🕓 সংবাদ শিরোনাম

খুব শীঘ্রই ঢাকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান-ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে:গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীসিলেটে নারী পুলিশের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা, ইন্সপেক্টর ক্লোজডনিরাপদ সড়ক বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীআফ্রিকা থেকে আসা কাউকে বোর্ডিং পাস দেয়া হবে না : পররাষ্ট্রমন্ত্রীকিশোরীকে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার কথা বলে কাউন্সিলরের ধর্ষণচেষ্টামানিকগঞ্জে পানির জন্য হাহাকারচেয়ারম্যান হয়েই ১০ হাজার মানুষের কষ্ট দূর করলেন মাসুদ তালুকদারহাফ ভাড়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করুন: কাদেরমেয়র আব্বাসকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশচট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত ৭ জন

  • আজ শুক্রবার, ১৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ৷

রোদেলা বিকেল


❏ রবিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ গল্প-কবিতা

 সৈয়দ মোকছেদুল আলম

মুখবন্ধ

স্বাধীনতার চেয়ে চার বছরের বড় শিশু সাগর। জন্মেই সে দেখেছে ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। শুধু অদ্ভূতভাবে বিভাজিত দুই ভূখন্ডের নয় তার চেয়ে বেশি বিভাজন দেশটির নাগরিকদের মধ্যে। বাঙালি-বিহারি, বাঙালি-পাঞ্জাবি। পারস্পরিক অবিশ্বাস-বঞ্চনা সকলের চোখে মুখে। শিশু মানসেও এর প্রভাব পড়েছে। ‘রোদেলা বিকেল’ উপন্যাসের এই সূচনা অংশটি শিশু সাগরের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ও সে সময়ের নানা টানাপোড়নের প্রতিবিম্ব।

এক

সাগর চৌধুরীর মন খুব খারাপ। আজ জুন মাসের তৃতীয় রোববার। বাবাদের জন্য বিশেষ দিন। বাবা দিবস। সাগর সাহেব ভেবে পাচ্ছেন না ছেলের সাথে কীভাবে যোগাযোগ হবে। পকেট খা-খা করছে। মোবাইলে ব্যালেন্স নেই তিন দিন ধরে। গত দুই দিন ছেলেটা বন্ধুর মোবাইল থেকে অনুরোধ করছে কল ব্যাক করতে। বলে দিয়েছেন, মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। ছেলেটা অনেক দিন স্কুলের হোস্টেল থেকে বাবার কাছে আসতে পারেনি। টানা তিন মাস বাপ ছেলের দেখা সাক্ষাৎ নেই। মাঝেমাঝে কথা হয় মোবাইল ফোনে। কাজের চাপ আর হোস্টেলের বকেয়া টাকার সংস্থান করতে না পেরে যাব যাব করেও যেতে পারেন নি সাগর চৌধুরী।

এক যুগের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছেন সাগর চৌধুরী। এর আগে বিভিন্ন পেশায় চেষ্টা করেও লেগে থাকতে পারেন নি। পারিবারিক সমস্যা কিংবা অনিয়মিত সামান্য আয় দিয়ে সবদিক কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। মন দিয়ে কাজ করতে যতটুকু আর্থিক নিরাপত্তা দরকার তা কখনো ছিল না। অর্থকষ্ট প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। পুরোপুরি সৎ উপার্জনে চলতে চেয়েছেন। অতি সাধারণ জীবন-যাপন করে মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন। পদে পদে ধাক্কা খেয়ে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতার পেশা। এখানেও বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছেন। শুধু সাংবাদিকতায় মফস্বলে সৎভাবে বাঁচা সম্ভব না। এখানে সাংবাদিকতা কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য। দুই-চারজন ছাড়া কোনো মফস্বল সাংবাদিকই বেতন বা সম্মানি চোখে দেখেন না। যারা সামান্য কিছু হাতে পান তার পরিমান কাউকে বলতে বড় লজ্জা পান। সামান্য টাকায় যাতায়াত ও মোবাইল বিলও হয় না। চলেন কী করে? সংবাদ সংগ্রহের খরচ দেয় কে?

