সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে কেঁদেছেন কিশোরগঞ্জের সকল দলের নেতারা

◷ ১২:৩১ অপরাহ্ন ৷ শুক্রবার, জানুয়ারী ৪, ২০১৯ ঢাকা

এ.এম.উবায়েদ, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। পরিবারের পক্ষে ছোট ভাই মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে তার নির্বাচনী এলাকায় (কিশোরগঞ্জ সদর হোসেনপুর) নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাংলাদেশে সৎ ও স্বচ্ছ রাজনীতির আদর্শ এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেই তাঁকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়। দেশে না থেকেও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার আগেই তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। রাতে তাঁর এই মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুল আহসান শাহজাহান বলেন, সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে বাংলাদেশ তথা কিশোরগঞ্জের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা কোনওভাবেই পুরণ হবে না। আমরা আমাদের অভিভাবক হারালাম।

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ আশরাফ বিতর্কের ঊর্ধ্বের  একজন মানুষ। তিনি কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিশোরগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন তিনি। আমরা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখি। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। অংশ নেন একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর কারাগারে পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিনি যুক্তরাজ্য চলে যান। প্রবাস জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ডাকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে এসেছিলেন। ১৯৯৬ সালে দেশে ফেরার পর অংশ নেন ১২ই জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ১৯৯১ সালে বিএনপির কাছে হারানো কিশোরগঞ্জ সদর (তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৩) আসনটি ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন হয় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের। এই প্রত্যাবর্তনের পর একজন ভদ্র, বিনয়ী রাজনীতিবিদ হিসেবে দলের সবার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা কুড়াতে বেশি সময় নেননি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলের চরম ভরাডুবির সময়েও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই আসন থেকে টানা দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হ্যাট্রিক জয়ের পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মহাজোট সরকারের মন্ত্রীসভায় লাভ করেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব। এ সময়ে টানা দুইবার তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদকের পদ অলঙ্কৃত করেন।

এর আগে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে দলের ক্রান্তিলগ্নে দলের হয়ে অসাধারণ ভূমিকা পালন করায় তিনি আবির্ভূত হন।এই সময়ে অতিকথন ও ক্ষমতার দম্ভ সৈয়দ আশরাফকে ¯পর্শ করতে পারেনি। একজন উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদের মতোই তিনি নীরবে নিভৃতে পথ হেঁটেছেন।

এদিকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যু সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীরা রাতেই ছুটে যান জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে। শোকাহত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জবাসীর এক অনুভূতির নাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান হিসেবে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং একজন সৎ, ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে ক্লিন ইমেজের এমন রাজনীতিবিদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা শিলা ইসলাম ২০১৭ সালের ২৩শে অক্টোবর লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

পরবর্তীতে  তাঁকে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের একমাত্র সন্তান সৈয়দা রিমা ইসলাম লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করেন।