ে তারা যখন পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে তখন সব হারিয়ে আবারও হচ্ছে সর্বশান্ত। এরপরেও যারা টিকে আছে, তারা আবার বেড়িবাঁধ বিলীন হওয়ায় জোয়ারে ডুবছে আর ভাটায় ভাসছে। নদী ভাংগনের শিকার এসব মানুষের অভিযোগ, প্রতিনিয়ত তাদের আর্তনাদে রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসছে না।

ভাঙন কবলিত পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উত্তর চালিতাবুনিয়া, মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা ও গোলবুনিয়া গ্রামে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। একসময় এখানে ছিল অসংখ্য বসতি। ছিল মানুষের কোলাহল, আনন্দ উৎসব। অথচ দৃশ্যপট তার উল্টো। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। সবই কেড়ে নিয়েছে খর¯্রােতা আগুনমুখা নদী। অনেকেই হয়েছেন নি:স্ব। কেউ সর্বস্ব খুইয়ে হয়েছেন পথের ভিখারি। জমি-জমার মালিক একরাতেই হয়ে গেছেন দিনমজুর। এদের মধ্যে কেউ উঁচু জায়গায় গিয়ে বসতি গড়েছেন। অনেকে নিজ জন্মভূমি ছেড়ে হয়েছেন দেশান্তরী।

স্থানীয়রা জানায়, আগুনমুখা নদীর ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইউনিয়নের উত্তর চালিতাবুনিয়া, মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা ও গোলবুনিয়া গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার বসত ভিটে হারিয়েছে। এ ক’দিনে ওইসব গ্রামের পাঁচ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাই জোয়ারের সময় গ্রামগুলোর বসত বাড়িঘর ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এখন ভাঙনের মুখে রয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নদী তীরবর্তী মানুষগুলো রাত কাটাচ্ছে নির্ঘুম। উঁচু জাগায় বাড়ীঘর সরিয়ে নিয়েছে অনেকেই। যেকোন মুহূর্তে নদীতে গ্রাস করে নিতে পারে মধ্য চালিতাবুনিয়া গ্রামের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রটি। স্থানীয়রা বলছে, অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে এই চারটি গ্রাম হারিয়ে যাবে।

ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন উত্তর চালিতাবুনিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র জেলে দুদা মুফতির পরিবার। তার স্ত্রী পলি বেগম (৪০) জানান, ছেলে-মেয়েসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার তার। এর আগেও দুইবার ভাঙনে তার ভিটে-বাড়ি বিলীন হয়েছে। নতুন করে বাচার স্বপ্ন শুরু করতে না করতেই আবারও ভাঙনের মুখে পড়েছেন তানা। পলি বেগম আরো জানান, দিনে যখন জোয়ার আসে, তখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিবাধের উপড় আশ্রয় নেন। আবার ভাটায় ঘরে আসেন। রাত্রে জোয়ারের সময় তাদেও কাটে র্নিঘুম রাত। একই অবস্থা পলি বেগমের প্রতিবেশী আলমগীর মুন্সির (৬৫)। এক সপ্তাহ আগে তার ভিটেবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন ঝুঁপরি ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন।

চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, ১৫ দিনে পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং ৩০টি পরিবারের বাড়িঘরসহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাই অচিরেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আমজেদ হোসেন বলেন, বেড়িবাঁধ না থাকায় দুই সপ্তাহে চারটি গ্রামে জোয়ারের পানি উঠে ২০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা নিমজ্জিত হয়ে আছে। এরমধ্যে ১০ হেক্টর জমির বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়া সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের বলেন, চালিতাবুনিয়ার বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কথা জেনেছি। বর্তমানে কোন বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ না পেলে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছেনা। অন্যান্য রাজস্ব খাতে প্রস্তাব দিব। যদি বরাদ্দ হয়, কাজ হবে।

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছি। তারা পদক্ষেপ নিবে।