না। প্রতিষ্ঠান থেকে আশা না করাই ভাল। বিনা পারিশ্রমিকে সাংবাদিক হওয়ার শখ আছে অনেকের। পারলে উল্টা কিছু দিয়েই সাংবাদিক হতে চান। টাকা গচ্চা দিয়ে অন্তত মফস্বল-সাংবাদিক পোষার মত কর্মস্থল নেই বললেই চলে। বিনা পয়সায় পেলে টাকা দিয়ে সাংবাদিক রাখে কে?

টানা দেড় বছর খেয়ে না খেয়ে রাতদিন খেটে চাকরি পাকা করেছেন সাগর চৌধুরী। তারপর বেতন ঠিক হয়েছে ৮শ’ টাকা। সাগর চৌধুরীর ভাগ্য ভাল। তিনি খুব সহজেই একটা নামি পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হয়েছেন। শীর্ষ দৈনিকগুলোর একটি। আগে সার্কুলেশন লাখের আশেপাশে ছিল। এখন ৩০-৩৫ হাজার সার্কুলেশন। এই ক্ষয়িষ্ণু যৌবনা পত্রিকার দুর্দিনে সাগর চৌধুরীর যোগদান। বেতন টিক হলেও মাস গেলে হাতে পাওয়া যায় না। এভাবে আরও এক বছর। ঘরে বউ এর মুখ ঝামটা। বাচ্চা ছেলেটার দিকে তাকানো যায় না। সাগর চৌধুরীর এক বেয়াই ছেলেটাকে দেখে বললেন, আপনার বাচ্চাটাতো অপুষ্টিতে ভুগছে। ওর একটু যত্ন করেন। শাক-সবজি, ফল-মূল খাওয়ান।

স্কুল জীবনে সাগর চৌধুরী ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অভিনয়ে খুব ঝোঁক। নানা অনুষ্ঠান, পরিবার ও বন্ধুমহলে কৌতুক করে সবার কাছে এক নামে চেনা। যেমন খুশি তেমন সাজ তে একটা না একটা পুরস্কার জুটতই। কেবল জিয়াউর রহমানের আমলে খাল কাটার চরিত্র করে কোনো পুরষ্কার জোটেনি।

বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর দেশে একটা থমথমে ভাব। তখন সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এতো বড় একটা ঘটনায় কেউ তেমন উচ্চ-বাচ্য করছে না কেন এ প্রশ্ন মনে আসেনি। স্বাধীনতার পর সাগর চৌধুরী পরিবারের সবাইকে খুব কষ্ট করতে দেখেছেন। তিন বেলা ভাত খেয়ে অভ্যস্থ পরিবারের সদস্যদের দু’বেলা রুটি খেতে হয়েছে। সেই দিনগুলো সে ভুলতে পারে না। বাবা ছিলেন রেলের ছোট বাবু। স্টাফরা ‘ছোটবাবু’ বলে ডাকতেন। ‘বড়বাবু’ ছিলেন মুচ্ছুর বাবা। পাশের কোয়ার্টারে থাকতো এই বিহারি পরিবার। মুচ্ছুরা কথা বলতো উর্দু ভাষায়। মুচ্ছুর বাবা বাঙালিদের সাথে জগাখিচুরি বাংলায় কথা বলতেন। সাগরকে আদর করে ডাকতেন ‘ঢেঁড়স’। কেন ঢেঁড়স বলে ডাকতেন তা সাগর বা অন্য কেউ জানে না। সাগর ফর্সা স্বাস্থ্যবান আদুরে বালক। সবাই আদর করে। দেখা হলেই মুচ্ছুর বাবা গাল টিপে জিজ্ঞেস করতেন, ঢেঁড়স তুম খানা খায়া? ঢেঁড়স মাথা নেড়ে ‘না’ বলতো। ঢেঁড়সের ধারণা খানা মানে পোলাও-কোরমা। তার বাবা ঈদে পোলাও-কোরমা খেয়ে মায়ের প্রশংসা করতেন। বলতেন, খানা পাকানো খুব ভাল হয়েছে। মুচ্ছু প্রতিদিন বলতো খানা খেয়ে এসে খেলবে। ওঁরা কতই না বড় লোক! সব সময় খানা খায়। আচ্ছা, ঢেঁড়স যদি ওদের পরিবারের কেউ হতো রোজ খানা খেতো। প্রতি বেলা।

