সংবাদ শিরোনাম
  • আজ ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

অ্যানি ওক্লি : আমেরিকার প্রথম ‘নারী সুপারস্টার’

১২:২৪ অপরাহ্ণ | সোমবার, আগস্ট ১৩, ২০১৮ তথ্য জাদুঘর, ফিচার

আরেফিন শিমন, কন্ট্রিবিউটর, সময়ের কণ্ঠস্বর :: আমরা একটুতেই হতাশ হয়ে যাই। সব কিছু শেষ ভেবে নিজের অজান্তেই হারিয়ে যাই অতল গহ্বরে। একটা অন্যরকমের ভয় যেন তাড়া করে ফেরে সব সময়। এই ভয়টা পাওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু ভয় পেয়ে চুপ করে থেকে নিজের জীবনকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়াটাই সব চেয়ে বড় অন্যায়। এর চেয়ে বরং ভয় না পেয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে, নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। আবার নতুন উদ্যমে সব শুরু করতে হবে।

বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী থেকে আমরা এসবই শিখতে পাই। আজ তেমনি একজন হার না মানা নারীর গল্প আপনাদের জানাবো। তিনি হলেন ‘আমেরিকার প্রথম নারী সুপারস্টার’ অ্যানি ওক্লি। আজ তার জন্মদিন। তাকে ঘিরেই সময়ের কণ্ঠস্বরের বিশেষ এই লেখা-

অ্যানি ওক্লি আমেরিকার ওহিও এর ডার্ক কাউন্টির একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ১৮৬০ সালের ১৩ই আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা জ্যাকোব মুসা ও মা সুসান ওয়াইসি মুসার সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তার যখন ছয় বছর বয়স, তখন তার বাবা জ্যাকোব মুসা নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা আরেকটি বিয়ে করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন পিছুই ছাড়ছিল না। অ্যানির দ্বিতীয় বাবা ড্যানিয়েল ব্রুম্বাও কয়েক বছর পর মারা যান। ফলে পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায় ছোটবেলাতেই।

সাত সন্তানের লালনপালন একা মায়ের পক্ষে খুবই কষ্টকর ছিল। তাই ১৮৭০ সালে বড় বোন সারাহ এর সাথে অ্যানি ওক্লি কে ডার্ক কাউন্টির একটি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তারা হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ও তার স্ত্রীর সাথে কাজ করা শুরু করেন। শিখে ফেলেন সেলাই আর সাজসজ্জার কাজও। শুধু কাজ করলেই তো চলবে না, পড়াশুনাও করতে হবে এটা ভেবে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট স্থানীয় একটি পরিবারের বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। এই শর্তে যে তাদের নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চার দেখাশুনা করবে অ্যানি আর এর বিনিময়ে সে পড়াশুনা করবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আরেক বিপদে পড়লেন তিনি। তাকে অনেক মারধোর করা হত, সেই সাথে ভারি কাজ করতে বলা হত। অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে একদিন তিনি পালিয়ে গেলেন সেই বাসা থেকে।

১৮৭৪ সালে তার মা তৃতীয় বিয়ে করলেন। কিন্তু ভাগ্য এবারেও খারাপ। বাবা মার পক্ষে পুরো পরিবার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। অ্যানি ওক্লি তাই বাবা মাকে সাহায্য করতে কাজে নেমে গেলেন।

বাবার রাইফেল নিয়ে তিনি শিকারে বেরিয়ে পরতেন। যা তিনি বিভিন্ন দোকান ,হোটেল ও রেস্টুরেন্টে বিক্রি করতেন। ১৫ বছর বয়সে তিবি তাঁর শিকার থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে তার মায়ের সব দেনা পাওনা পরিশোধ করেন। তার শিকারের প্রশংসা ছড়িয়ে যায় হোটেল রেস্টুরেন্ট গুলোতে।

১৮৭৫ সালে ‘থ্যাংকসগিভিং ডে’ তে একজন রেস্টুরেন্ট মালিক তখনকার বিখ্যাত রাইফেল শুটার ফ্রাঙ্ক ই. বাটলার এর ট্রাভেলার শো এর শুটার প্রতিযোগিতা আয়োজন করেন। রেস্টুরেন্ট মালিক ও ফ্রাঙ্ক ই. বাটলার ঘোষনা দেন যে, যে ফ্রাঙ্ক ই. বাটলার কে হারাতে পারবে তাকে ১০০ ডলার প্রদান করা হবে। অ্যানি ওক্লি সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলেন তিনি প্রতিযোগিতায় প্রথম কোন নারী হিসেবে অংশ নিলেন এবং জিতে নিলেন ১০০ ডলার। ফ্রাঙ্ক ই. বাটলার এতই মুগ্ধ হলেন যে পরবর্তীতে তিনি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।

