বাংলাদেশের যে এলাকার ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্রে গ্রামের নাম ‘পতিতালয়’

❏ বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক :: জাতীয় পরিচয়পত্রে আমাদের গ্রামের নাম লেখা হয়েছে ‘পতিতালয়’। সেই পরিচয় পত্র নিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে লাঞ্চনা ও অধিকার বঞ্চিত হতে হয় আমাদেরকে। তাই এবার নির্বাচনের আগে আমাদের প্রধান দাবী, জাতীয় পরিচয়পত্রের এমন গ্লানিকর পরিচয় থেকে মুক্তি লাভ। দেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলাধীন দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দা শিউলী আক্তার (ছদ্মনাম) কথাগুলো আক্ষেপের সুরে বলেন।

প্রকৃতির সব আলো এখানে বিবর্ণ। জীবন এখানে ছেড়া কাগজের মতো ছন্নছাড়া। গল্পটা পদ্মাপারের দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর। এই পল্লীতে থাকে রক্ত মাংসেরই একদল মানুষ। সভ্য সমাজ যাদের ঠাই দেয়নি। জাতীয় পরিচয়পত্রে এখানকার সব বাসিন্দার গ্রামের নাম “পতিতালয়”। অবিশ্বাস্য হলেও সেটাই লেখা। পতিতালয় লেখা এই সব যৌন কর্মীকে বিড়ম্বণায় পড়তে হয় পদে পদে। এমনকি নির্বাচনের সময় আমাদের জন্য আলাদা লাইন করে ভোট নেয়া হয়।

এখানকার যৌনকর্মী মায়া জানান, আমাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করতে গেলে পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসা সেবা নিতে গেলে বা কেউ মারা যাবার পর মৃত্যু সনদ নিতে গেলেও পরিচয় পত্র প্রয়োজন। কিন্তুু পরিচয়পত্রে পতিতালয় লেখা থাকায় সমাজের মানুষেরা আমাদের দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকায়। ছোট করে দেখা হয় আমাদেরকে।

পল্লীর বাসিন্দা মমতাজ আক্তার, শিল্পি আক্তার, পারভীন আক্তার, শাহনাজ আক্তারসহ অনেকেই জানান, আমরা জন্মসূত্রে বেশীর ভাগই এখানকার বাসিন্দা নই। দুর্ভাগ্যক্রমে এখানে এসেছি। বাড়ীতে পরিচয় গোপন রেখে বাইরে ভাল চাকরী করি বলে পরিচয় দেই। কিন্তু বাবা বা স্বামীর সম্পত্তি লাভ, জমি বেচাকেনা, সন্তানকে ভাল স্কুলে ভর্তি করা, বিকল্প পেশায় চলে যাওয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমাদের গ্রামের এই পতিতালয় নাম কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলে আসলেও এর কোন প্রতিকার পাচ্ছি না।

যৌনপল্লীর বাসিন্দা শায়লা আক্তার জানান, আমি এই পরিচয়পত্র নিয়ে ঢাকা শহরের অনেক গার্মেন্টস ঘুরেছি। কিন্তু পরিচয়পত্রে পতিতালয় লেখা থাকায় কেউ কাজ দেয়নি। পরে পরিচয়পত্র নকল করে কাজ নিতে হয়েছে।

যৌনজীবি মম জানান, আমি আমার বাচ্চাকে একটি ভাল স্কুলে ভর্তির করতে গিয়ে পরিচয়ের কারণে পারিনি। পরে ২ হাজার টাকা খরচ করে গ্রামের নাম পরিবর্তন করে সামসু মাস্টারের পাড়া করি। এরপর সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করি।

দেশের সবচেয়ে বড় এই যৌনপল্লীতেও এখন ভোটের হাওয়া। বরাবরের মতো এবারও ভোট দিবেন অন্তত দু-হাজার ভোটার। প্রতিরাতে হাত বদল হওয়া এই নারীদের এবার একটাই চাওয়া ভোটের বিনিময়ে হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে মুছে দেওয়া হোক গ্রামের গ্লানিকর নামটি।

যৌনজীবি ও তাদের সন্তানদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতির নির্বাহী পরিচালক মর্জিনা বেগম বলেন, জাতীয় পরিচয় পত্রে এমন ঠিকানা দিয়ে তাদের ছোট করা হয়েছে। কেউ এই পেশায় ইচ্ছা করে আসেনি। সমাজের কাছে এভাবে কাউকে ছোট করার অধিকার কারো নেই। তারাও সমাজের আট-দশ জনের মতো মানুষ। একজন উন্নয়ন কর্মী হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিয়ে কাজ করছি। আমি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবী জানাই।

এ ব্যাপারে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার আমাকে ফোন করেছিলেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। ওই এলাকাটি গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। তাই গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্মানের সাথে তাদের ভোট গ্রহন করা হয়। আর পরিচয়পত্র প্রস্তুুত করেছে নির্বাচন অফিস। নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে গ্রামের নাম পতিতালয় সংশোধন করা হবে।