১৯৭১ সালে সাগরের বয়স ৪ বছর। শেখ মুজিবুর রহমানের নামটা শুনতে শুনতে মনে গেঁথে গেছে। দশাসই চেহারাটাও। সাদা ধবধবে পায়জামা-পাঞ্জাবি কালো মোটা কোট। দেখলেই ভক্তি হয়। গভীর শ্রদ্ধা জাগে। খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে। মনে হয় কত আপন কত চেনা। এই বুঝি ঢেঁড়স তাঁর হাত ধরে নায়কের মত দেশ জয় করে ফেলবে।

পাশের বাড়ির অজিতদা ছোট চাচাকে ফিসফিস করে অনেক কথা বলেন। এইবার গন্ডগোল বাঁধবে। বিহারিরা খুব বেড়েছে। তাদের দাপটে কোথাও টেকা দায়। পাকিস্তানি মিলিটারিদের দাপটে বাঙালি মিলিটারিরা মুখ খুলে না। দু’জন পাকিস্তানি মিলিটারি বড় জ্বালায় সবাইকে। একজন আলতাফ সুবেদার আরেকজন করম আলী। চওড়ায় বেশি বলে আলতাফকে খাটো লাগে। মাথায় পাতলা চুলের ফাঁকে তেল চিকচিকে টাক দেখা যায়। গোলগাল ঘুষখোর পুলিশের চেহারা। কোমড়ের বেল্ট ফেটে উপচে পড়া ঢাউস পেট। বড় বড় টকটকে লাল চোখ। ঘন জোড়া ভ্রু। ঠোঁট ঢেকে ঝুলে পড়া মোটা গোঁফের দুই দিক উপরের দিকে অর্ধ চাঁদের মত বাঁকানো। বারবার গোঁফের আগা মোচড়ায় আর চোখ পাকিয়ে কথা বলে। গায়ের রং মিশকালো। হাতে-বুকে বড় বড় লোম। খাকি পোশাক পড়া ভাল্লুকের মত দেখতে। কোমরে ওয়েস্টার্ন সিনেমার কায়দায় পিস্তল ঝোলানো। হাতে সব সময় মোটা একটা লাঠি নাড়াচাড়া করেন। সাগরের বাবা খসরু চৌধুরী প্রায়ই আলতাফ সুবেদারের গল্প করেন বাসায়। স্টেশনে এসে খুব উৎপাত করে। স্যুইপারকে পিটিয়ে আধ মরা করেছে। স্যুইপারের ঘরে সব সময় নেশা করে আলতাফ। স্যুইপারের বউকে নিয়ে সেদিন মাতাল আলতাফ টানা হেঁচড়া করছিল। স্যুইপার তাতে বাধা দেয়। সামান্য স্যুইপার তাকে বাধা দেয় এত বড় সাহস! পিটিয়ে বেচারা স্যুইপারকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় সে।

এ ঘটনা শুনার পর আলতাফ সুবেদার সাগরের কাছে এক ভীতিকর চরিত্র। ছোট বলে বাবা সাগরের সামনেই মাকে সব বলতেন। শুনে শুনে সাগর বুঝে ফেলে আলতাফ লোকটা মোটেও ভাল না।