১৮৮২ সালের কথা ফ্রাঙ্ক ই. বাটলারের “ট্রাভেলিং শুটার শো” তখন জনপ্রিয়। দুই বন্ধু মিলে এই শো করতেন। কিন্তু হঠাৎ করে তাঁর বন্ধু অসুস্থ হয়ে পরলেন , ফলে তার যায়গায় অ্যানিকে আনলেন। আর এখানেও বাজিমাত করলেন অ্যানি।

১৮৮৪ সালে সেন্ট মিনেসোটার এক অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি নেটিভ আমেরিকান যোদ্ধা স্টিং বুল তার শুটিং দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি তাঁকে “লিটল শিয়র শট” নামে ভুষিত করলেন। ১৮৮৫ সালে, এনি ওক্লি এবং তার স্বামী ফ্রাঙ্ক ‘বফেলো বিল এর ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ নামে একটি সার্কাসে শুটার হিসেবে কাজ শুরু করেন। অ্যানি তাঁর শুটিং ও অভিনয় দক্ষতা দিয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেওয়া শুরু করে পুরো আমেরিকার জুড়ে। এমনকি লন্ডনের একটি অনুষ্ঠানে রানী ভিক্টোরিয়াও মুগ্ধ হন।

তিনি নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একে একে ছেলেদের কে হারিয়ে সকল রেকর্ড গড়া শুরু করলেন। তিনি এমন দক্ষ ও সুক্ষ শুটার ছিলেন যে অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁর স্বামীর ঠোঁটে জলন্ত সিগারেটে তিনি শুট করতেন। তিনি নারী শিক্ষার বিষয়ে কাজ করা শুরু করলেন। শিক্ষার পাশাপাশি প্রায় ১৫ হাজার নারীকে তিনি রাইফেল চালানো শেখানো শুরু করেন। নারীরাও যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে এই লক্ষ্যে তিনি কাজ করা শুরু করেন।
সব ঠিকঠাকভাবেই চলছিল কিন্তু সুখের দিনে নেমে আসলো এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা।

১৯০১ সালে একটি ট্রেন দুর্ঘটায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। ফলে তিনি প্যারালাইজড হয়ে যান। তবুও জীবন থেমে থাকেনা। ছোট থেকে জীবন ধারনের জন্য লড়াই করে চলা অ্যানি ওক্লি এত সহজে হার মানলেন না। তাঁর চেষ্টায় খুব দ্রুতই সুস্থ হতে থাকলেন তিনি। আশ্চর্য্যের বিষয় তিনি সুস্থও হয়ে গেলেন। তবে এবার শুরু করলেন জীবনের আরেক অধ্যায়। তিনি মঞ্চ নাটকে অভিনয় শুরু করলেন। সাথে লিখলেন কিছু মঞ্চ নাটকও। “কাউগার্ল” নামক চরিত্রে অভিনয় করে বাজিমাত করলেন তার অভিনয় জীবনও।

‘ন্যাশনাল কাউগার্ল মিউজিয়াম এন্ড হল অফ ফেম’,’ন্যাশনাল উইমেন্স হল অফ ফেম’ এবং ‘ওহিও উইমেন্স হল অফ ফেম ‘ সহ অসংখ্য সম্মাননায় তিনি ভূষিত হয়েছেন। অ্যানির কোন সন্তান ছিল না। তিনি তার আয়ের অধিকাংশই বাচ্চাদের শিক্ষা ও এতিমদের জন্য ব্যয় করতেন। এত দক্ষতা, মুগ্ধতা, সম্মাননা, আর অবদানের জন্য তাকে ‘আমেরিকার প্রথম নারী সুপারস্টার’ বলা হয়ে থাকে।

আমেরিকার প্রথম নারী সুপারস্টার অ্যানি ওক্লি ১৯২৬ সালের ৩ নভেম্বর ৬৬ বছর বয়সে মরাত্মক রক্তস্বল্পতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। মারা যাওয়ার চার বছর আগেও ৬২ বছর বয়সে তিনি ১৬ গজ দূর থেকে ১০০টি টার্গেটকে শুট করেছিলেন। তিনি চলে গেছেন, রেখে গেছেন তার কর্ম গুলো। অ্যানি ওক্লি এর জীবনী নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক গান, টিভি সিরিয়াল ও সিনেমা। গল্পটা দারিদ্রতা দিয়ে শুরু হলেও শেষটাজুড়ে ছিল শুধুই সফলতা।

বিখ্যাত মনীষী চিকো জেভিয়ার হয়ত তাই বলেছিলেন, ‘প্রত্যেকের জীবনের একটা গল্প আছে। অতীতে ফিরে গিয়ে গল্পের শুরুটা কখনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তুমি গল্পের শেষটা চাইলেই নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারো।’

সূত্রঃ ইন্টারনেট

Loading...