• আজ বুধবার, ৫ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

নির্বাচিত গল্প: ইফাজের দিনরাত্রি ।।ফরিদুল ইসলাম।।


❏ শুক্রবার, আগস্ট ২৪, ২০১৮ গল্প-কবিতা

।১।

 

-স্যার! চা দেব।

– শরীফ মিয়া, বাঙলা মাসের নাম জানেন?

-জ্বী স্যার!

-এটা কোন মাস।

-স্যার, চৈত্র।

-তাপমাত্রা প্রায় পঞ্চাশ ডিগ্রি, এই ভর দুপুরে আপনার ঐ অখাদ্য গরম পানি গিলিয়ে কি আমাকে মারতে চান?

শরীফ মিয়া ভাবলো নতুন স্যারের মেজাজ মর্জিও আজকে আবহাওয়ার মতোই গরম । কেটে পরি।

ইফাজ একটা বেশ বড়সড় আর্কিটেকচার ফার্মে কাজ করে। গত ছয় বছর থেকেই সে এখানে আছে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র হয়েছে। বলা চলে শান্তিতেই ছিল এতদিন । হঠাৎ গত মাসে জয় ভাই ডেকে পাঠালেন। জয় ভাই ইফাজের বস, বেশ সাদাসিধা লোক। বললেন- প্রমোশন চাও? আমাদের রংপুরের ব্রাঞ্চের হেড পোস্টটা ভ্যাকেন্ট।

পদটায় বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা যোগ হবে। এবং অবশ্যই স্যালারি ফ্যাক্টস! কিন্তু ইফাজের জন্ম বেড়ে উঠা সবই ঢাকায়। কখনো ঢাকার বাইরে বেশিদিন থাকতে হয়নি। কাজেই ঢাকার বাইরে গিয়ে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং তার জন্য। ক্যারিয়ারের নানা দিক ভেবে ইফাজ ঠিক করলো সে চ্যালেঞ্জটা নেবে। আর চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়েই আজ তার ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা । ঢাকার মেইন ব্র্যাঞ্চ এয়ার কন্ডিশন্ড ছিল। এখানে নাই। তবে রংপুর উঠতি শহর। দ্রুত বড় হচ্ছে, নতুন নতুন বিল্ডিং হচ্ছে । সব মিলিয়ে এই শহরে ইফাজের ফার্মের ভালো সম্ভাবনা আছে বলা যায়।

– স্যার!

– শরীফ মিয়া, আবার কি?

– একজন একটু দেখা করতে আসছে। ইফাজ দেখল একজন অতি রূপবান পুরুষ শরীফ মিয়ার পিছনে পিছনে ঢুকছেন। সাথে একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটার পরনে স্কুল ড্রেস। বয়স পাঁচ-ছয় বছর হবে হয়তো।

ইফাজ হাত বাড়িয়ে বসতে বললো।

– আপনার সাথে এর আগে আমার কথা হয়নি। শুনলাম আপনি নতুন এসেছেন। আমি মামুনুল ইসলাম। পেশায় চিকিৎসক। আপনাদের একজন পুরনো ক্লায়েন্ট।

-পরিচিত হয়ে খুশি হলাম মামুন সাহেব। সাথে কে? আপনার মেয়ে?

-হ্যাঁ। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। প্রতিদিন ফেরার পথে স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়েই ফিরি।

-ও আচ্ছা।

ছোট্টমেয়েটির চোখগুলো দেখে ইফাজ মনেমনে দারুন চমকাল। খুব বেশি পরিচিত মনে হচ্ছে না কি? মুখটাও যেন কোথাও দেখেছে আগে। ইফাজ জানতে চাইল- তোমার নাম কি মামনি?

– আমার নাম অপ্সরী!