দুই

হঠাৎ দেখা হয়ে যায় একদিন আলতাফ সুবেদারের সাথে। বাসার অদূরে স্টেশনে বাবার টিকিট ঘরে। মন চাইলেই ঢেঁড়স দৌড়ে তিনটা রেল লাইন পার হয়ে যাবার কাছে ছুটে। টিকেট ঘরে কাঠের লম্বা টেবিলের উপর একটা এক টাকার মুদ্রা পেরেক দিয়ে গাঁথা। ঢেঁড়স মুদ্রাটা কুড়িয়ে নিতে অনেক চেষ্টা করেছে।  যখনি আসে খোঁচাখুঁচি করে টাকাটা ওঠাতে চেষ্টা করে। কাজ হয় না। মাঝখানে ফুটো করে খুব শক্তপোক্তভাবে পেরেক মারা। কাজটা যে কে করেছে। ঢেঁড়স নিতে পারে এমনভাবে করতে কী অসুবিধা ছিল? চারআনা বা আটআনার বেশি কোনো দিন বাবা দেয় না। ইশ্! টেবিলে গোটা এক টাকা শুধু শুধু পড়ে আছে। পেলে অনেকগুলো লজেন্স আইসক্রীম বিস্কুট খাওয়া যেতো।

বাবু খুব ব্যস্ত। টেলিফোনে গলা ফাটিয়ে ‘হ্যালো হ্যালো টঙ্গী’ বলছেন। কয়েকবার চেষ্টা করে খ-টা-স করে ফোন রাখেন। টেলিগ্রাফের সাহায্য নেন। টরেটক্কা টরেটক্কা। টক্কাটরে টক্কাটরে। টরেটরে টক্কা। টরেটরে টক্কা। এভাবে চলতে থাকে। নানাভাবে কেবল টরেটক্কা সংকেত দিয়ে ভাব বিনিময়। বাবা থামেন। উত্তর আসে। টিকি টিকি। টিকি টিকি। টিক টিকি টিকি। চলতে থাকে এভাবে। এবার বাবা পয়েন্টসম্যান মান্নান কাকাকে গলা ফাটিয়ে ডাকেন। মান্নান কাকা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেন, খবর হইছে ছোট বাবু?

বাবা বলেন, সেভেন আপ টঙ্গী ছাড়ছে?

মান্নান কাকা লোহার রড দিয়ে ঝুলন্ত রেল লাইনের বড় খ- পিটিয়ে সবাইকে জানান দেন এ খবরটা। ঠং ঠং। টুন টুন টুন টুন টুন টুন। ঠং ঠং।

প্রথমে দুইবার ঠং। পরে ঘন ঘন টুনটুন অনেকবার। শেষে আবার দুইবার ঠং ঠং। মানে সেভেন আপ ট্রেন টঙ্গী স্টেশন ছেড়ে ধীরাশ্রমের দিকে।

রেলগাড়ি ঝমঝম, আইতে যাইতে কতক্ষণ। বাবা খসরু চৌধুরী আবার টেলিফোনে উচ্চস্বরে কথা বলেন। হ্যালো ধীরাশ্রম, এএসএম জয়দেবপুর স্পিকিং। ধীরাশ্রম ইনিং সেভেন থারটি সিক্স। ঢেঁড়স বুঝে না বাবা কেন ফোনে এত জোরে কথা বলেন। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে বললেই হয়। ওইতো ধীরশ্রম ওইখানে।

ভাবনায় ছেদ পড়ে। মুছুয়া আলতাফ এসে বাবাকে বলেন, বাত চিত কেয়া হ্যায় মাস্টার সাব? ইয়ে লাড়কা কোন হ্যায়?

বাবা অর্থপূর্ণভাবে একটু হাসেন কেবল। উল্টো জিজ্ঞেস করেন, “ আপকা হাল আচ্ছা হ্যায় সুবেদার সাব?”

