ফুলবাড়ীতে স্বামীদের নির্যাতনে চার গৃহবধু হাসপাতালে!

৫:১৩ অপরাহ্ন | বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ৩, ২০১৯ রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে স্বামী ও তার পরিবারের অমানুষিক নির্যাতনে আশ্রয়হীন চার গৃহবধুর ঠাঁই এখন হাসপাতালে।

তাদের আকুতিতে হাসপাতালের প্রতিটি মানুষের চোখে পানি এসে যায়। পারছে না স্বামী ও স্বামীর পরিবারের অত্যাচার সহ্য করতে। অন্যদিকে অভাবী বাবার সংসারে বুঝা হয়ে থাকতে। নির্যাতনের স্বীকার গৃহবধুরা হলেন – তহমিনা বেগম (২২), হামিদা বেগম (২৭), শিল্পী বেগম (২১) ও সুমনা বেগম (১৯)।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ফুলবাড়ী উপজেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, নির্যাতনের স্বীকার চার গৃহবধু এখন ফুলবাড়ী সদর হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের সবার চোখে মুখে বিষাদের ছায়া। সাংবাদিক দেখেই তারা কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। পরে তারা কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, তাদের নির্যাতনের করুন কাহিনী।

উপজেলার নাওডাঙ্গার ঠাঁকুরপাঠ গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে গৃহবধু তহমিনা বেগম জানান, ২০১৭ইং সালের ২২ শে মার্চ একই ইউনিয়নের বালাতাড়ি গ্রামের হযরত আলীর ছেলে জাহিদ হাসানের সাথে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। তহমিনার খুব ইচ্ছা ছিল পড়াশুনা শেষে ভাল চাকুরী করার। তারপর বিয়ে। গরীব দিন মজুর বাবার কারণে তার ইচ্ছা পুরণ হয়নি। দুই পরিবারের চাপে বিয়েতে রাজি হয় তহমিনা। বিয়ের পরেই শুরু হয় কারণে অকারণে তহমিনার উপর স্বামী ও তার পরিবারের অমানুষিক নির্যাতন। স্বামীর নির্যাতন ও শ্বশুর বাড়ীর লোকের চাপ সহ্য করে হলেও তহমিনা এইচ এস সি পাশ করে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। তিনি বর্তমানে ওই বিভাগের অর্নাস ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্বামীর চাপে তহমিনা কলেজে ক্লাস করতে পারেননি। এরই মধ্যে অবশিষ্ট যৌতুকের ৫০ হাজার টাকা দাবি করে চলে চাপ প্রয়োগ। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ীর চাপে ঢাকা যেতে বাধ্য হয় তহমিনা। স্বামীও চলে যায় ঢাকায়। স্বামীর ইচ্ছায় তহমিনাও গার্মেন্টেস এ চাকুরী শুরু করে। চাকুরী করার কয়েক দিন পর তিনি চাকুরী করবে না বলে স্বামীকে জানান। স্বামী নাছরবান্ধা তিনি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারবেন না। স্বামীর সাফ কথা চাকুরী করলে সংসার টিকবে, না করলে সংসার টিকবে না। গৃহবধু তহমিনা স্বামীর সংসার ঠিক রাখার জন্য নির্যাতন সহ্য করে অনেক কষ্টে এক বছর ধরে চাকুরী করে।

তহমিনা আরও জানান, কয়েক দিন আগেই স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেয়ে গোপনে চাকুরী ছেড়ে ও স্বামীকে না জানিয়ে বাবার বাড়ীতে আসেন তিনি। শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। আঘাতের চিহ্ন। চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

একই ভাবে স্বামী ও তার পরিবারের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পাশ্ববর্তি নাগেশ্বরী উপজেলার সীমান্ত ঘেষা নাখারগঞ্জ গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে হামিদা বেগম। পাঁচ বছর পূর্বে উপজেলার বালাতারী গ্রামের মৃত হায়দার আলীর ছেলে হাবু মিয়ার সাথে বিয়ে হয় হামিদা বেগমের (২৫)। বিয়ের পরেই শুরু হয় কারণে অকারণে নির্যাতন-অত্যচার। হামিদা বেগমও স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে গত সোমবার ফুলবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়।

ঠিক একই ভাবে চন্দ্রখানা বালাটারি গ্রামের ছকমল হোসেনের মেয়ে সুমনা বেগম (১৮) গত ছয়মাস পূর্বে পানিমাছকুঠি গ্রামের খৈইমুদ্দিনের ছেলে বাইদুলের সাথে সুমনা বেগমের বিয়ে হয়। সেও গত দুইদিন পূর্বে স্বামীর নির্যাতনের স্বীকার হয়ে ফুলবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং উপজেলার নাগদাহ গ্রামের সেকেন্দার আলীর মেয়ে শিল্পী বেগম (২০) এর সাথে উত্তর রাবাইতারী গ্রামের মাইদুল ইসলামের সাথে বিয়ে হয়। শিল্পী বেগমও নির্যাতনের স্বীকার হয়ে গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত ফুলবাড়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।

এ ব্যাপারে নির্যাতিতা তহমিনা বেগমের বাবা তোফাজ্জল হোসেন ও হামিদা বেগমের বাবা হাবিবুর রহমান নির্যাতনের বিচার চেয়ে জানান, তারা মেয়েকে অমানষিক নির্যাতন করেছে। আমার মেয়ে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাড়ীতে এসেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা ও নির্যাতনের ক্ষতের যন্ত্রনায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মেয়ে নির্যাতনের স্বীকার হওয়ায় সমাজের কাছে বিচার চেয়েছেন ভুক্তভোগিরা।

নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ডঃ শাহজাদা খন্দকার বলেন ঘটনাটি খুবেই দুঃখজনক। নির্যাতনের সঠিক বিচার হওয়া দরকার।

ফুলবাড়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জয়ন্তী রানী জানান, ভুক্তভোগিরা আমাকে জানালে আমি অবশ্যই আইনী সহযোগিতা করবো।

এ প্রসঙ্গে ফুলবাড়ী সদর হাসপাতালের দায়িত্ব প্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোঃ গোলাম কিবরিয়া বলেন, আহত চার গৃহবধুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তারা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছেন।

ফুলবাড়ী থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানী জানান, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।