ইফাজের বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল। সে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো।

মামুন সাহেব কথা বাড়ালেন- মূলত যে জন্য আসা, আমি বাড়ি করার জন্য আপনাদের ফার্ম থেকে গত বছর একটা ডিজাইন নিয়েছিলাম। সেই বাড়ির কাজ মোটামোটি শেষ । পরিবার নিয়ে বাড়িতে উঠতে যাচ্ছি । এই উপলক্ষে একটু ছোটখাটো আয়োজন করতে চাচ্ছি। আগামী শুক্রবার । আপনাকে থাকতেই হবে। আমি গাড়ি পাঠাবো।

এই ধরনের আয়োজন গুলো ফার্মের জন্য বেনিফিট নিয়ে আসে। অনুষ্ঠানে গিয়ে নতুন সম্ভাব্য ক্লায়েন্ট বাগানো যায়। তাছাড়া যেহেতু নতুন শহর, নিজের এবং ফার্মের পরিচিতি বাড়ানো দরকার। সব মিলিয়ে ইফাজ সম্মতি জানালো।

মামুন সাহেব চলে যাওয়ার পরও অস্বস্তি কাজ করছে ইফাজের মধ্যে। মেয়েটার চোখগুলো অবশ্যই আগে কোথাও দেখেছে সে। ইফাজ কাজে মনোযোগ দিতে পারলো না। যদিও সে অফিস আওয়ারে কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যাবহার করে না, আজ অফিসে বসেই ফেসবুকে অনুর নাম সার্চ করল। অসংখ্য অনু ভেসে এলো কিন্তু কাঙ্খিত জনকে পেলো না সে। একবার ভাবলো পুরনো বন্ধুদের কাউকে ফোন করবে নাকি? ফোন করে কি বলবে? অনুর বিয়ে হয়েছে কার সঙ্গে, কোথায়? এতদিন পর হঠাৎ ফোন করে অনুর খোঁজ করা- আর যাই হোক স্বাভাবিক দেখায় না। নিজেই বিব্রত হবে সে।

-শরীফ মিয়া ! এক কাপ চা দিয়ে যাও।

শরীফ মিয়া এমন ভাবে তাকালো যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না!

। ২।

একই হাইস্কুলে ছিল অনু আর ইফাজ। কি সব দিন ছিল! এখন সেসব ভাবলে রীতিমত কান গরম হয়ে যায়। একটু ইঁচড়ে পেকে গিয়েছিলো কি তারা? হয়তো! দুটো হাইস্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ বাবুর নাম পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছে- এটা ইঁচড়ে পাকামো নয় তো কি বলা যায়?

একবার অনুর এক জন্মদিনে ইফাজ গিয়েছিল অনুদের বাড়িতে। কি প্রকান্ড সে বাড়ি। রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল ডিজাইন দেখে। ভেবেছিল কখনো সুযোগ পেলে সেও এমন চমৎকার বাড়ি বানাবে। তখন কে জানতো সেই ইচ্ছা এভাবে বাস্তব হয়ে যাবে ইফাজের জীবনে। বাড়ি ঘর ডিজাইন করাই এখন ইফাজের পেশা, তবে অন্যের জন্য!

জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ইফাজ ভেবেছিল অনু হয়তো তাকে সময় দেবে। কিন্তু পুরো সময় ইফাজের কাটলো একা। অনু তার বান্ধবীদের সাথে এমন হইচই করতে লাগলো যেন ভুলেই গিয়েছে ইফাজ নামের কেউ এসেছে। অথচ আগেরদিন কত অনুরোধ করলো অনু, বললো ইফাজ না আসলে কেকই কাটবে না, এটা-ওটা! সবাই কি মিথ্যা ছিল? কথার কথা ছিল? তবে ইফাজের ভালো লাগলো অনুর মা শিউলি বেগমকে। তিনি বেশ কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বললেন, মা বাবার খোঁজ খবর নিলেন। এতো মানুষের ভিড়ে অনুর মা তার সাথে আলাদা কারে কথা বলেছে- ইফাজ রীতিমত পুলক বোধ করলো ।

সময় বড়ই রহস্যময়! আজকের দিনটা কালকের খবর দিতে পারেনা। বর্তমানটা কত অন্যরকমই না হওয়া সম্ভব মনে হয়েছিল তখন। কিভাবে দূরত্ব বাড়ছিল তা ইফাজের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। অন্য বিশেষ কোনো কারনও ছিল না হয়তো । দূরত্ব বেড়েছে খুবই ক্যাজুয়ালি। এসএসসির পর ইফাজ ভর্তি হলো এক কলেজে, অনু আরেক কলেজে। নতুন বন্ধু বান্ধব জুটতে লাগলো, তাদের মধ্যে কথা বার্তও কমতে লাগলো। যেখানে সারারাত চ্যাটিং হতো সেখানে একসময় কমতে কমতে দিনে দুয়েকটা টেক্সট। তাও অনেক সময় সিন হয়ে থাকতো, রিপ্লাই আসতো কয়েক ঘন্টা পর। একসময় ইফাজ আবিষ্কার করলো- সে গ্যালাক্সির এক প্রান্তে, অনু অন্য প্রান্তে।