উত্তর দেন আলতাফ, “ উপর ওয়ালে কো মর্জিসে বহুৎ আচ্ছা হ্যায় মাস্টার সাব! নাম ক্যায়া হ্যায় লাড়কা?”

ঢেঁড়স ভীত আড় চোখে তাকায়। গোঁফের আগা দুই হাতের আঙুলে টিপে মোচড়ায় আলতাফ। মুচকি হেসে ঢেঁড়সকে অভয় দেয়ার চেষ্টা করেন। ঘনিষ্ঠ হবার এ ইঙ্গিতে ঢেঁড়স বাবার পেছনে গিয়ে লুকায়। দুই টাকা দিয়ে আলতাফ একগাদা বিস্কুট ও চকলেট আনিয়ে জোর করে ঢেঁড়সের হাতে গুঁজে দেয়। ঢেঁড়স বুঝতে পারে না নেবে কি না।  খারাপ লোকের জিনিস। বুঝতে পারে না এই খারাপ লোকটা মুচ্ছুর বাবার মত ভাল না হয়েও আদর করে তাকে এত মজার মজার খাবার দিচ্ছে কী মতলবে?

করম আলী সুবেদার এর উল্টো। ইয়া লম্বা, সুঠাম দেহ। ক্লিন সেভ। উজির মশাইয়ের মত বাঁকানো গোঁফ ঠেকেছে গিয়ে মোটা জুলফিতে। লোক ঠ্যাঙিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার দুর্নাম আছে। গোটা জয়দেবপুর চষে বেড়ায়। বাংলা মদের দোকানে যখন তখন হানা দেওয়া স্বভাব। কুৎসিত গালিগালাজ করেন। কেউ একবার করম আলীর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতনের কাছে নালিশ করেছিল। মেজর সাহেব করম আলীকে ডেকে উর্দুতে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নাকি সোলজারদের অকারণে আজেবাজে গালাগাল করো। করম আলী প্রচ- খেপে গিয়ে অকথ্য গালিসহ পাল্টা প্রশ্ন করেন, “কোন মাদার … আপনাকে একথা বলেছে স্যার?”

অফিসার বললেন, “ঠিক আছে তুমি এখন যাও, বুঝতে পেরেছি।”

তিন

বয়স কম হলেও সাগর বুঝতে পারে মুচ্ছুদের পরিবারের সাথে তাদের পরিবারের একটা দূরত্ব চলছে। বাবা মুচ্ছুর বাবার বিরুদ্ধে গত রাতে অনেক কিছু বলেছেন মাকে। সারকথা পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের নানাভাবে বঞ্চিত করছে। মুচ্ছুর বাবাও বাবার সাথে সে রকম কিছু একটা করছে। শেখ মুজিব আর ইয়াহিয়া খানের সাথে এর একটা সম্পর্কও আছে। রীতিমত দা-মাছ সম্পর্ক। বাংলা ও উর্দুর মধ্যেও এরকম একটা কিছু শত্রুতা আছে।

ঢেঁড়সের বড়বোন খুব সুন্দরী। লুকিয়ে লুকিয়ে মায়ের শাড়ি-ব্লাউজ পড়ে স্কুলে যায়। সেখানে আরও কয়েকজন সুন্দরী বান্ধবী নিয়ে নাচ করেন। “শুকনো পাতার নুপুর বাজে” গানটার সাথে। বড় বোন শায়লার খুব শখ গান শেখার। বাবার কড়া নিষেধ। বাবার দাদা পীর মানুষ। বাবার বাবা পীরগিরি পছন্দ করতেন না। তিনি মসজিদে ইমামতি করেন। টানাটানির সংসারে খসরু চৌধুরী অনেক কষ্ট করে নাইটিন ফরটি সিক্সে মেট্রিকুলেশন করেন। বয়স তখন ১৭ বলে একবছর অপেক্ষা করে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে রেলের চাকুরিতে ঢুকেন। রেলের লালরঙা কোয়ার্টারগুলোতে কক্ষগুলো কবুতরের খুপরির মত। পাঁচ ভাই এক বোন নিয়ে দুই খুপরিতে থাকা যায় না। রান্নাঘরটাতে থাকার ব্যবস্থা করে ভেতর বারান্দায় চলে রান্না। আর বাহির বারান্দায় একটা চৌকি ফেলে বৈঠকখানা ও আরেকটি শোবার স্থান। বাসায় ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর। প্রায়ই জবাই হয়। তবু না কমে সংখ্যা বাড়ে। কবুতররাও বাড়ির মারিকদের মত এক খুপরিতে একাধিক জোড়া মিলে বাস করে। এর আগে বাবা দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনে ছিলেন। তখন একজোড়া বাচ্চা কবুতর মা পালতে শুরু করেন। সেগুলোই বংশ বিস্তার করে এ অবস্থা। দেওয়ানগঞ্জ থেকে ট্রেনে মালপত্র উঠিয়ে যখন জয়দেবপুর আসেন তখন কবুতরগুলো পিছু নেয়। উড়ে ট্রেনের ছাদে বগিতে বসে জয়দেবপুর এর কোয়ার্টারে এসে থিতু হয়। মাত্র আটআনায় এক গ্লাস ঘন খাঁটি দুধের মালাই সকালের নাস্তার সাথে বাধা ছিল তাদের। সবাই রুটি দিয়ে মজা করে খেতো। খোয়ারভরা মোরগ-মুরগি। একটা গলাছিলা লাল মোরগ ছিল ঢেঁড়সদের সবার প্রিয়। খয়েরি রঙা লাল ঝুটির ঢ্যাংগা মোরগ। দেশি জাত। খুব তেজি। মুচ্ছুদের ঢাউস কালো-সাদা ফুটি ফুটি মোরগটার মাতাব্বরি তার একদম না পছন্দ। এরপরও মাস্তানি করতে এলেই ঠুকুরিয়ে ঢেঁড়সদের গলাছিলাটা মুচ্ছুদের মোরগের বারোটা বাজাতো। এখন মুচ্ছুদেরটা মাস্তানি করতে ভয় পায়। কত মোরগ-মুরগি জবাই হয়। ঢেঁড়সদের প্রিয় মোরগটা সবসময় রাকীয় কায়দায় হেঁটে বেড়ায়। দেখে ঢেঁড়সের বুক ফুলে যায়। খুব আনন্দ হয়। সবাইকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে আমাদের গলাছিলার সঙ্গে মুচ্ছুদের লাগতে ভয় পায়। গলাছিলা কত সুন্দর। কত বীর। যোদ্ধা।

চার

২৫ মার্চ ১৯৭১। ভোর রাতে খসরু চৌধুরী নাইট ডিউটি থেকে বাসায় ফিরলেন। থমথমে গম্ভির মুখ। স্ত্রী বকুল স্বামীর অন্ধকার মুখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন-কী খবর? কী  হয়েছে?

খসরু চৌধুরী বললেন, খবর খু-উ-ব খারাপ। ঢাকায় নাকি ম্যাসাকার করে ফেলেছে পাক সেনারা। মধ্য রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে বাঙালিদের শিয়াল কুকুরের মত গুলি করে মেরেছে। সর্বত্র লাশের স্তুপ। দেশে খুব বড় একটা গ-গোল বেঁধে যাবে। মুচ্ছুর বাবা তোমাদের সবাইকে দেশের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে বললেন।