।৩।

মামুন সাহেব গাড়ি পাঠিয়েছেন। এখন ইফাজ গাড়িতে করে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছে। তার কি যাওয়া ঠিক হচ্ছে? কোন বিব্রতকর পরিস্থিতি না ঘটলেই হয়। ইফাজের নিজের উপর বিশ্বাস আছে।

বেশ ভালই আয়োজন করেছেন মামুন সাহেব। তার ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডস, কলিগে রীতিমত গমগম করছে নতুন দোতালা বাড়িটা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল- বাড়ির ডিজাইনের অন্তত কিছুটা আইডিয়া ইফাজের নিজের বলে মনে হচ্ছে। গতবছর জয় ভাই তাকে রংপুর থেকে আসা একটা দোতলা প্ল্যানের রিভিউ করতে দিয়েছিলেন। সে ঘুরনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি এটাই হবে সেই সাইট। ইফাজ নিজের ডিজাইনের সামনে দাঁড়ালে সবসময়ই পুলকিত হয়। এবারো হল।

ইফাজ কি মনে মনে কাউকে খুঁজছে?

সবই অপরিচিত মুখ। একমাত্র মামুন সাহেবের সাথেই আগে দেখা হয়েছে মাত্র একবার। তিনি বেশ খুশি হয়েছেন ইফাজ এসেছে বলে। হঠাৎ কাঁধে একটা টোকা পড়ল। ইফাজ ফিরে দেখল একজন ভদ্র মহিলা দাড়িয়ে আছেন। মুখটা হাসি হাসি করে। ইফাজ চিনতে পারলো না। পরক্ষনেই ইফাজের মুখটা প্রথমে গোল হল, তারপর চোয়াল ঝুলে পড়ল।

-সারপ্রাইজড?

ইফাজ কোন কথাই খুঁজে পেলনা। অনুকে চেনাই যাচ্ছেনা। ছিপছিপে শরীর ভরাট ভদ্র মহিলার আকৃতি নিয়েছে। ইফাজের দারুন অস্বস্তি লাগছে। এই অনুকে কি কখনো ইফাজ চিনতো? না! কখনোই না। তবে চোখদুটোকে সে চিনতো। আর হাসিটাকে। আজকেও চোখ আর হাসি দেখেই চিনেছে।

-আমি খুব বেশিই সারপ্রাইজড!

অনু বলল- আমি কিন্তু সারপ্রাইজড না। রাজিয়ার কাছে শুনেছি তুমি রংপুর এসেছ। রাজিয়া আবার তোমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে।

-তা বেশ জমিয়েই সংসার করছ দেখতে পারছি।

– হ্যাঁ বলতে পারো। এখানে একটা কলেজেও পড়াচ্ছি।

-তোমার মেয়ের সাথে দেখা হল সেদিন। নাম বলল –অপ্সরী! দেখতে মায়ের মতই সুন্দর হয়েছে।

-থাক! এখন আর ফ্লার্ট করা তোমার মানায় না। তারপর কি খবর বল? বিয়ে করেছ সে খবর শুনেছি। ছেলে মেয়ে?

– এক ছেলে! দুই বছর হল। নাম কি রেখেছি জানতে চাও?

অনু মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলল- নাহ! সম্ভবত নামটা আমি জানি।

।  ৪।

ইফাজ তার ফোনটা বাসায় ফেলে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে শোভার সাতটা মিসড কল। শোভা ইফাজের স্ত্রী। ও এখনো ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় আছে। ইফাজ আগামী মাসে ওদেরকে রংপুরে শিফট করানোর কথা আছে।

ইফাজ ফোন ব্যাক করলো।

শোভা বলল- অক্ষরের জ্বর এসেছে!

লেখকঃ ফরিদুল ইসলাম বন্ধন ,শিক্ষার্থী, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নামাজ

❏ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২১, ২০২১

ALone-Shadow-On-Night.-Story-Wright-by-nayan-babu একাকীত্বের গল্প!

❏ মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯

Gazipur স্বাধীনতার ডাক

❏ মঙ্গলবার, মার্চ ২৬, ২০১৯

রোদেলা বিকেল

❏ রবিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