জয়দেবপুর থেকে কালিয়াকৈর ১৭ মাইল। খসরু চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি আরও তিন মাইল ভেতরে। পূর্ব-দক্ষিণ দুই দিক থেকে গ্রামটি ঘিরে আছে তুরাগ নদ। পশ্চিম দিকেও দিগন্ত বিস্তৃত বিলের অথৈ জলরাশি। কেবল উত্তর দিক থেকে মেঠোপথ ধরে গ্রামে প্রবেশ করা যায় পায়ে হেঁটে। কোথা থেকে কাকডাকা ভোরে খসরু চৌধুরী দু’টি ব্রিটিশ আমলের বেবি টেক্সি জুটিয়ে আনলেন। পরার জরুরি কিছু কাপড় আর সবার শখের থ্রি ব্যান্ড ফিলিপস্ রেডিও ছাড়া সঙ্গে অন্য কিছু নেই। পাঁচ ছেলে মেয়ে নিয়ে মা বকুল চললেন শ্বশুর বাড়িতে। স্বামীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে একা ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। কিন্তু সন্তানদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করতে হচ্ছে। পথে পথে পাক আর্মির জলপাই রঙের কনভয় এর ছুটাছুটি আর ঘাটে ঘাটে চেকপোস্ট। প্রতিটি চেকপোস্টে পাক আর্মিরা বাঙালি যাত্রীদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেকিং করছে। নানা প্রশ্ন করছে। উত্তর সন্তোষজনক হলে ছেড়ে দিচ্ছে। না হলে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। ঢেঁড়সের সুন্দরী বোনটি কালো বোরখা পরে ভাল করে নিজেকে লুকিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। হাতে-পায়ে মোজা। দেখার জন্য শুধু চোখ বরাবর দুটি ছিদ্র ছাড়া কোনো ফাঁক নেই।

জয়দেবপুর চৌরাস্তায় চেকিংয়ের সময় আলতাফ সুবেদার এগিয়ে এসে মার সাথে ঢেঁড়সকে দেখতে পেয়ে চিনতে পারলেন। কোথায় যাচ্ছে জানতে পেরে আলতাফ বললেন-সমস্যা নাই। করম আলী চন্দ্রার চেক পোস্টের দিকে যাবে। তাকে বলে দিচ্ছি। আপনাদের যেতে অসুবিধা হবে না।

একটু পর করম আলীকে নিয়ে আলতাফ ঢেঁড়সদের বেবি টেক্সির কাছে আসে। ভোমা সাইজের একটা মোটর সাইকেলে চড়ে করম আলী এগিয়ে যায় কালিয়াকৈরের পথে। হাত ইশারায় তাকে ফলো করতে বললেন ঢেঁড়সদের বেবিটেক্সি দুটোকে।

বেশ গার্ড অব অনার দিয়ে ঢেঁড়সদের পরিবার নির্বিঘেœই পৌঁছে যায় গ্রামের বাড়িতে। মা বকুল শ্বশুরকে কদমবুচি করেন। শ্বশুর খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, হঠাৎ তোমরা? রাস্তায় কোনো বিপদ হয় নাই তো?

বকুল উত্তরে বলেন-আল্লার মর্জিতে ভালভাবেই আসছি আব্বা।

পাঁচ

ঢেঁড়স তার সমবয়সী একদল বন্ধু জুটিয়ে ফেলে। কোথা থেকে জোগার করে কিছু পতাকা। বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র বসানো লাল-সবুজের পতাকা। যখন খুশি ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে গ্রামের অলিগলি মেঠো পথের ধুলা উড়িয়ে  এক অদ্ভূত অনন্দের স্বাদ খুঁজে পায়। ঢেঁড়সের মনে হয় সে কোনো এক নতুন রাজত্ব জয় করে ফেলেছে। সবাই স্বাধীন রাজা হয়ে গেছে।

সন্ধ্যায় ঢেঁড়সের বড় চাচা খোকা চৌধুরী ঘরের বারান্দায় রেডিও নিয়ে বসেন। শুরু থেকেই তিনি ঢেঁড়সদের ফিলিপস্ রেডিওটা দখল করে নিয়েছেন। সারাদিন বিভিন্ন সেন্টারের অনুষ্ঠান শুনেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আর বিবিসি’র খবর শুনে গ্রামের সবাইকে রিলে করে বেড়ান। বিবিসি’র সংবাদ পাঠকের কণ্ঠস্বর মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায় না। চাচা রেডিওর স্পিকারের সাথে কান লাগিয়ে তখন বুঝার চেষ্টা করেন মুক্তিবাহিনী কতজন পাকহানাদার মেরেছে। কোথায় পাকবাহিনীর ক্যাম্প গ্রেনেড চার্জ করে উড়িয়ে দিয়েছে। ভালভাবে খরব শুনার জন্য রেডিওর এরিয়ালের মাথায় ঘরের টিনের চাল থেকে টেনে এনে একটা তারের আরেক মাথা প্যাঁচিয়ে আর্থিং এর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। পাঁচ গাঁয়ের লোক বিবিসি ও স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর-অনুষ্ঠান শুনতে বড়চাচার চারপাশ ঘিরে বসে থাকেন। সন্ধ্যা নামার আগেই খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলা চুকিয়ে ফেলেন সবাই। কোনো আলো জ্বালানো নিষেধ। রাতে আলো নিশানা করে পাকিস্তানিরা বোমা ফেলতে পারে। এম আর আখতার মুকুল যখন চরমপত্র পাঠ করেন সবাই তখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যেও রক্ত গরম করা সাহস খুঁজে পান বুকে। বেঁচে থাকার নতুন এক দিগন্তের দেখা পান যেন। আপেল মাহমুদের সেই বিখ্যাত গান ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’-শুনে এক সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে প্রতিটি বাঙালি হৃদয়।

নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একদিন ভেসে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত খবরটি। বাংলাদেশ স্বাধীন।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢেঁড়সের এক ফুপাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি একটা স্টেনগান হাতে তুরাগের তীরে এসে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধ থেকে বাড়িতে ফিরে আসা শাহানূর ভাই এর মুখভর্তি দাঁড়ি। মাথায় লম্বা লম্বা চুল মেয়েদের মত পিঠে নেমে এসেছে। শাহানূর ভাইকে অন্য রকম এক মানুষ লাগছে। ঢেঁড়সরা পতাকা হাতে শাহানূর ভাই এর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। শাহানূর ভাই খোলা আকাশের দিকে স্টেনগানের নল তাক করে বিজয় আনন্দের ব্রাশফায়ার করেন। গুলির তাজা কার্তুজগুলো কুড়িয়ে সযতেœ প্যান্টের পকেটে জমিয়ে রাখে ঢেঁড়স। এগুলো তার আনন্দের স্মৃতিচিহ্ন।

তুরাগ নদের বুকে তখন শেষ বিকেলের রোদ ঝলমল করছে। সোনারঙা জলে কোথা থেকে ভেসে আসছে রক্ত মাখা এত লাশ। মৃত মায়ের বুকে দুধ মুখে রক্তাক্ত শিশুর লাশ। শকুনের দল কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে। কিশোর কিশোরীর লাশ। সদ্য গুলিতে নিহত এই লাশগুলো কোথা থেকে ভেসে আসছে? এরা কারা? ওদের কারা এমন নির্মমভাবে হত্যা করেছে? ঢেঁড়সের ভেতরে একটানা এ প্রশ্নের আর্তচিৎকার! বিজয়ের দিনেও কেন রক্তের নদী তীরে দাঁড়িয়ে তারা?

আরও পড়ুন :
ALone-Shadow-On-Night.-Story-Wright-by-nayan-babu একাকীত্বের গল্প!

❏ মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯

Gazipur স্বাধীনতার ডাক

❏ মঙ্গলবার, মার্চ ২৬, ২০১৯

রাখাইন রাজের সাজা

❏ শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৮